বুধবার রাতে মারা গেছেন ভারতের অন্যতম শিল্পপতি রতন টাটা। বার্ধক্যজনিত সমস্যা নিয়ে মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। বুধবার রাতে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর।
ভারতীয় ধনকুবের রতন টাটার মৃত্যুর পরই প্রশ্ন ওঠেছে কে হচ্ছেন নিঃসন্তান টাটার উত্তরসূরি। কেননা একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও বিয়ে করেননি তিনি। তাহলে কে পেতে পারেন টাটা গ্রুপের গুরু দায়িত্ব? কে হবেন তার বিশাল সম্পদের উত্তরাধিকারী?
ভারতের শিল্প জগতের অনন্য রত্ন ছিলেন রতন টাটা। সাধারণ জীবনযাপনের জন্য পরিচিত ছিলেন। ভারতের মহীরুহ শিল্পপতির ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও অবশ্য কম চর্চা হয়নি। কেন তিনি আজীবন অবিবাহিত ছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বার বার।
রতন টাটা তার প্রেমজীবনের কথা প্রকাশ্যে এনেছিলেন নিজেই। জানিয়েছিলেন, তার মনের দরজায় প্রেম কড়া নাড়িয়েছিল চার বার। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তা পূণর্তা পায়নি। তাই এর পর আর বিয়ের কথা ভাবেননি তিনি। মনপ্রাণ সব দিয়েছিলেন টাটা গোষ্ঠীকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দিকে।
শিল্পপতি এক সাক্ষাত্কারে জানিয়েছিলেন, তার কোনও প্রেমই বিয়ের পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি। তবে তিনি এও জানিয়েছিলেন, পরবর্তী কালে বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত তার জন্য সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছিল। কারণ তিনি যদি বিয়ে করতেন তা হলে নাকি পরিস্থিতি খুবই জটিল হয়ে যেত।
রতন টাটা ওই সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘যদি আপনি জিজ্ঞাসা করেন যে, আমি কখনও প্রেমে পড়েছি কি না, তবে আমি আপনাকে বলব যে, বিয়ে করার বিষয়ে আমি চার বার গুরুত্ব সহকারে ভেবেছিলাম এবং প্রতি বারই কোনও না কোনও কারণে পিছিয়ে গিয়েছিলাম।’’
রতন টাটা এ-ও জানিয়েছিলেন, তিনি যখন আমেরিকায় কাজ করছিলেন, সেই সময় এক নারীর প্রেমে পড়েন তিনি। খুব কম সময়েই পোক্ত হয় সেই সম্পর্ক। ঠিক করেছিলেন, অর্ধাঙ্গিনী হিসাবে যদি কাউকে বেছে নেন, তা হলে তাকেই নেবেন। তবে সেই সম্পর্কও টেকেনি। রতন টাটা ভারতে ফিরে আসার কারণে বিয়ে করতে পারেননি তারা। ভারতীয় শিল্পপতি জানিয়েছিলেন, তিনি দেশে ফিরলেও ভারতে আসতে চাননি তার বান্ধবী।
পাশাপাশি সেই সময় ভারত-চিন যুদ্ধও চলছিল। অবশেষে, তার বান্ধবী আমেরিকায় অন্য এক জনকে বিয়ে করেন। মন ভাঙে রতন টাটার। পুরো মনোযোগ টাটা গোষ্ঠীর দিকে দেন তিনি। কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে অনুযায়ী, এক সময় বলিউড অভিনেত্রী সিমি গারেওয়ালের কাছাকাছি এসেছিলেন শিল্পপতি রতন টাটা। সম্পর্কেও জড়িয়েছিলেন তারা। জনসমক্ষে রতনকে নিয়ে প্রশংসা করতে দেখা যেত অভিনেত্রীকে। রতন ব্যক্তিগত জীবনে মানুষ হিসাবে কেমন ছিলেন, তাও ভাগ করতেন সিমি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, বিদেশে থাকার সময় রতনকে যেমন চিন্তামুক্ত দেখায়, দেশে ফিরলে সে রকম থাকেন না তিনি।
সিমি বলেছিলেন, ‘‘আমি আর রতন একসঙ্গে অনেকটা পথ হেঁটেছি। পুরুষ মানুষ হিসাবে ও নিখুঁত। ওর বোধও দুর্দান্ত। এত ভদ্র মানুষ খুব কম দেখতে পাওয়া যায়। অর্থ ওকে কোনও দিনও চালনা করেনি।’’
তবে, রতন টাটার সঙ্গে সিমির সম্পর্কের মেয়াদ খুবই কম সময়ের। ১৯৭০ সালে রবি মোহনকে বিয়ে করেন ‘মেরা নাম জোকার-’এর অভিনেত্রী।
বিয়ের আগে তিন মাস ‘লং ডিসট্যান্স রিলেশনশিপ’-এ থাকার পর ২৭ বছর বয়সে রবির সঙ্গে সাত পাকে বাঁধা পড়েন তিনি। কিন্তু তাদের সম্পর্ক যে বেশি দিন টিকবে না, তা আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন সিমি। তবে কেন রতন-সিমির সম্পর্ক এগোয়নি তা জানা যায়নি। বাকি কোন দুই নারী রতন টাটার মন জয় করেছিলেন, সে বিষয়েও জানা যায় না কিছু।
লিয়া টাটা, মায়া টাটা এবং নেভিল টাটা হলেন রতন টাটার সৎ ভাই নোয়েল টাটার সন্তান। নোয়েল টাটা হলেন রতনের বাবা নেভাল টাটা এবং সৎ মা সিমোনের সন্তান।
মায়া টাটা
৩৪ বছর বয়সি মায়া টাটা গ্রুপে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছেন। বেইজ বিজনেস স্কুল এবং ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মায়া টাটা অপরচুনিটিজ ফান্ড এবং টাটা ডিজিটালের প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। টাটা নিউ অ্যাপ চালু করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন মায়া।
নেভিল টাটা
মায়া টাটা ছাড়াও আরও একজনের নাম শোনা যাচ্ছে। ৩২ বছর বয়সি নেভিল টাটা পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। টয়োটা কির্লোস্কর গ্রুপ পরিবারের মানসী কির্লোস্করের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন নেভিল। ট্রেন্ট লিমিটেডের অধীনে শীর্ষস্থানীয় হাইপারমার্কেট চেইন স্টার বাজারের প্রধান তিনি।
লিয়া টাটা
বয়সের দিক থেকে ৩৯ বছরের লিয়া টাটা সবার থেকে বড়। তিনি টাটা গ্রুপের হাসপিটালিটি সেক্টরে কাজ করেন। স্পেনের আইইতে পড়াশোনা করা লিয়া তাজ হোটেল রিসোর্টগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বর্তমানে ইন্ডিয়ান হোটেল কোম্পানির কার্যকলাপ তিনি পরিচালনা করেন।
উল্লেখ্য, ভারতের ধনকুবের রতন টাটা মুম্বাইতে জন্ম নেন ১৯৩৭ সালে। বুধবার (৯ অক্টোবর) রাতে মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দীর্ঘ জীবনকালে শিল্পপতি হিসেবে একের পর এক নজির গড়েছেন। তার ঝুলিতে রয়েছে ‘পদ্মভূষণ’ এবং ‘পদ্মবিভূষণ’ সম্মাননা। তথ্য বলছে, তিনি রেখে গেছেন ৩৮০০ কোটি রুপির সম্পত্তি।
২০১১ সালে একটি সাক্ষাৎকারে রতন টাটা বলেছিলেন, তার জীবনে চার বার বিয়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নানা কারণে পিছিয়ে আসতে হয় তাকে। একাধিক সম্পর্কে জড়ালেও শেষ পর্যন্ত বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি রতন টাটা। তাই শেষদিন পর্যন্ত কুমার থেকে গেলেন। ছোটবেলা বাবা-মায়ের বিচ্ছেদই রতন টাটার মধ্যে বিয়ের ভীতি তৈরি করেছে বলে অনেকের ধারণা।
Leave a Reply