মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১১:৫০

ঘরে ঘরে নিম্নবিত্তদের ডেঙ্গুরোগীদের ভরসা নাপা

ঘরে ঘরে নিম্নবিত্তদের ডেঙ্গুরোগীদের ভরসা নাপা

নিচে সারি সারি রিকশা। ওপরে কাঠের পাটাতন বসিয়ে শোয়ার জায়গা। ঘুটঘুটে অন্ধকার। একদিকে টিম টিম করে জ্বলছে ছোট্ট একটি এলইডি বাল্ব। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই দেখা গেলো মশারি টাঙিয়ে শুয়ে আছেন কয়েকজন।

কেউ মশারি ছাড়াই। সবার জ্বর, শরীরে ব্যথা। তারা সবাই রিকশাচালক। জ্বরে আক্রান্তদের মধ্যে দুজন টেস্ট করিয়েছেন। দুজনই ডেঙ্গু পজিটিভ। তারাও থাকছেন সেখানেই। হাসপাতালে ভর্তির টাকা নেই। গ্যারেজে শুয়েই জ্বরের ওষুধ (নাপা ট্যাবলেট) খেয়ে ডেঙ্গু কাটিয়ে ওঠার চেষ্টায় তারা।

রাজধানীর মধ্যবাড্ডার আদর্শনগর ৩ নম্বর রোডের ফারুক গ্যারেজের চিত্র এটি। এ গ্যারেজে ৩৫ জন রিকশাচালক অস্থায়ীভাবে বসবাস করেন। সারাদিন রিকশা চালান, রাতে গ্যারেজে থাকেন। গ্যারেজের পরিবেশ মাত্রা ছাড়ানো নোংরা। চারদিকে ওড়াওড়ি করছে মশা-মাছি। মালিকপক্ষের কোনো খোঁজ নেই।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যে পড়েছে এ এলাকা। গ্যারেজ ও আশপাশের বাসিন্দাদের অভিযোগ, তাদের এলাকায় গত তিন-চার মাসে একবারও তারা সিটি করপোরেশনের মশক নিধন অভিযান দেখেননি। চারপাশে জ্বরে আক্রান্ত মানুষ। টেস্ট করালেই ডেঙ্গু পজিটিভ আসছে। তবে অধিকাংশ জ্বরে আক্রান্ত মানুষই টেস্ট করানো থেকে বিরত থাকছেন।

‘ফারুক গ্যারেজ’র রিকশাচালক মো. রাজু বলেন, খুব মশা। এদিকে ওষুধ বা ধোঁয়া দিতে কাউরে আসতে তো দেহি না। নিজেরা যতটুকু পারছি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকছি। এদিকে অনেক অসুস্থ রোগী। আমাদের গ্যারেজে অনেকে অসুস্থ। জ্বর নিয়েই অনেকে রিকশা চালাচ্ছেন।

৩ নম্বর রোড ধরে কিছুদূর এগিয়ে যেতেই চায়ের দোকানে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় করম আলী নামে এক বৃদ্ধের। তার বাড়ি মাদারীপুরের শিবচর। করম আলীর ছোট মেয়ে রোকসানা আক্তার ডেঙ্গু আক্রান্ত। রোকসানা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত।

করম আলী বলেন, মেয়ের ডেঙ্গু, খুব অসুস্থ। এখানে ভাড়া বাসায় থাকে (বাড্ডা ময়নারবাগের মন্ত্রীমাঠ)। ইবনে সিনায় টেস্ট করিয়েছি। টেস্টে ডেঙ্গু ধরা পড়েছে। বাসায় থেকে ডাব, গ্লুকোজ আর কিছু ওষুধ খাচ্ছিল।

গত সোমবার ২৪ জুলাই রাত থেকে পাতলা পায়খানা শুরু হয়েছে। কয়েকবার বমিও করেছে। কোন হাসপাতালে ভর্তি করবো সেটাই এখানকার লোকজনের কাছে জিজ্ঞাসা করছিলাম। আমি তো এদিকের কিছুই চিনি না। আশপাশের হাসপাতালে কোনো বেড ফাঁকা নেই। এখন মহাখালীর দিকে নেবো। সিএনজি অটোরিকশা আনতে গেলো বড় ছেলে।

আল-আকসা মসজিদ রোডের টিনশেড একটি বাসায় থাকেন খাদিজা আক্তার। এক সপ্তাহ ধরে জ্বর। শনিবার (২২ জুলাই) এ এম জেড হাসপাতালে টেস্ট করিয়েছেন। ডেঙ্গু পজিটিভ। খাদিজা যে ঘরে শুয়ে আছেন, তার পরিবেশ স্যাঁতস্যাঁতে। মশারিও টাঙাননি। অথচ তার ওই টিনশেড বাড়িতে আরও ১৫টি ঘর। যেখানে আলাদা আলাদা পরিবার বসবাস করছে। ২০-২২ জন শিশু থাকে ওই বাড়িতে।

খাদিজা আক্তার বলেন, শরীরটা নড়াতে পারছি না। প্রচণ্ড ব্যথা। গতকাল রাতে বমি করেছি। পেটেও সমস্যা হচ্ছে। আমার স্বামী ফুটপাতে বিভিন্ন জিনিস বেচাকেনা করে। আমরা গরিব মানুষ। অত টাকা কই পাবো? নাপা বড়ি খাচ্ছি। কাল একটা ডাব খাইছি। একটা ডাবের দাম ১২০ টাকা। আমাদের চিকিৎসা করানোর উপায় নেই। আল্লাহ বাঁচালে বাঁচবো, না হলে যা হওয়ার হবে।

মধ্যবাড্ডার আদর্শনগর, বাজার রোড, কবরস্থান রোড, মন্ত্রীমাঠ, ময়নারবাগ, পোস্ট অফিস মোড়, উত্তর বাড্ডার সাঁতারকুল, নুরেরচালা, দক্ষিণ বাড্ডার বৈশাখী সরণিসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘরে ঘরে জ্বরে আক্রান্ত মানুষ। মধ্যবাড্ডা ও উত্তর বাড্ডায় নিম্নবিত্ত মানুষের বসবাস বেশি। এখানকার টিনশেড ঘর, গোসলখানা, টয়লেট যেন ডেঙ্গুর প্রজননকেন্দ্র।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2024