আজ শুক্রবার। পবিত্র জুমাবার। আজকের বিষয় ‘হযরত আবু বকর (রাঃ) জীবনী’। শীর্ষবিন্দু পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ‘ইসলাম বিভাগ প্রধান’ ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান।
হযরত আবু বকর (রাঃ) (২৭অক্টোবর ৫৭৩ -২৩ আগস্ট ৬৩৪)
জন্মসাল ও জন্মস্থান: ২৭অক্টোবর ৫৭৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি জন্মগ্রহণ করেন মক্কা, আরব উপদ্বীপ।
নাম ও বংশ পরিচয়: তার নাম আবদুল্লাহ। ডাকনাম আবু বকর। উপাধি: আতিক, সিদ্দিক। পিতার নাম: আবু কুহাফা এবং মায়ের নাম: উম্মুল খায়ের। কুরাইশ বংশের উপর দিকে ষষ্ঠ পুরুষ ”মুররাতে” গিয়ে রাসুল দঃ এর নসবের সাথে তার নসব মিলিত হয়।
তিনি ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের প্রথম খলিফা
চরিত্র ও স্বভাব: তিনি ছিলেন সম্মানীয় কুরাইশ ব্যাক্তিবর্গীয়দের অন্যতম। জ্ঞান, মেধা,অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি, বিচক্ষণতা, ও সচ্চরিতার জন্য আপামর মক্কাবাসীর শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। অত্যন্ত বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল ভাষী ছিলেন..বক্তৃতার ও বাগ্মিতার খোদাপ্রাপ্ত অধিকারী ছিলেন।
স্ত্রী ও বংশধর: কুতাইলা বিনতে আব্দুল উজ্জা (তালাকপ্রাপ্তা)
আসমা বিনতে উমাইসা
হাবিবা বিনতে খারিজা
উম্ম রুম্মন
পুত্র: আবদুল্লাহ ইবনে আবি বকর, আবদুর রহমান ইবনে আবি বকর এবং মুহাম্মদ ইবনে আবি বকর।
কন্যাঃ আসমা বিনতে আবি বকর, আয়েশা, উম্মে কুলসুম বিনতে আবি বকর।
তিনি রাসুলুল্লাহ দঃ এর শাশুড় ছিলেন
জীবিকাপন্থা: আবু বকর (রাঃ) ছিলেন তার পিতার একমাত্র সন্তান। অত্যন্ত আদর যত্নে তিনি লালিত পালিত হন। শৈশব থেকে যৌবন পর্যন্ত পিতার উপর নির্ভরশীল ছিলেন। ২০বছর বয়সে পিতার সকল ব্যাবসা বানিজ্য নিজের কাঁধে তুলে নেন।
রাসুল দঃ এর সঙ্গীঃ শৈশব থেকে নবীজির সাথে সিদ্দিকে আকবরের বন্ধুত্ব ছিল..তিনি নবীজির অধিকাংশ বানিজ্য সফরের সঙ্গী ছিলেন।
কোন পরামর্শ করতে হলে নবীজি তাকে নিয়েই পরামর্শ করতেন। রাসুল দঃ সাধারণত দাওয়াত কিংবা তাবলীগের উদ্দেশ্য কোথাও গেলে তিনিই সাথে থাকতেন।
রাসুল দঃ এর প্রতি তার অগাধ বিশ্বাসঃ নবীজির নবুওয়াত লাভের ঘোষণায় মুক্কার মধ্য হৈ চৈ শুরু হয়ে যায়। মক্কার প্রভাবশালী ধনী ব্যাক্তিরা নবীজির বিরুদ্ধে কোমড় বেধে লেগে যায়। সবাই নবীজীকে জিয়ে ঠাট্টা করতে থাকে। কুরাইশদের ধনী এবং উচ্চব্যাক্তিদের মধ্য একমাত্র সিদ্দিকে আকবরই তার সংগ দেন। তাকে সাহস দেন এবং বিনা দ্বিধায় তার নবুওতের প্রতি ইমান আনেন। এ প্রসঙ্গে নবীজি বলেন, আমি যাকেই ইসলামের দাওয়াত দিয়েছি, আবু বকর ছাড়া প্রত্যকের মাঝে দ্বিধা লক্ষ করেছি।
এভাবেই তিনি বনে গেলেন বয়স্ক আযাদ লোকদের মধ্য প্রথম মুসলমান
ইসলাম প্রচার ও সিদ্দিকে আকবর: মুসলমান হওয়ার পর ইসলামের ভিত্তি সুদৃঢ় করার লক্ষ্য তিনি রাসুল দঃ এর সাথে দাওয়াতী কাজে আত্মনিয়োগ করেন। মক্কার আশেপাশের গোত্রসমূহে তিনি ইসলামের দাওয়াত দিতেন। হজ্জের মৌসুমে বিভিন্ন তাবুতে গিয়ে তিনি ইসলামের দাওয়াত দিতেন। বহিরাগত লোকদের কাছে ইসলাম ও নবীজির পরিচয় তুলে ধরতেন। তার ব্যাক্তিগত প্রভাব ও প্রচেষ্টায় তৎকালীন কুরাইশ বংশের বিশিষ্ট যুবক উসমান, যুবাইর, আব্দুর রহমান, সাদ ও তালহার মতো ব্যাক্তিরা সহ আরো অনেকে ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেন।
ইসলামের জন্য আর্থিক সহযোগিতাঃ রাসুল দঃ যখন নবুয়তের প্রকাশ্য ঘোষণা দেন তখন তার কাছে চল্লিশ হাজার দিরহাম ছিল। ইসলামের জন্য তিনি সকল সম্পদ ওয়াক্বপ করে দেন। কুরাইশদের যেসব দাস-দাসী ইসলাম ধর্ম গ্রহনের জন্য নির্যাতিত হচ্ছিল এ অর্থ দ্বারা তিনি সেই সব দাস -দাসী খারীদ করে আজাদ করে দেন.তেরো বছর পর তিনি যখন রাসুল দঃ এর সাথে মদিনায় হিজরত করেন। তার নিকট উক্ত দিরহাম হতে মাত্র আড়াই হাজার দিরহাম অবশিষ্ট থাকে। অল্পকিছুদিনের মধ্য বাকি অর্থগুলাও ইসলামের খেদমতে খরচ করা হয়। বিলাল, খাব্বাব,আম্মার, আম্মারের মা সুমাইয়া, সোহাইব আবক ফুকাইহ প্রমুখ দাস দাসীর আজাদের পিছনের তারই হাত রয়েছে। তার অর্থ দ্বারাই তার দাসত্বের শিকল হতে মুক্তি পাই।
এ বিষয়ে নবীজি বলেন, আমি প্রতিটি মানুষের ইহসান পরিশোধ করেছি, একমাত্র আবু বকরের ইহসানসমূহ পরিশোধ করতে পারিনি। কারণ আমি তার অবদান পরিশোধ করতে অক্ষম। তার প্রতিদান আল্লাহ দেবেন, তার অর্থ আমার যেমন উপকারে এসেছে, অন্য কারো অর্থ তেমন উপকারে আসেনি।
সিদ্দিক উপাধি লাভ: রাসুল দঃ এর মিরাজের কথা শুনে সবাই যখন বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝে দোল খাচ্ছিল, তখন তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে এর প্রতি বিশ্বাস করেন।
যুদ্ধে অংশগ্রহণ: আবু বকর (রা.) একজন একনিষ্ঠ সহচর হিসেবে মুহাম্মদ (সা.) এর সহযোগিতা করেছেন। তার জীবদ্দশায় আবু বকর বেশ কয়েকটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তাবুকের যুদ্ধে তিনি তার সমস্ত সম্পদ দান করে দেন। হুদায়বিয়ার সন্ধিতে আবু বকর অংশ নিয়েছিলেন এবং তিনি ছিলেন এই চুক্তির অন্যতম সাক্ষী নবীজির পর খেলাফত লাভ: মুহাম্মদ (সা.) এর মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকার নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়।
মুহাজির ও আনসাররা নিজেদের মধ্য থেকে নেতা নির্বাচনের পক্ষে ছিল। কিছু গোত্র পুরনো প্রথা অনুযায়ী গোত্রভিত্তিক নেতৃত্ব ব্যবস্থায় ফিরে যেতে চায়। আনসাররা সাকিফা নামক স্থানে একত্রিত হয়ে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করে। এরপর আবু বকর, উমর ও আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ এখানে আসেন। সভার আলোচনায় এক পর্যায়ে উমর ইবনুল খাত্তাব আবু বকরের প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করেন এবং আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহও তার অণুসরণ করেন। এরপর বাকিরাও আবু বকরকে নেতা হিসেবে মেনে নেয়। সুন্নিরা তাকে “খলিফাতুর রাসুল” বা “আল্লাহর রাসুলের উত্তরাধিকারী” বলে সম্মান করে থাকে। তবে শিয়ারা আবু বকরকে বৈধ খলিফা বলে স্বীকার করে না। শিয়া মতাদর্শ অনুযায়ী আলি ইবনে আবি তালিব প্রথম খলিফা হিসেবে যোগ্য।
শাসনকাল: আবু বকরের খিলাফত ২৭ মাস অর্থাৎ দুই বছরের কিছু বেশি সময় স্থায়ী ছিল। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে তাকে বেশ কিছু অস্থিতিশীলতার সম্মুখীন হতে হয় এবং তিনি তা সফলভাবে মোকাবেলা করেন। নতুন নবী দাবিকারী বিদ্রোহীদেরকে তিনি রিদ্দার যুদ্ধেদমন করেছেন। তিনি বাইজেন্টাইন ও সাসানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন যা ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পরবর্তীতে উমর ইবনুল খাত্তাব এবং উসমান ইবনে আফফান এই অভিযান অব্যাহত রেখেছিলেন। এসব অভিযানের ফলে মুসলিম সাম্রাজ্য কয়েক দশকের মধ্যে শক্তিশালী হিসেবে আবির্ভূত হয়। খলিফা হওয়ার পর তিনি অন্যান্যদের পরামর্শক্রমে তার কাপড়ের ব্যবসা ছেড়ে দেন এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ভাতা গ্রহণ করতেন।
কুরআন সংকলন: আবু বকর সর্বপ্রথম গ্রন্থাকারে কুরআন সংকলন করেন। ইতিপূর্বে কুরআনের বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্নভাবে লিপিবদ্ধ ছিল। এছাড়াও হাফেজরা কুরআন মুখস্থ করে রাখতেন। ইয়ামামার যুদ্ধে অনেক হাফেজ শহিদ হলে উমর ইবনুল খাত্তাব গ্রন্থাকারে কুরআন সংকলনের জন্য আবেদন জানান। এই প্রথা মুহাম্মদ(সা.) এর সময় ছিল না বলে প্রথমে আবু বকর এতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু উমর তাকে রাজি করাতে সক্ষম হন। এজন্য জায়েদ ইবনে সাবিতকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এর সদস্যরা সবাই হাফেজ ছিলেন। তারা কুরআনের সকল অংশ সংগ্রহ করে একক গ্রন্থ হিসেবে লিপিবদ্ধ করেন এবং হাফেজদের স্মৃতির সাথে সেগুলো মিলিয়ে দেখা হয়।
মৃত্যুর আগে আবু বকর কুরআনের এই কপিটি তার উত্তরসূরি উমর ইবনুল খাত্তাবকে দিয়ে যান। উমরের শাসনকালে এটি তার কাছেই রক্ষিত ছিল। উমর কুরআনটি তার মেয়ে ও মুহাম্মদ (সা.) এর স্ত্রী হাফসা বিনতে উমরকে দিয়ে যান। পরবর্তী খলিফা উসমান ইবনে আফফান এই কুরআনের আরো প্রতিলিপি তৈরি করিয়ে তা খিলাফতের বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করেছিলেন।
কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা:
উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসুল (সাঃ) দিনে অন্তত একবার আবু বকরের বাড়ীতে আসতেন । যে দিন হিজরাতের অনুমতি পেলেন সেদিন দুপুরে আমাদের বাড়ীতে আসলেন, এমন সময় কখনো তিনি আসতেন না। তাঁকে দেখা মাত্র আবু বকর বলে উঠলেন, নিশ্চয় কিছু একটা ঘটেছে। তা নাহলে এমন সময় রাসুল (সাঃ) আসতেন না। তিনি বাড়ীতে প্রবেশ করলে আবু বকর তাঁর খাটের একধারে বসলেন। আবু বকরের বাড়ীতে তখন আমি আর আমার বোন আসমা ছাড়া আর কেউ ছিল না।
রাসুল (সাঃ) বললেন, তোমার এখানে অন্য যারা আছে তাদেরকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে দাও। আবু বকর বললেন, হে আল্লাহর রাসূলঃ আমার দুই মেয়ে ছাড়া আর কেউ নাই। আপনার কি হয়েছে? রাসুল (সাঃ) বললেন: আল্লাহ আমাকে হিজরাত করার অনুমতি দিয়েছেন। আবু বকর জিজ্ঞেস করলেন, আমিও কি সঙ্গে যেতে পারবো? রাসুল (সাঃ) বললেনঃ হ্যাঁ, যেতে পারবে। আয়িশা (রাঃ) বলেন, সে দিনের আগে আমি জানতাম না যে, মানুষ আনন্দের আতিশয্যেও এত কাঁদতে পারে। আমি আবু বকরকে (রাঃ) সেদিন কাঁদতে দেখেছি। অতঃপর আবু বকর (রাঃ) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! এই দেখুন, আমি এই উট দুটো এই কাজের জন্যই প্রস্তুত করে রেখেছি।
তিনি রাসুল (সাঃ) অধিকাংশ বাণিজ্য সফরের সঙ্গী ছিলেন। একবার রাসুল (সাঃ) এর সঙ্গে ব্যবসায় উপলক্ষে সিরিয়া যান। তখন তাঁর বয়ষ প্রায় আঠারো এবং রাসুল (সাঃ) এর বিশ। তাঁরা যখন সিরিয়া সীমান্তে; বিশ্রামের জন্য রাসুল (সাঃ) একটি গাছের নীচে বসেন। আবু বকর একটু সামনে এগিয়ে এদিক ওদিক দেখতে লাগলেন। এক থৃষ্টান পাদ্রীর সাথে তাঁর দেখা হয় এবং ধর্ম বিষয়ে কিছু কথা বলে।
আলাপের এক পর্যায়ে পাদ্রী জিজ্ঞেস করে, ওখানে গাছের নিচে কে? আবু বকর বললেন, এক কুরাইশ যুবক, নাম মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ্। পাদ্রী বলে উঠলো, এ ব্যাক্তি আরবদের নবী হবেন। কথাটি আবু বকরের অন্তরে গেঁথে যায়। তখন থেকেই তাঁর অন্তরে রাসুল (সাঃ) প্রকৃত নবী হওয়া সম্পর্কে প্রত্যয় দৃঢ় হতে থাকে । ইতিহাসে এ পাদ্রীর নাম ‘বুহাইরা’ বা ‘নাসতুরা’ বলে উল্লেখিত হয়েছে।
মৃত্যু ও দাফন: ১৩ হিজরীর ৭ জমাদিউল উখরা হযরত আবু বকর (রাঃ) জ্বরে আক্রন্ত হন। ১৫ দিন রোগাক্রান্ত থাকার পর হিজরী ১৩ সনের ২১ জামাদিউল উখরা মুতাবিক ৬৩৪ খৃষ্টাব্দের আগস্ট মাসে ইন্তিকাল করেন। হযরত আয়িশার (রাঃ) হুজরায় রাসুল (সাঃ) পাশের একটু পূর্ব দিকে তাঁকে দাফন করা হয়। তিনি দু’বছর তিন মাস দশ দিন খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেন।
তথ্যসূত্রঃ তার জীবনি, তার জীবনি লিখে শেষ করা সম্ভব নয়। এটা একটি ক্ষুদে চেস্টা মাত্র।

Leave a Reply