রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১০:২৫

খলিফা হযরত উসমান (রা:) এর জীবনী

খলিফা হযরত উসমান (রা:) এর জীবনী

আজ শুক্রবার। পবিত্র জুমাবার। আজকের বিষয় ‘খলিফা হযরত উসমান (রা:) এর জীবনী’। শীর্ষবিন্দু পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ‘ইসলাম বিভাগ প্রধান’ ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান।

হযরত উসমান (রা:) এর সংহ্মিপ্ত জীবনী
খোদায়ী বিধানের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত, দানশীলতায় অগ্রগামী, লজ্জাশীলতায় সর্বকালীন দৃষ্টান্ত, ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত ‘ওসমান ইবনে আফফান’ ৫৭৩ মতান্তরে ৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে মক্কার ঐতিহ্যবাহী কোরাইশ বংশের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

আল ইসতিয়াবের বর্ণনানুসারে ‘আমুল ফিল’-এর ছয় বছর পরে অর্থাৎ ৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম ‘আফফান’ ও মায়ের নাম আরওয়া বিনতে কোরাইশ। হযরত ওসমান (রা.)-এর বংশপরম্পরা পঞ্চম পুরুষ ‘আবদে মানাফ’-এ গিয়ে রাসুলে করিম (সা.)-এর বংশধারায় মিলিত হন।

তিনি ছিলেন মধ্যমাকৃতির অত্যন্ত সুদর্শন। ইবনে আসাকির আব্দুল্লাহ ইবনে হাজাম মাজেনি থেকে একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘হযরত ওসমান অপেক্ষা সুদর্শন কোনো পুরুষ আমি দেখিনি।’ হযরত ওসমান (রা.)-এর জীবনের প্রাথমিক অবস্থার ইতিহাস খুব সামান্যই সংরক্ষিত আছে। তবে যতটুকু জানা গেছে, জাহিলিয়াতের যুগে জন্ম হলেও জাহিলিয়াতের বীভৎসতা তাঁর চরিত্রকে কলুষিত করতে পারেনি।

ইসলাম গ্রহণের আগে তিনি ছিলেন হানিফ ঘরানার লোক। যাঁরা নিজের বিবেকের নির্দেশনায় খারাপ কাজ থেকে বিরত থেকেছেন। তিনি ছিলেন আরবের মুষ্টিমেয় শিক্ষিত লোকের একজন। তিনি ছিলেন কোরাইশ বংশের অন্যতম কুস্তিবিদ্যা বিশারদ। কোরাইশদের প্রাচীন ইতিহাস বিষয়েও তিনি ছিলেন গভীর জ্ঞানের অধিকারী। বংশীয় আভিজাত্যের ধারায় যৌবনে তিনি ব্যবসায় নিয়োজিত হন। সর্বোচ্চ সততা ও বিশ্বস্ততার দরুন অল্প সময়েই তিনি অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেন।

বিপুল ধন-ঐশ্বর্যের কারণে তিনি ‘গনি’ উপাধি লাভ করেন। মমতা, সহনশীলতা, আত্দমর্যাদাবোধ, দান ও লজ্জা ছিল তাঁর মহৎ চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এছাড়াও তিনি আশারায়ে মুবাশ্‌শারা’র একজন এবং সেই ৬ জন সাহাবীর মধ্যে অন্যতম যাদের উপর মুহাম্মদ আমরণ সন্তুষ্ট ছিলেন।

এক নজরে হযরত ওসমান (রাঃ)
পূর্ননামঃ উসমান ইবনে আফফান
জন্মঃ ৫৭৭ খিস্টাব্দ ।
পেশাঃ ব্যবসায়ী ।
উল্লেখযোগ্য পদবীঃ ইসলামের তৃতীয় খলিফা।
রাজত্বকালঃ ১১ নভেম্বর ৬৪৪ – ২০ জুন ৬৫৬।
সমাধিস্থলঃ জান্নাতুল বাকীর পিছনে কবর স্থান।
পূর্বসূরিঃ হযরত উমর (সাঃ)।
উত্তরসূরিঃ হযরত আলী (রাঃ)।
মৃত্যুঃ ৬৫৬ খ্রীষ্টাব্দের ২০ জুন।

ওসমান (রাঃ) এর পরিবার ও বংশ
উসমানের কুনিয়া আবু আমর, আবু আবদিল্লাহ, আবু লায়লা। তার উপাধি যুন-নূরাইন এবং যূল-হিজরাতাইন। তার পিতা আফ্‌ফান এবং মাতা আরওরা বিনতু কুরাইয। তিনি কুরাইশ বংশের উমাইয়্যা শাখার সন্তান ছিলেন। তার উর্ধ্ব পুরুষ আবদে মান্নাফে গিয়ে মুহাম্মদের বংশের সাথে মিলিত হয়েছে। তার নানী বায়দা বিনতু আবদিল মুত্তালিব ছিলেন মুহাম্মদের ফুফু।

ইসলাম গ্রহণের পর মুহাম্মদ তার কন্যা রুকাইয়্যার সাথে তার বিয়ে দেন। হিজরী দ্বিতীয় সনে তাবুক যুদ্ধের পরপর মদিনায় রুকাইয়্যা মারা যায়। এরপর নবী তার দ্বিতীয় কন্যা উম্মু কুলসুমের সাথে তার বিয়ে দেন। এ কারণেই তিনি মুসলিমদের কাছে যুন-নূরাইন বা দুই জ্যোতির অধিকারী হিসেবে খ্যাত। তবে এ নিয়ে কিছু মতভেদ রয়েছে। যেমন ইমাম সুয়ূতি মনে করেন ইসলাম গ্রহণের পূর্বেই ওসমানের সাথে রুকাইয়্যার বিয়ে হয়েছিল। তবে অধিকাংশ ইতিহাসবেত্তা এই ধারণা পরিত্যাগ করেছেন।

উসমান এবং রুকাইয়্যা ছিলেন প্রথম হিজরতকারী মুসলিম পরিবার। তারা প্রথম আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন। সেখানে তাদের একটি ছেলে জন্ম নেয় যার নাম রাখা হয় আবদুল্লাহ ইবন উসমান। এরপর উসমানের কুনিয়া হয় ইবী আবদিল্লাহ।

হিজরী ৪র্থ সনে আবদুল্লাহ মারা যায়। তাবুক যুদ্ধের পরপর রুকাইয়্যা মারা যান। এরপর উসমানের সাথে উম্মু কুলসুমের বিয়ে হয় যদিও তাদের ঘরে কোন সন্তান আসেনি। হিজরী নবম সনে উম্মু কুলসুমও মারা যান।

বোনঃ আমেনা
স্ত্রীঃ রোকাইয়া বিনতে মোহাম্মদ, উম্মে কুলসুম বিনতে মোহাম্মদ নায়লা, রামলা বিনতে সোয়াইবাত, ফাতিমা বিনতে আল ওয়ালিদ, ফাখতাহ্‌ বিনতে গাজওয়ান, উম্মে আল-বানিন বিনতে উনাইব, উম্মে আমর বিনতে যুনদুব।

ছেলেঃ আমরো,ওমার, খালিদ, আবান, আব্দুল্লাহ-আল-আসগর, আল-ওয়ালিদ, সাঈদ, আব্দুল মালিক।
মেয়েঃ মরিয়াম, উম্মে উসমান, আয়েশা, উম্মে আমর, উম্মে আবান আল কাবরি, আরবি, উম্মে খালিদ, উম্মে আবাল আল সাগরী।

প্রাথমিক জীবন ও ইসলাম গ্রহন
প্রাথমিক জীবন
অন্যান্য অনেক সাহাবীর মতই ইসলাম গ্রহণের পূর্বে উসমানের জীবন সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায়নি। জানা যায়, উসমান কুরাইশ বংশের অন্যতম বিখ্যাত কুষ্টিবিদ্যা বিশারদ ছিলেন। কুরাইশদের প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে তার অগাধ জ্ঞান ছিল। ইসলাম গ্রহণের পূর্বেও তার এমন বিশেষ কোন অভ্যাস ছিলনা যা ইসলামী নীতিতে ঘৃণিত।

যৌবনেকালে তিনি অন্যান্য অভিজাত কুরাইশদের মত যৌবনেকালে তিনি অন্যান্য অভিজাত কুরাইশদের মত ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসা খাতে তার সাফল্য ছিল ঈর্ষণীয়। মক্কার সমাজে একজন ধনী ব্যবসায়ী ছিলেন বলেই তার উপাধি হয়েছিল গনী যার অর্ধ ধনী।

ইসলাম গ্রহন
হযরত ওসমান (রা.) প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর উৎসাহে তিনি দ্বীনে ইসলাম গ্রহণ করেন যৌবনে, যখন তাঁর বয়স ত্রিশের কোটায়। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আমি ইসলাম গ্রহণকারী চারজনের মধ্যে চতুর্থ।’ হযরত আবু বকর, হযরত আলী ও জায়েদ বিন হারিসের পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।

কোরাইশ বংশের অত্যন্ত সম্মানিত ও বিত্তবান ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও ইসলাম গ্রহণ করার কারণে তাঁকে কাফিরদের অমানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। তাঁর চাচা ‘হাকাম ইবনে আবিল আস’ তাঁকে রশি দিয়ে বেঁধে বেদম প্রহার করত আর বলত, যতক্ষণ পর্যন্ত মুহাম্মদ (সা.)-এর ধর্ম ত্যাগ না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোকে ছাড়া হবে না।’

সীমাহীন নির্যাতনের পরও তাঁর ইমান একটুও টলেনি। মুশরিকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সর্বপ্রথম মুসলমানদের যে দলটি হাবশায় হিজরত করেছিল, হযরত ওসমান ও তাঁর স্ত্রী রুকাইয়াও সে দলের সদস্য ছিলেন। হাবশায় দুই বছর অবস্থানের পর তিনি মক্কায় ফিরে আসেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মদিনা হিজরতের পর তিনি আবার মদিনায় হিজরত করেন। সে কারণে তাঁকে ‘জুল হিজরাতাইন’ বলা হয়।

হুদাইবিয়া সন্ধি ও ওসমান (রাঃ) এর অবদান
হুদাইবিয়া সন্ধির পটভূমি কা’বা ছিলো ইসলামের মূল কেন্দ্র। এটি আল্লাহর নির্দেমানুক্রমে হযরত ইবরাহীম (আ) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ) নির্মাণ করেছিলেন। মুসলমানরা ইসলামের এই কেন্দ্রস্থল থেকে বেরোবার পর ছয়টি বছর অতিক্রান্ত হয়েছিলো। পরন্ত হ্‌জ্জ ইসলামের অন্যতম মৌল স্তম্ভ হওয়া সত্ত্বেও তারা এটি পালন করতে পারছিলো না। তাই কা’বা শরীফ জিয়ারত ও হজ্জ উদযাপন করার জন্যে মুসলমানদের মনে তীব্র বাসনা জাগলো।

কা’বা জিয়ারতের জন্যে সফর
আরবরা সাধারণত তামাম বছরব্যাপী যুদ্ধে মেতে থাকতো। কিন্তু হজ্জ উপলক্ষে লোকেরা যাতে শান্তিপূর্ণভাবে কা’বা পর্যন্ত যাতায়াত করতে এবং নিশ্চিন্তে আল্লাহর ঘরের জিয়ারত সম্পন্ন করতে পারে, এজন্যে চার মাসকাল তারা যুদ্ধ বন্ধ রাখতো। ষষ্ঠ হিজরীর জিলকদ মাসে হযরত (স) কা’বা জিয়ারতের সিদ্ধান্ত নিলেন। এহেন সৌভাগ্য লাভের জন্যে বহু আনসার ও মুহাজির প্রতীক্ষা করছিলো। তাই চৌদ্দ শ’ মুসলমান হযরত (স)-এর সহগামী হলেন। যুল হুলায়ফা নামক স্থানে পৌঁছে তাঁরা কুরবানীর প্রাথমিক রীতিসমূহ পালন করলেন।

এভাবে সবাইকে জানিয়ে দেয়া হলো যে, মুসলমানদের উদ্দেশ্য শুধু কা’বা শরীফ জিয়ারত করা, কোনোরূপ যুদ্ধ বা আক্রমণের অভিসন্ধি নেই। তবুও কুরাইশদের অভিপ্রায় জেনে আসবার জন্যে হযরত (স) এক ব্যক্তিকে মক্কায় প্রেরণ করলেন। সে এই মর্মে খবর নিয়ে এলো যে, কুরাইশরা সমস্ত গোত্রকে একত্রিত করে মুহাম্মদ (স)-এর মক্কায় প্রবেশকে বাধা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমন কি, তারা মক্কার বাইরে এক জায়গায় সৈন্য সমাবেশ করতেও শুরু করেছে এবং মুকাবিলার জন্যে সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে আছে।

কুরাইশদের সঙ্গে আলোচনা
এই সংবাদ জানার পরও হযরত (স) সামনে অগ্রসর হলেন এবং হুদাইবিয়া নামক স্থানে পৌঁছে যাত্রা বিরতি করলেন। এ জায়গাটি মক্কা থেকে এক মঞ্জিল দূরে অবস্থিত।৪৫ এখানকার খোজায়া গোত্রের প্রধান হযরত (স)-এর খেদমতে হাযির হয়ে বললো : ‘কুরাইশরা লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুতি নিয়েছে। তারা আপনাকে মক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না।’ হযরত (স) বললেন : ‘তাদেরকে গিয়ে বলো যে, আমরা শুধু হজ্জের নিয়্যাতে এসেছি, লড়াই করার জন্য নয়। কাজেই আমাদেরকে কা’বা শরীফ তাওয়াফ ও জিয়ারত করার সুযোগ দেয়া উচিত।’ কুরাইশদের কাছে যখন এই পয়গাম গিয়ে পৌঁছলো, তখন কিছু দুষ্ট প্রকৃতির লোক বলে উঠলো : ‘মুহাম্মদের পয়গাম শোনার কোনো প্রয়োজন আমাদের নেই।’ কিন্তু চিন্তাশীল লোকদের ভেতর থেকে ওরওয়া নামক এক ব্যক্তি বললো : ‘না, তোমরা আমার উপর নির্ভর করো; আমি গিয়ে মুহাম্মদ (স)-এর সঙ্গে কথা বলছি।’ ওরওয়া হযরত (স)-এর খেদমতে হাযির হলো বটে, কিন্তু কোনো বিষয়েই মীমাংসা হলো না। ইতোমধ্যে কুরাইশরা মুসলমানদের ওপর হামলা করার জন্যে একটি ক্ষুদ্র বাহিনী প্রেরণ করলো এবং তারা মুসলমানদের হাতে বন্দীও হলো; কিন্তু হযরত (স) তাঁর স্বভাবসুলভ করুণার বলে তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন এবং তাদেরকে মুক্তি দেয়া হলো। এর পর সন্ধির আলোচনা চালানোর জন্যে হযরত উসমান (রা) মক্কায় চলে গেলেন; কিন্তু কুরাইশরা মুসলমানদেরকে কা’বা জিয়ারত করার সুযোগ দিতে কিছুতেই রাযী হলো না; বরঞ্চ তারা হযরত উসমান (রা)-কে আটক করে রাখলো।

রিযওয়ানের শপথ
এই পর্যায়ে মুসলমানদের কাছে এই মর্মে সংবাদ পৌঁছলো যে, হযরত উসমান (রা) নিহত হয়েছেন। এই খবর মুসলমানদেরকে সাংঘাতিকভাবে অস্থির করে তুললো। হযরত (স) খবরটি শুনে বললেন : ‘আমাদেরকে অবশ্যই উসমান (সা)-এর রক্তের বদলা নিতে হবে।’ একথা বলেই তিনি একটি বাবলা গাছের নীচে বসে পড়লেন। তিনি সাহাবীদের কাছ থেকে এই মর্মে শপথ গ্রহণ করলেন : ‘আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো, তবু লড়াই থেকে পিছু হটবো না। কুরাইশদের কাছ থেকে আমরা হযরত উসমান (রা)-এর রক্তের বদলা নেবোই।’

এই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা মুসলমানদের মধ্যে এক আশ্চর্য উদ্দীপনার সৃষ্টি করলো। তারা শাহাদাতের প্রেরণায় উদ্দীপ্ত হয়ে কাফিরদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যে প্রস্তুত হলেন। এরই নাম হচ্ছে ‘রিযওয়ানের শপথ’। কুরআন পাকেও এই শপথের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সে সব ভাগ্যবান ব্যক্তি এ সময় হযরত (স)-এর পবিত্র হাতে হাত রেখে শপথ গ্রহণ করেছিলেন, আল্লাহ তা’আলা তাঁদেরকে পুরস্কৃত করার কথা বলেছেন।

হুদাইবিয়া সন্ধির শর্তাবলী
মুসলমানদের এই উৎসাহ-উদ্দীপনার কথা কুরাইশদের কাছেও গিয়ে পৌঁছলো। সেই সঙ্গে এ-ও জানা গেলো যে, হযরত উসমান (রা)-এর হত্যার খবর সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। এই পরিস্থিতিতে কুরাইশরা সন্ধি করতে প্রস্তুত হলো এবং এ সম্পর্কে আলোচনা করার জন্যে সুহাইল বিন্‌ আমরকে দূত বানিয়ে পাঠালো। তার সঙ্গে দীর্ঘ সময়ব্যাপী আলোচনা হলো এবং শেষ পর্যন্ত সন্ধির শর্তাবলী স্থিরিকৃত হলো।

সন্ধিপত্র লেখার জন্যে হযরত আলী (রা)-কে ডাকা হলো। সন্ধিপত্রে যখন লেখা হলো ‘এই সন্ধি আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (স)-এর তরফ থেকে তখন কুরাইশ প্রতিনিধি সুহাইল প্রতিবাদ জানিয়ে বললো : ‘আল্লাহর রাসূল’ কথাটি লেখা যাবে না; এ ব্যাপারে আমাদের আপত্তি আছে।’ একথায় সাহাবীদের মধ্যে প্রচন্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হলো।

সন্ধিপত্র লেখক হযরত আলী (রা) কিছুতেই এটা মানতে রাযী হলেন না। কিন্তু হযরত (স) নানাদিক বিবেচনা করে সুহাইলের দাবি মেনে নিলেন এবং নিজের পবিত্র হাতে ‘আল্লাহর রাসূল’ কথাটি কেটে দিয়ে বললেন : ‘তোমরা না মানো, তাতে কি? কিন্তু খোদার কসম, আমি তাঁর রাসূল।’ এরপর নিম্নোক্ত শর্তাবলীর ভিত্তিতে সন্ধি-চুক্তি স্বাক্ষরিত হলোঃ

১. মুসলমানরা এ বছর হজ্জ না করেই ফিরে যাবে।
২. তারা আগামী বছর আসবে এবং মাত্র তিন দিন থেকে চলে যাবে।
৩. কেউ অস্ত্রপাতি নিয়ে আসবে না। শুধু তলোয়ার সঙ্গে রাখতে পারবে: কিন্তু তাও কোষবদ্ধ থাকবে, বাইরে বের করা যাবে না।
৪. মক্কায় সে সব মুসলমান অবশিষ্ট রয়েছে, তাদের কাউকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবে না। আর কোনো মুসলমান মক্কায় ফিরে আসতে চাইলে তাকেও বাধা দেয়া যাবে না।
৫. কাফির বা মুসলমানদের মধ্য থেকে কেউ মদীনায় গেলে তাকে ফেরত পাঠাতে হবে। কিন্তু কোনো মুসলমান মক্কায় গেলে তাকে ফেরত দেয়া হবে না।
৬. আরবের গোত্রগুলো মুসলমান বা কাফির যে কোনো পক্ষের সাথে সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করতে পারবে।
৭. এ সন্ধি-চুক্তি দশ বছরকাল বহাল থাকবে।

হুদাইবিয়া সন্ধির প্রভাব
সন্ধি-চুক্তি সম্পাদিত হবার পর হযরত (স) সেখানেই কুরবানী করার জন্যে লোকদেরকে হুকুম দিলেন। সর্বপ্রথম তিনি নিজেই কুরবানী করলেন। সন্ধি চুক্তি সম্পাদনের পর হযরত (স) তিন দিন সেখানে অবস্থান করলেন। ফিরবার পথে সূরা ফাতাহ নাযিল হলো। তাতে এই সন্ধির প্রতি ইঙ্গিত করে এতে ‘ফাতহুম মুবীন’ বা সুস্পষ্ট বিজয় বলে অভিহিত করা হলো।

যে সন্ধি-চুক্তি মুসলমানরা চাপে পড়ে সম্পাদন করলো, তাকে আবার ‘সুস্পষ্ট বিজয়’ বলে আখ্যা দেয়া দৃশ্যত একটি বেখাপ্পা ব্যাপার ছিলো। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্টত প্রমাণ করে দিলো যে, ইসলামের ইতিহাসে হুদাইবয়ার সন্ধি ছিলো একটি বিরাট বিজয়ের সূচনা মাত্র। এর বিস্তৃত বিবরণ হচ্ছে নিম্নরূপ:

এতদিন মুসলমান ও কাফিরদের মধ্যে পুরোপুরি একটা যুদ্ধংদেহী অবস্থা বিরাজ করছিলো। উভয় পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক মেলামেশার কোনোই সুযোগ ছিলো না। এই সন্ধি-চু্‌ক্তি সেই চরম অবস্থার অবসান ঘটিয়ে রুদ্ধ দুয়ার খুলে দিলো।

এরপর মুসলমান ও অমুসলমানরা নির্বাধে মদীনায় আসতে লাগলো। এভাবে তারা এই নতুন ইসলামী সংগঠনের লোকদেরকে অতি নিকট থেকে দেখার ও জানার সুযোগ পেলো। এর পরিণতিতে তারা বিস্ময়কর রকমে প্রভাবিত হতে লাগলো। যে সব লোকের বিরুদ্ধে তাদের মনে ক্রোধ ও বিদ্বেষ পুঞ্জীভূত হয়েছিলো, তাদেরকে তারা নৈতিক চরিত্র, আচার-ব্যবহার ও স্বভাব-প্রকৃতির দিক দিয়ে আপন লোকদের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত মানের দেখতে পেলো।

তারা আরো প্রত্যক্ষ করলো, আল্লাহর যে সব বান্দাহর বিরুদ্ধে তারা এদ্দিন যুদ্ধংদেহী মনোভাব পোষণ করে আসছে, তাদের মনে কোনে ঘৃণা বা শত্রুতা নেই; বরং তাদের যা কিছুই ঘৃণা, তা শুধু বিশ্বাস ও গলদ আচার-পদ্ধতির বিরুদ্ধে। তারা (মুসলমানরা) যা কিছুই বলে,তার প্রতিটি কথা সহানুভূতি ও মানবিক ভাবধারায় পরিপূর্ণ। এতো যুদ্ধ-বিগ্রহ সত্ত্বেও তারা বিরুদ্ধবাদীদের সঙ্গে সহানুভূতি সদাচরণের বেলায় কোনো ত্রুটি করে না।

এরূপ মেলামেশার ফলে ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের সন্দেহ ও আপত্তিগুলো সম্পর্কে সরাসরি আলোচনা করাও প্রচুর সুযোগ হলো। এতে করে ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমরা কতোখানি ভ্রান্ত ধারণায় নিমজ্জিত ছিলো, তা তারা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারলো।

মোটকথা, এই পরিস্থিতি এমনি এক আবহাওয়ার সৃষ্টি করলো যে, অমুসলিমদের হৃদয় স্বভাবতঃই ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হতে লাগলো। এর ফলে সন্ধির-চুক্তির মাত্র দেড়-দুই বছরের মধ্যে এতো লোক ইসলাম গ্রহণ করলো যে, ইতঃপূর্বে কখনো তা ঘটেনি। এরই মধ্যে কুরাইশদের কতিপয় নামজাদা সর্দার ও যোদ্ধা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হলো এবং অমুসলিমদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে মুসলমানদের সঙ্গে হাত মিলালো।

হযরত খালিদ বিন্‌ অলিদ (রা) এবং হযরত আমর বিন্‌ আস (রা) এ সময়ই ইসলাম গ্রহণ করলেন। এর ফলে ইসলামের প্রভাব-বলয় এতোটা বিস্তৃত হলো এবং তার শক্তিও এতোটা প্রচণ্ড রূপ পরিগ্রহ করলো যে, পুরনো জাহিলিয়াত স্পষ্টত মৃত্যু-লক্ষণ দেখতে লাগলো। কাফির নেতৃবৃন্দ এই পরিস্থিতি অনুধাবণ করে অত্যন্ত শঙ্কিত হয়ে উঠলো। তারা স্পষ্টত বুঝতে পারলো, ইসলামের মুকাবিলায় তাদের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। তাই অনতিবিলম্বে সন্ধি-চুক্তি ভেঙে দেয়ার এবং এর ক্রমবর্ধমান সয়লাবকে প্রতিরোধ করার জন্যে আর একবার ইসলামী আন্দোলনের সাথে ভাগ্য পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ তারা খুঁজে পেলো না।

খলিফা মনোনীত হওয়ার ইতিহাস
হযরত ওমর (রা.) যখন ছুরিকাহত হয়ে মৃত্যুশয্যায়, তখন তাঁর কাছে পরবর্তী খলিফা মনোনয়নের দাবি উত্থাপিত হলে তিনি বলেন, তোমাদের সামনে এমন একটি দল রয়েছে, যাদের সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তাঁরা জান্নাতের অধিবাসী। তাঁরা হলেন হযরত আলী, ওসমান, আব্দুর রহমান, সাদ, জুবাইর ও তালহা। তাঁদের যেকোনো একজনকে খলিফা নির্বাচিত করতে হবে।

হযরত ওমর (রা.)-এর মৃত্যুকালীন উপরিউক্ত উক্তি থেকে এ কথাই প্রমাণিত হয়, আদর্শের মানদণ্ডে উন্নীত রাসুল (সা.)-এর জবানে জান্নাতের বাশারাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই খিলাফতের যোগ্যতম উত্তরাধিকারী। অর্থাৎ উপরিউক্ত ব্যক্তিদের আয়ুষ্কাল পর্যন্তই ‘খিলাফত আলা মিনহাজিন নবুয়্যাহ’ সীমাবদ্ধ।

হযরত ওমর (রা,) উলি্লখিত ছয়জনকে নিয়ে একটি বোর্ড গঠন করে তিন দিনের সময় বেঁধে দিয়ে বললেন, ‘আমার মৃত্যুর পর তাঁরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিজেদের যেকোনো একজনকে ঐকমত্যের ভিত্তিতে খলিফা মনোনীত করবেন।’ হযরত ওমর (সা.)-এর ইন্তেকাল হলো। বোর্ড সদস্যরা রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসলেন, তুমুল তর্ক-বিতর্ক, বাগ্বিতণ্ডা চলল। সময় গড়িয়ে দুই দিন পেরিয়ে গেল। মসজিদে নববি লোকে লোকারণ্য।

শেষদিনে আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) বললেন, ‘আমি আমার খিলাফতের দাবি ত্যাগ করছি। এবার তোমরা তোমাদের মধ্যে যোগ্যতম ব্যক্তি নির্বাচনের দায়িত্ব আমাকে অর্পণ করতে পারো।’ সবাই খলিফা নির্বাচনের ক্ষমতা আব্দুর রহমানকে অর্পণ করলেন। তিনি সম্ভ্রান্ত সবার সঙ্গে পরামর্শ করলেন। অতঃপর ওমর (রা.) কর্তৃক বেঁধে দেওয়া সময়ের শেষ দিনে ফজরের নামাজের পর মসজিদে নববিতে সমবেত মদিনাবাসীর উদ্দেশে এক সংক্ষিপ্ত ভাষণের পর তিনি খলিফা হিসেবে হযরত ওসমান (রা.) এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন, অতঃপর সবাই। এভাবে মানবতাবাদী, ক্ষুধা-দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সদাতৎপর, বিনয় ও ভদ্রতার অবতার হযরত ওসমান (রা.) খিলাফতের দায়িত্ব লাভ করেন।

খলিফা হিসেবে হযরত ওসমান (রাঃ)
দ্বায়িত্ত গ্রহনের পরে হযরত উসমান (রাঃ) তা’লা পুরো রাজ্য জুড়ে বেশ ক’জন নির্দেশকারী তথা দূত নিযুক্ত করেছিলেন। তাদের দ্বায়িত্ব ছিলো হযরত উমর (রাঃ) এর প্রণয়নকৃত আইনসমূহ কে অধিষ্ঠান করা। উসমান (রাঃ) এর রাজত্ব বিস্তৃত করেছিলেন পশ্চিম থেকে পুরো মরোক্কো পর্যন্ত, পূর্ব দক্ষিন পূর্ব তথা বর্তমান পাকিস্তান পর্যন্ত এবং উত্তর আমেরিকা থেকে আজারবাইজান পর্যন্ত।

উসমান (রাঃ) এর রাজত্বকালে তিনিই সর্বপ্রথম ইসলামিক নৌবাহিনি গড়ে তুলেছিলেন। উনার রাজত্বকালে তিনি প্রশাসনিক বিভাগ সমূহ কে সংশোধন করেছিলেন এবং অনেক জন-প্রকল্প কে তিনি প্রসারন করেছিলেন, অনেক প্রকল্প কে সম্পূর্ন করেছিলেন নিজের রাজত্বকালেই। তার রাজত্বকালে শ্রীলংকা তেও ইসলাম ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে দূত পাঠিয়েছিলেন।

ওসমান (রাঃ) এর শাসনকালে উন্নয়ন
বিপুল ধন-ঐশ্বর্যের মালিক হযরত ওসমান (রা.) মুসলিম জাহানের খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পরও অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন। হযরত হাসান (রা.) থেকে বর্ণিত_তিনি বলেন, হযরত ওসমান (রা.) মসজিদে নববিতে মাথার নিচে চাদর দিয়ে শুয়ে থাকতেন। মানুষ তাঁর পাশে এসে বসত। তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলতেন। মনে হতো তিনি তাদেরই একজন। জুবাইর ইবনে আব্দুল্লাহ বর্ণনা করেন, ‘হযরত ওসমান সারা বছর রোজা রাখতেন এবং সারা রাত নামাজ পড়তেন। রাতের প্রথমার্ধে একটু ঘুমাতেন।’

হযরত ওসমান (রা.) তাঁর শাসনামলের প্রথমদিকে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সামরিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে প্রভূত সাফল্য অর্জন করেন। তাঁর জনহিতকর কার্যাবলি সমাজের আদল পরিবর্তন করে দিয়েছিল। তিনি মদিনা শহর রক্ষাবাঁধ ‘মাহরু’ নির্মাণ করেন। খাল খনন করে কৃষিতে প্রভূত উন্নতি সাধন করেন। পয়ঃপ্রণালী ও রাস্তাঘাট নির্মাণ করে জনগণের অত্যন্ত প্রিয় খলিফায় পরিণত হন। মসজিদে নববির আধুনিকায়ন করেন তিনি। তাঁর সময় অর্থনৈতিক সচ্ছলতা মদিনার ঘরে ঘরে পেঁৗছে গিয়েছিল।

আগে জনগণকে প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য খলিফার শরণাপন্ন হতে হতো। আর হযরত ওসমান (রা.)-এর সময় বাইতুল মালের সম্পদ খরচের জন্য রীতিমতো এলান করে গ্রাহক খোঁজা হতো। হযরত হাসান (রা.) বলেছেন, ওসমান (রা.)-এর ঘোষক ঘোষণা করত, হে লোক সব, সবাই এসে তোমাদের ভাতা নিয়ে যাও। লোকেরা দলে দলে এসে প্রচুর সম্পদ নিয়ে যেত। মানুষ দামি দামি পোশাক পরত।

হযরত ওমর (রা.) ইসলামী খিলাফতের সম্প্রসারণে যে অভিযান শুরু করেছিলেন, হযরত ওসমান (রা.)-এর সুযোগ্য নেতৃত্বে তা এগিয়ে যেতে থাকে। তাঁর সময় ইসলামী খিলাফত-পূর্বে কাবুল ও বেলুচিস্তান এবং পশ্চিমে ত্রিপলী পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। তাঁর সময়ই প্রথম নৌবাহিনী গঠিত হয়। নৌ-অভিযানে সাইপ্রাস ও রোডস দ্বীপপুঞ্জ মুসলমানদের অধিকারে আসে। তাঁর সময়ই বাইজান্টাইন ও পারস্য শক্তির ঔদ্ধত্য সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা হয়।

হযরত ওসমান (রা.) বিশ্ব মুসলিমের জন্য সব থেকে বড় যে অবদানটি রেখে গেছেন, তা হলো পবিত্র কোরআন সংকলন। তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে কোরআন পাঠে ভিন্নতা লক্ষ করে একটি নির্ভুল সংস্করণ তৈরির উদ্যোগ নেন। একটি উপযুক্ত কমিটির তত্ত্বাবধানে হযরত হাফসার (রা.) কাছে সংরক্ষিত কোরআনের কপিকে মূল ধরে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তা সম্পন্ন করে এর কপি মুসলিম সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং মানুষের কাছে থাকা কোরআনের বিচ্ছিন্ন অংশগুলো সংগ্রহ করে তা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।

আল-কুরআন সংকলনে অবদান
কোন আয়াত বা সূরা নাযিলের পরপর সাহাবাদের মুখস্ত করতে ও লিখে রাখতে নির্দেশ দেয়া হত। এটা বলা ভুল যে হযরত ওসমান (রাঃ) কুরআন সংকলন করেছেন প্রকৃতপক্ষে রাসুল (সাঃ)-এর জীবিতকালে কুরআন সংকলন ও সংরক্ষিত হয়েছিল। যখন কোন আয়াত রাসুল (সাঃ) এর প্রতি নাযিল হতো তিনি অনতিবিলম্বে তা মুখস্ত করে নিতেন এবং সাহাবাদের শোনাতেন এবং তাদেঁর মুখস্ত করতে ও লিখে রাখতে নির্দেশ দিতেন,এবং তিনি সাহাবাদের পড়িয়ে শোনাতে বলতেন শুদ্ধতা যাচাই করতেন অর্থাৎ সাহাবীদের স্মরন শক্তি পরীক্ষা করে দেখতেন । তিনি সাহাবাদের সুরার ধারাবাহিকতা বলে রাখতেন ,যেমন-প্রথম যে সুরা নাযিল হয়েছে সুরা ইকরা যা পবিত্র কুরআনে ৯৬নং সূরা যা তিনি জীবরঈল (আঃ) এর মাধ্যমে জানতে পেরেছেন । বর্তমানে যে পর্যায় ক্রমিক সূরায় কুরআন সংকলিত আছে তার অনুরূপ ‘লাওহে মাহফুজে’ লিপিবদ্ধ রয়েছে। প্রতি রমজানে রাসুল (সাঃ) জীবরাঈল (আঃ) দ্বারা পুনরাবৃত্তি করতেন । তাঁর মৃত্যুকালীন বছরে রমজানের সময় তিনি দুবার পুনরাবৃত্তি করছিলেন।

কুরআন একত্রিকরন
কুরআন সংরক্ষিত হয়েছিল বিভিন্ন আঙ্গিকে-গাছের বাকলে,চমড়ায় ,উটের সেডলে ,সমতল পাথরে,গাছের পাতায়। ১ম খলীফা আবু বকর (রাঃ) এর খিলাফত কালে ইয়ামামার যুদ্ধে বহু কুরআনে হাফেজ শহীদ হন। হযরত আবু বকর (রাঃ) ও ওমর (রাঃ) সাহাবীগনের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে যয়িদ-বিন-সাবিদ(রাঃ)-কে কুরআন সংকলনের জন্য দায়িত্ব প্রদান করেন। সব সাহাবীদের একসাথে করে যয়িদ-বিন-সাবিদ (রাঃ) সব কুরআনের আয়াতকে একসাথে করেন। এরপর তা দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর (রাঃ) এর তত্তাবধানে আসলে তাঁর হাত হতে হযরত হাফসা (রাঃ) এর নিকট পৌঁছায়।

হযরত ওসমান (রাঃ) খিলাফতকাল
তৃতীয় খলীফা হযরত ওসমান (রাঃ)এর সময় ইসলাম যখন প্রসার লাভ করছিল । বিভিন্ন স্থানের মধ্যে উচ্চারনগত সমস্যা দেখা দেয়ায় তিনি বিভিন্ন দেশের কুরআন হাফেজ এবং সংকলকদেরকে ডেকে পাঠান ও হযরত হাফসা(রাঃ) এর নিকট হতে সংরক্ষিত কুরআন লিখে রাখতে বলেন ও তা সম্প্রচার করতে বলেন আর বাকী কুরআন তিনি পুড়িয়ে ফেলতে নির্দেশ দেন, কারন সব সাহাবীদের পক্ষে সমস্ত কুরআনের আয়াত সংরক্ষিত ছিলনা কারো কাছে ছিল ৫০০ আয়াত বা তার কম বা বেশি। পূর্বের কুরআনে হুবহু তুর্কির ফাত্তাকি যাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে ।

আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন , (সূরা হিজর-১৫,আয়াত-৯) ‘‘আমরা কুরআন অবতীর্ন করেছি এবং আমরাই এর সংরক্ষনকারী।’’

দানশীলতা
সমাজের ভুখা-নাঙ্গা মানুষের প্রতি হযরত ওসমান (রা.) ছিলেন সর্বদা দরাজহস্ত। একবার মদিনায় বড় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এমন সময় খবর এল ওসমানের (রা.) ব্যবসার এক হাজার উট বোঝাই খাদ্যশস্য আমদানির পথে। মদিনার ব্যবসায়ীরা এসে ওসমান (রা.)-এর বাড়িতে ভিড় জমান। তিনি তাঁদের সংরক্ষণাগারে নিয়ে গেলেন, যেখানে সারি সারি খাদ্যশস্যভর্তি বস্তা সাজানো ছিল।

তিনি তাঁদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা আমাকে কী লাভ দেবে?’ তাঁরা বললেন, ১০ টাকা ক্রয় মূল্যের ওপর দুই টাকা। তিনি বললেন, ‘আমি আরো বেশি লাভ পেতে পারি।’ তাঁরা দাম বাড়াতে বাড়াতে ১০ টাকায় পাঁচ টাকা দিতে সম্মত হলো। হযরত ওসমান (রা.) বললেন, ‘আমি দশে দশ লাভ পেতে পারি।’

অতঃপর তিনি ঘোষণা করলেন_’তোমরা সাক্ষী থাকো, আমি সব খাদ্যশস্য মদিনার অভাবি লোকদের সদকা করে দিলাম।’ এভাবে সমাজের ক্ষুধা-দারিদ্র্য দূর করতে তিনি তাঁর বিপুল ঐশ্বর্য অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন।

৬৩০ খ্রিস্টাব্দে হিরাক্লিয়াস মদিনার বিরুদ্ধে লক্ষাধিক সৈন্যের এক সুসজ্জিত বাহিনী প্রেরণ করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলমানদের যুদ্ধ প্রস্তুতির জন্য যুদ্ধ তহবিলে সামর্থ্যানুযায়ী সবাইকে দান করতে বলেন। হযরত ওসমান (রা.) সে সময় এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা, এক হাজার উট ও ৭০টি ঘোড়া সরবরাহ করেন।

রাসুল (সা.)-এর পরিবারের জন্যও তাঁর সম্পদ ছিল উন্মুক্ত। ঘৃণ্য দাসপ্রথা উচ্ছেদে তাঁর ভূমিকা ছিল সর্বাধিক। তিনি প্রতি জুমাবার একটি করে গোলাম অথবা বন্দি মুক্ত করে দিতেন। কারণবশত কোনো শুক্রবার না পারলে পরবর্তী শুক্রবারে দুটি দাস মুক্ত করে দিতেন।

রাসুল (সঃ) এর বন্ধু
আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে হযরত ওসমান (রা.)-এর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। মানবতার কল্যাণে জীবন ও সম্পদ উৎসর্গকারী এ সাহাবি সম্পর্কে রাসুলে খোদা (সা.) বলেছেন, ‘উসমান হলো তাঁদেরই একজন, যাঁরা আল্লাহ ও রাসুলকে বন্ধু ভাবেন এবং আল্লাহ ও রাসুল তাঁদের বন্ধু ভাবেন।’

রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথমে নিজের মেয়ে হযরত খাদিজার (রা.) গর্ভজাত সন্তান রুকাইয়াকে ওসমান (রা.)-এর সঙ্গে বিবাহ দেন। হযরত রুকাইয়ার ইন্তেকাল হলে তাঁর সহোদরা উম্মে কুলসুমকে হযরত ওসমান (রা.)-এর সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। রাসুল (সা.)-এর দুই মেয়েকে বিয়ের কারণে তাঁকে ‘জিননুরাইন’ বলা হয়।

উম্মে কুলসুমের ইন্তেকালের পর রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমার যদি আরো একটি মেয়ে থাকত, তাহলে তাকেও আমি ওসমানের সঙ্গে বিয়ে দিতাম।’ তিনি রাসুল (সা.)-এর নির্দেশে পীড়িত স্ত্রী রুকাইয়ার সেবায় মদিনায় অবস্থানের কারণে একমাত্র বদর ছাড়া সব যুদ্ধেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে অংশ নেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে একাধিকবার জান্নাতের শুভ সংবাদ দিয়েছেন। রাসুলে করিম (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক নবীরই বন্ধু থাকে, জান্নাতে আমার বন্ধু হবে ওসমান।’ তিনি ছিলেন রাসুল (সা.)-এর কাতেবে ওহি দলের অন্যতম।

মৃত্যুর পূর্বের পেক্ষাপট ও মৃত্যু
হযরত ওসমান (রা.) খিলাফতের মসনদে আসীন হয়েই বড় ধরনের এক সমস্যার সম্মুখীন হন। ‘উবায়দুল্লাহ ইবনে উমার’ হযরত ফারুকে আজমের হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে কয়েকজন নাসারা ও মুনাফিক প্রকৃতির মুসলমানকে হত্যা করেন। বিষয়টি খলিফার সামনে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার পূর্বাভাস হিসেবে আবির্ভূত হলো।

হযরত ওসমান (রা.) নিজের সম্পদ থেকে নিহতদের ওয়ারিশদের রক্তপণ দেওয়ার মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহা করলেন। ফলে মুসলমানদের ভেতরের সব বিভেদের অবসান হয়। হযরত ওসমান (রা.) অত্যন্ত জনপ্রিয় খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যেতে লাগলেন। কিন্তু খলিফার সরলতা, সহিষ্ণুতা ও উদারতার সুযোগে স্বার্থান্বেষী চক্র হযরত ওসমান (রা.)-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে।

বনি হাশিম ও বনি উমাইয়ার বিরোধ, কোরাইশ-অকুরাইশ দ্বন্দ্ব, মুহাজির-আনসার সম্প্রীতি বিনষ্ট, ইবনে সাবরে অপপ্রচার, অমুসলিমদের বিদ্বেষ ইত্যাদি কারণে মুসলিম সাম্রাজ্যে এক চরম সংঘাতময় অবস্থার সৃষ্টি হলো। খিলাফতের অষ্টম বছরে এসে হযরত ওসমান (রা.) স্বজনপ্রীতি, কোরআন দগ্ধীকরণ, চারণভূমির রক্ষণাবেক্ষণ, আবুজর গিফারির নির্বাসন, বাইতুল মালের অর্থ অপচয় ইত্যাদি অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে বিরুদ্ধবাদীদের চরম বিরোধিতা ও বিদ্রোহের সম্মুখীন হন।

হযরত আলী (রা.)-এর সমর্থকদের অপপ্রচার বিদ্রোহের আগুনে ইন্ধন হিসেবে কাজ করে। অথচ খলিফার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগই ছিল মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও অবাস্তব। হাম্মাদ ইবনে সালামা বর্ণনা করেন, ‘ওসমান (রা.) যেদিন খলিফা নির্বাচিত হন, সেদিন তিনি সর্বোত্তম ব্যক্তি ছিলেন। আর যখন তাঁকে লোকেরা হত্যা করল, তিনি সেদিন থেকেও উত্তম ছিলেন যেদিন তাঁকে খলিফা বানানো হয়েছিল।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলে গেছেন, ‘আল্লাহ পাকের হিকমতানুসারে জিননুরাইনের ওপর মতানৈক্য দেখা দেবে এবং লোকেরা তাঁকে শহীদ করবে। অথচ তিনি তখন হকের ওপরই থাকবেন এবং তাঁর বিরোধীরা থাকবে বাতিলের ওপর।’

শেষ পর্যন্ত মিসর, বসরা ও কুফার বিদ্রোহী গোষ্ঠী একাট্টা হয়ে ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় সমবেত হয়ে খলিফার পদত্যাগ দাবি করে। হজ উপলক্ষে অধিকাংশ মদিনাবাসী মক্কা গমন করায় তারা এ সময়কেই মোক্ষম সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। খলিফা পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানালে তারা হত্যার হুমকি দিয়ে তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখে। হযরত ওসমান (রা.) রক্তপাতের সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন। বিশাল মুসলিম জাহানের খলিফা হিসেবে মুষ্টিমেয় বিদ্রোহীর কঠোর শাস্তিদানের পরিবর্তে তিনি তাদের দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে থাকলেন।

হযরত আলী, তালহা ও জুবাইর (রা.)-এর ছেলেদের দ্বারা গঠিত ১৮ নিরাপত্তারক্ষী বিপথগামী বিদ্রোহীদের মোকাবিলায় ব্যর্থ হন। অবশেষে তারা ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জুন হিজরি ৩৫ সনের ১৮ জিলহজ্জ শুক্রবার আসরের নামাজের পর ৮২ বছর বয়স্ক বৃদ্ধ খলিফাকে অত্যন্ত বর্বরভাবে হত্যা করে। তিনি ১২ দিন কম ১২ বছর খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেন। জুুবাইর ইবনে মুতইম (রা.) তাঁর জানাজায় ইমামতি করেন। জান্নাতুল বাকিতে তাঁকে দাফন করা হয়।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026