আজ শুক্রবার। পবিত্র জুমাবার। আজকের বিষয় ‘সূরা ইনশিরাহ سورة الشرح’। শীর্ষবিন্দু পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ‘ইসলাম বিভাগ প্রধান’ ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান।
পরিচয়ঃ
সূরার নাম : সূরা ইনশীরাহ সূরার অর্থ: বক্ষ প্রশস্তকরণ।
সূরা নং: ৯৪ রুকু সংখ্যা : ১
আয়াত সংখ্যা: ৮ সিজদা সংখ্যা : ০
শব্দ সংখ্যা: ২৭ পারার সংখ্যা : ৩০
অক্ষর সংখ্যা: ১০১ শ্রেণী : মাক্কী।
সূরা আল-ইনশিরাহ মক্কি সূরাসমুহের অন্যতম।এর আয়াত সংখ্যা মোট ৮ টি।এটি আল-কুরআনের ৯৪ তম সূরা।সূরার প্রথম আয়াত নাশরাহ শব্দের ক্রিয়ামূল বিবেচনায় এ সূরার নাম রাখা হয়েছে আল-ইনশিরাহ।
শানে নুযুলঃ
মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স.) নবুয়ত লাভের পূর্বেও মক্কা নগরীর অত্যন্ত সম্মানিত মানুষ ছিলেন।সারা আরবের লোক তাঁকে ভালোবাসত,শ্রদ্ধা করত,সম্মান দেখাত।তাকে আল-আমিন বলে ডাকত।নির্দ্ধিধায় তাঁর নিকট মূল্যবান ধন-সম্পদ গচ্ছিত রাখত।সর্বোপরি মহানবি (স.) ছিলেন সকালের প্রিয় ও শ্রদ্ধার পাত্র।কিন্তু নবুয়ত লাভের পর রাসুলুল্লাহ (স.) ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকলে মক্কাবাসীরা তার বিরোধিতা শুরু করে।তারা তাঁকে নানাভাবে ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও উপহাস করতে থাকে। তাঁকে কবি, গণক, যাদুকর, পাগল ইত্যাদি বলে কষ্ট দিতে থাকে।
মহানবি (স.) ও নওমুসলিম সাহাবিগণের উপর নানাভাবে অত্যাচার-নির্যাতন চালাতে থাকে। এমনকি নামাযরত অবস্থায় মহানবি (স.)- এর উপর উটের নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দিত,তাঁর চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখত,তাঁর কথা না শোনার জন্য কানে আঙ্গুল দিত।এরকম নানাভাবে কাফিররা মহানবি (স.)- কে কষ্ট দিচ্ছিল।কাফিরদের এরূপ ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও অন্যায় অত্যাচারে রাসুলুল্লাহ (স.) উদ্বিগ্ন ও হতাশ হয়ে পড়েন।এমন পরিস্থিতিতে আল্লাহ তায়ালা এ সূরা নাজিল করে মহানবি (স.)-কে সান্ত্বনা প্রদান করেন।
সূরা ইনশিরাহ’র মূল তিনটি বিষয় হল মহানবী (সা:) এর প্রতি মহান আল্লাহর নানা অনুগ্রহ, ভবিষ্যতে তাঁর দাওয়াতি তৎপরতার সমস্যাগুলোর সমাধানের সুসংবাদ বা ইঙ্গিত এবং এক আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ বা গভীর প্রেমসহ তাঁর ইবাদত ও তাঁর দরবারে দোয়া আর কাকতি-মিনতিতে মশগুল হওয়া। মহানবীর (স:) নবুওতি তৎপরতা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলে এ তৎপরতার প্রথম বছরেই নাজিল হয়েছিল সূরা ইনশিরাহ।
সূরা ইনশিরাহ’য় প্রথমত আল্লাহ রাসূল (সা:) এর বক্ষ জ্ঞানে পরিপূর্ণ হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। তা সত্ত্বেও কোনো কোনো তাফসীরকার বলেন যে, ফেরেশতা মহানবী (সা.)-এর বক্ষ বিদারণ করেছেন এবং তাঁর হৃদয় ধৌত করেছেন। এটা বুদ্ধি-বিবেকের সম্পূর্ণ বিপরীত ও অযৌক্তিক কথা। কারণ বুক ধুয়ে কখনও আত্মিক পরিশুদ্ধতা অর্জিত হয় না।
দ্বিতীয়ত আল্লাহ তাঁর প্রতি এই অনুগ্রহ করেছেন যে, পবিত্র কুরআন ব্যাখ্যা ও ঐশী বিধিবিধান পৌঁছানো এবং তা বাস্তবায়িত করার যে গুরুদায়িত্ব তাঁর কাঁধে ছিল তা হযরত আলীর (আ.)-এর খেলাফত ও প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে লাঘব করে দিয়েছেন। আর যেহেতু এ আদেশ অর্থাৎ আলী (আ.)-এর খেলাফতের ঘোষণাকে তিনি খুব কঠিন কর্ম গণ্য করেছিলেন
সে কারণে আল্লাহ যেরূপে অন্য স্থানে অন্য বাক্যে বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন অনুরূপ এ স্থলেও এভাবে বলেছেন যে, যখন অবসর পাও অর্থাৎ যখন তুমি বিদায় হজ পালন করে নবুওয়াতের দায়িত্ব সম্পন্ন করে নেবে তখন আলীকে খলিফা নিযুক্ত করার কঠোর প্রচেষ্টায় রত হও। অতঃপর আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করবে। অর্থাৎ মৃত্যুর প্রস্ততি নেবে। অবশ্য সুন্নী মুফাসসিররা এরূপ ব্যাখ্যা করেননি।
মহানবী (সা) যখন একত্ববাদের প্রচার শুরু করেন তখন কাফের ও মুশরিকদের ব্যাপক বিরোধিতা আর বাধার মুখোমুখি হন। তাই রেসালতের দায়িত্ব পালন তাঁর কাছে খুব কঠিন মনে হচ্ছিল প্রথমদিকে। অবশ্য প্রত্যেক নবী-রাসুলের জন্যই প্রথম দিকে কঠিন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল; মহান আল্লাহর সহায়তায় তারা সব সংকট ও বাধা কাটিয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন। তবে মহানবীর (সা) জন্য পরিবেশ-পরিস্থিতি ছিল অনেক বেশি কঠিন ও প্রতিকূল।
আর এ জন্যই মহান আল্লাহ সূরা ইনশিরাহ’তে উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত মহানবী (সা:) কে বলছেন, আল্লাহর ধর্ম প্রচারের জন্য কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার কখনও বিফলে যায় না। প্রতিটি সংকট ও কষ্টের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মুক্তির পথ। পবিত্র লক্ষ্য অর্জনের জন্য কষ্ট করা ও ত্যাগ স্বীকার এবং নানা বাধার মোকাবিলা করা ক্রম-বিকাশ ও উন্নতির নতুন নতুন পথ খুলে দেয়।
তাই সংকট বা সমস্যাকে ভয় না করে সানন্দে বরণ করা উচিত। মহানবী (সা:) যেমন অবর্ণনীয় নানা কষ্টের শিকার হয়েছেন তেমনি আল্লাহর অনেক বিশেষ অনুগ্রহও পেয়েছেন। আর এ জন্যই সূরা ইনশিরাহতে মহান আল্লাহ বলেছেন: নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে।

Leave a Reply