আজ শুক্রবার। পবিত্র জুমাবার। আজকের বিষয় ‘আরাবী ১ম মাস মুহাররম’। শীর্ষবিন্দু পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ‘ইসলাম বিভাগ প্রধান’ ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান।
আল্লাহ্ তাআলার নির্ধারিত সম্মানিত মাস এবং হিজরী বর্ষের প্রথম মাস ‘মহররম’ শব্দের অর্থ সম্মানিত। ইসলামের ইতিহাসে এই মাসের সঙ্গে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এসব স্মৃতির সম্মানার্থে এই মাসকে মহররম বা সম্মানিত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
কোরআন কারিমে রয়েছে, ‘আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা ১২, এর মধ্যে ৪টি মাস (মহররম, রজব, জিলকদ, জিলহজ) সম্মানিত’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ৩৬)। হাদিসে মহররমকে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ বলা হয়েছে (তাফসিরে মাজহারি)।
মহানবী (সা.)–এর হিজরতের বছরকে প্রথম বছর ধরে হজরত উমর (রা.)–এর খিলাফতকালে ইসলামি সন গণনার সূচনা হয়। হিজরি সনের সঙ্গে মুসলিম উম্মাহ তাহজিব তামাদ্দুন ও ঐতিহ্যগতভাবে সম্পৃক্ত। মুসলমানদের ধর্মীয় বিধিবিধান ও ইবাদত–বন্দেগি চান্দ্র তারিখের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তাই আরবি তারিখ চর্চায় রাখার জন্য হিজরি নববর্ষ উদ্যাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হিজরি নববর্ষ উদ্যাপন প্রিয় নবীজি (সা.)–এর হিজরতের বিরহ–বিচ্ছেদ যন্ত্রণাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, নবীপ্রেমে উজ্জীবিত করে।
আগে মুসলমানদের জন্য আশুরার রোজা ফরজ ছিল। দ্বিতীয় হিজরিতে শাবান মাসে রমজানের রোজা ফরজ হলে আশুরার রোজা সুন্নত হয়ে যায়। তবে সুন্নত রোজার মধ্যে আশুরার রোজা সর্বাধিক ফজিলতপূর্ণ আশুরা অর্থ দশম তারিখ।
ইসলামি পরিভাষায় মহররমের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়। পবিত্র আশুরা ইসলামের অন্যতম ফজিলতপূর্ণ দিন। সৃষ্টির শুরু থেকে ১০ মহররম তথা আশুরার দিনে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা এই দিনে আদম (আ.)–কে সৃষ্টি করেছেন। এই দিনে নুহ (আ.)–এর প্লাবন সমাপ্ত হয়। এদিন ইব্রাহিম (আ.) জালিম বাদশাহ নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে ৪০ দিন পর নিরাপদে মুক্তি পান।
এদিন ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পান। এই দিনে আইয়ুব (আ.) রোগমুক্তি লাভ করেন। এই দিনে সুলায়মান (আ.) তাঁর হারানো রাজত্ব ফিরে পান। এই দিনে ইয়াকুব (আ.) হারানো পুত্র ইউসুফ (আ.)–কে ৪০ বছর পর ফিরে পান।
এই দিনে ঈসা (আ.) জন্মগ্রহণ করেন এবং এদিনেই তাঁকে দুনিয়া থেকে আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হয়। আশুরার দিনে আরও বহু ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছিল।
এই দিনে প্রথম মানব আদি পিতা আদম-কে সৃষ্টি করেন আল্লাহ। আদম-কে এদিনেই স্বর্গ বা জান্নাতে স্থান দেয়া হয় এবং পরবর্তীতে এই দিনেই পৃথিবীতে পাঠিয়ে আল্লাহ তাকে প্রতিনিধি মনোনীত করেছেন।
নূহ-এর সময়কালে এই দিনে মহাপ্লাবন হয়। ইব্রাহীম জন্ম নেন এই দিনে এবং মূসা ও তার সাথীরা ফেরাউনের কবল থেকে উদ্ধার পানও এই দিনে।
হিজরী বর্ষের সর্বপ্রথম মাস- মুহাররামুল হারাম তথা মুহাররম মাস। হাদীসের ভাষায়- শাহরুল্লাহ আলমুহাররাম।
আল্লাহ তাআলা বছরের যে ক’টি মাসকে বিশেষ মর্যাদায় মহিমান্বিত করেছেন মুহাররম তার অন্যতম। পবিত্র কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা বলেন- اِنَّ عِدَّةَ الشُّهُوْرِ عِنْدَ اللهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِیْ كِتٰبِ اللهِ یَوْمَ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضَ مِنْهَاۤ اَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ؕ ذٰلِكَ الدِّیْنُ الْقَیِّمُ. فَلَا تَظْلِمُوْا فِیْهِنَّ اَنْفُسَكُم …
আল্লাহ যেদিন আসমান যমীন সৃষ্টি করেছেন সেদিন থেকেই মাসসমূহের গণনা আল্লাহ তাআলার নিকট তাঁর বিধান মতে বারটি।
তন্মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। এটাই সহজ-সরল দ্বীন (-এর দাবি) অতএব তোমরা এ দিনগুলোতে নিজের উপর জুলুম করো না।… -সূরা তাওবা (৯) : ৩৬
এ চার মাস কী কী? হাদীস শরীফে তা বলে দেওয়া হয়েছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- সময়ের হিসাব যথাস্থানে ফিরে এসেছে, আসমান-যমীনের সৃষ্টির সময় যেমন ছিল।
(কারণ, জাহেলী যুগে আরবরা নিজেদের স্বার্থ ও মর্জিমতো মাস-বছরের হিসাব কম-বেশি ও আগপিছ করে রেখেছিল।) বার মাসে এক বছর । এর মধ্য থেকে চারটি মাস সম্মানিত।
তিনটি মাস ধারাবাহিক- যিলকদ, যিলহজ্ব ও মুহাররম। আরেকটি হল রজব, যা জুমাদাল আখিরাহ ও শাবানের মধ্যবর্তী মাস। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৬৬২
হাদীসে এ মাসকে শাহরুল্লাহ তথা আল্লাহর মাস বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। হযরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- أَفْضَلُ الصِّيَامِ، بَعْدَ رَمَضَانَ، شَهْرُ اللهِ الْمُحَرّمُ، وَأَفْضَلُ الصَلَاةِ، بَعْدَالْفَرِيضَةِ، صَلَاةُ اللّيْلِ.
রমযানের পর সবচে উত্তম রোযা হল আল্লাহর মাস মুহাররমের রোযা। আর ফরয নামাযের পর সবচে উত্তম নামায হল রাতের নামায (অর্থাৎ তাহাজ্জুদের নামায)। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৬৩
আরো ইরশাদ হয়েছে- وَأَفْضَلُ الْأَشْهُرِ شَهْرُ اللهِ الَّذِي تَدْعُونَهُ الْمُحَرّمُ.
(রমযানের পর) শ্রেষ্ঠ মাস হচ্ছে আল্লাহর মাস, যাকে তোমরা মুহাররম বলে থাক। -সুনানে কুবরা, নাসাঈ, হাদীস ৪২১৬
প্রকৃতপক্ষে সকল মাসই তো আল্লাহর মাস। তথাপি এ মাসকে বিশেষভাবে ‘আল্লাহর মাস’ বলে ব্যক্ত করার মাঝে রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। যেমন পৃথিবীর সকল মসজিদই আল্লাহর ঘর।
কিন্তু কাবা শরীফকে বিশেষভাবে বাইতুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর বলার হেকমত কী? কারণ এর রয়েছে বিশেষ মর্যাদা। তেমনি বছরের অন্যান্য মাস অপেক্ষা মুহাররমের রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব।
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদে হিজরী সময়ের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন- یَسْـَٔلُوْنَكَ عَنِ الْاَهِلَّةِ قُلْ هِیَ مَوَاقِیْتُ لِلنَّاسِ وَ الْحَجِّ. লোকেরা আপনার কাছে নতুন চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে।
আপনি তাদেরকে বলে দিন, এটা মানুষের (বিভিন্ন কাজ-কর্মের) হিসাব এবং হজ্বের সময় নির্ধারণ করার জন্য। -সূরা বাকারা (২) : ১৮৯
মুসলমানদের বহু দ্বীনী বিষয়, বিশেষ করে হজ্বের মতো মহিমান্বিত আমল নির্ভরশীল চাঁদের হিসাবের উপর। আরবী মাস-বছরকে ঘিরে ইসলামের বহু বিধান আবর্তিত হয়।
এই আরবী হিজরী চান্দ্রবর্ষের প্রথম মাসটিই হচ্ছে মুহাররম। মুহাররমকে ঘিরেও রয়েছে শরীয়তের সুন্দর সুন্দর বিধান ও আমল।
ফলে দ্বীনী দায়িত্ববোধ থেকেই হিজরী মাস-বর্ষের গণনা এবং এর শুরু-শেষের হিসাবের প্রতি যত্নবান হওয়া মুমিনের জন্য সবিশেষ কাম্য।

Leave a Reply