আজ শুক্রবার। পবিত্র জুমাবার। আজকের বিষয় ‘দিনের আলো’। শীর্ষবিন্দু পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ‘ইসলাম বিভাগ প্রধান’ ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ রাত-দিন ও সূর্য-চন্দ্র সৃষ্টি করেছেন, সব কিছু নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করে।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৩৩)
একজন মুসলমানের দিনের সূচনা হবে সুবহে সাদিক থেকে, নিদেনপক্ষে সূর্য উঠার আগে। এভাবে সে ফজরের নামাজান্তে ভোরের শুভ্র হাওয়া এবং নির্মল প্রাকৃতিক সজীবতা গায়ে মাখতে পারে।
সকালের পরিবেশ এত সতেজ এবং কোমল থাকার রহস্যই হচ্ছে, সকালের সম্পূর্ণ সময়টাই থাকে মুনাফিকমুক্ত। মুনাফিকদের এই সময়টা কাটে গভীর নিদ্রায় বিভোর থেকে।
মূলতঃ দুই শ্রেণির লোক রাত জাগে। একটি শ্রেণি আল্লাহর ভয়ে রুকু, সিজদা এবং তিলাওয়াত আর ক্রন্দনে অতিবাহিত করে রাতের অধিকাংশ সময়, বিশেষ করে রহমতের বৃষ্টিস্নাত রজনীর শেষ প্রহর।
রাতের বেশিরভাগ সময় ইবাদত বন্দেগীতে কাটানোর কারণে ফজরের নামাজ আদায়ের পরের সময়টাতে কিছু সময় এদের বিশ্রামের প্রয়োজন হয়।
আর দ্বিতীয় শ্রেণিটির অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত। রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে অবাধ্যচারিতায় বিভোর হয়ে ওঠে এরা। দুষ্কর্ম এবং বৈধ কিংবা অবৈধ প্রত্যেক আনন্দ উল্লাসকে এরা সর্বোতভাবে ভোগ করতে চায়।
দিনের আলোয় এদের চেনা যায় না। পোশাকে আষাকে পরিপাটি। পুরোদস্তুর ভদ্রলোকের মুখোশের আড়ালে এরাই হয়ে ওঠে রাতের দুষ্কৃতকারী। চুরি, ডাকাতিসহ নানাবিধ অপকর্মে জড়িত হয়ে শেষ মেষ অপরাধবোধের মাত্রাজ্ঞানই ভুলে যায় এরা।
মুনাফিক শ্রেণির সাথে সখ্যতা রাখা এই দলের অপরাধীদের দিনের সূচনাই হয়ে থাকে সকালের কোমলতার অবসানে, প্রভাতের প্রশান্তিদায়ক হিমেল বাতাসের মৃদু পরশের পরিসমাপ্তির পরে।
আল্লাহ তা’আলা বলেছেন: তুমি বলো, তোমরা ভেবে দেখেছ কি, আল্লাহ যদি তোমাদের ওপর রাতকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত স্থায়ী করে দেন, তবে আল্লাহ ছাড়া আর মাবুদ কে আছে, যে তোমাদের আলো এনে দিতে পারে?
তবে কি তোমরা শুনতে পাও না? তুমি বলো, তোমরা ভেবে দেখেছ কি, আল্লাহ যদি তোমাদের ওপর দিনকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত স্থায়ী করে দেন, তবে আল্লাহ ছাড়া আর মাবুদ কে আছে, যে তোমাদেরকে একটি রাত এনে দেবে, যাতে তোমরা বিশ্রাম করবে? তবে কি তোমরা দেখতে পাও না? (সূরা কাসাস: ৭১-৭২)।
দিনের আলোয় মানুষ নানা রকম কাজ-কর্মে জড়িয়ে থাকে। রাতের একটি বড় অংশ কেটে যায় বিশ্রামে। দিনের আলো সরিয়ে নিজের জায়গা করে নেয় রাতের অন্ধকার। এই যে আলো-আঁধারের আবর্তন, মানুষের স্বাভাবিক জীবনে তা যে কতটা প্রভাব বিস্তারকারী, উপরোক্ত আয়াত দু’টিতে সেদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।
আয়াত দু’টি থেকে এ-ও প্রতীয়মান হয়, কাজকর্ম আর পরিশ্রমের ক্লান্তি শরীর থেকে ঝেড়ে ফেলার জন্য উপযুক্ত সময় রাতই, ঠিক যেমন আয়-উপার্জনের জন্যে উপযুক্ত সময় দিন।
সূরা কাসাসের পরবর্তী আয়াতটিতেই আল্লাহ তা’আলা বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছেন: আপন মেহেরবানীতেই তিনি তোমাদের জন্য রাত ও দিন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা রাতে বিশ্রাম করতে পার আর (দিনে) তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার; এবং যাতে তোমরা শোকর আদায় করতে পার। (সূরা কাসাস: ৭৩)।
দিনের আলোতে আমরা যে কেবলই অর্থ উপার্জন করি এমন নয়। দিনের আলোর রয়েছে নানাবিদ উপকার। এ বিষয়টি আধুনিক গবেষণাতেও প্রমাণিত। মানুষের শরীরের অতি প্রয়োজনীয় ভিটামিন ডি-এর প্রধান উৎস সূর্যের আলো।
এ আলোতে শোভাময় হয়ে ওঠে বিভিন্ন ধরনের ফল-ফসলের বাগান। এ আলো যেখানে পর্যাপ্ত থাকে না, সেখানকার ফসলও ভালো হয় না।
দিনে-রাতে এই যে আল্লাহ তা’আলা আমাদের জন্যে নানাবিদ কল্যাণ ছড়িয়ে রেখেছেন, পবিত্র কুরআনের একাধিক আয়াতে সংক্ষেপে বিষয়টি এভাবে বর্ণিত হয়েছে: তিনি তোমাদের কল্যাণে রাত ও দিনকে নিয়োজিত রেখেছেন। (সূরা ইবরাহীম: ৩৩)।

Leave a Reply