আজ শুক্রবার। পবিত্র জুমাবার। আজকের বিষয় ‘সিদরাতুল মুনতাহা’। শীর্ষবিন্দু পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ‘ইসলাম বিভাগ প্রধান’ ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান।
সিদরা (سِدْرَةٌ) আরবী শব্দ, অর্থ কুলগাছ। আল মুনতাহা (لمُنْتَهَى) অর্থ প্রান্তসীমা বা শেষ সীমা। সুতরাং ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ অর্থ প্রান্তস্থিত কুলবৃক্ষ। যা অতীব সুন্দর ও সুসজ্জিত। ফেরেশতাদের গমনাগমনের এটাই শেষ সীমা। এর উপরে আল্লাহর আরশ অবস্থিত।
আল্লাহর বিধানাবলী আরশ থেকে প্রথমে এখানে নাযিল করা হয়। সিদরাতুল মুনতাহা হল একটি বিশাল রহস্যময় কুল গাছ বা সিদর গাছ। যা সপ্তম আসমানের অর্থাৎ (লাবিয়্যাহ বা দামিয়াহ্) নামক আসমানের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। সেই সীমানার পরে কোনো সৃষ্টি বা মাখলুকাত অতিক্রম করতে পারে না, এমনকি ফেরেশতারাও সর্বোচ্চ সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত যেতে পারে।
অতঃপর সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট ফেরেশতাগণের মাধ্যমে দুনিয়াতে প্রেরিত হয়। অনুরূপভাবে বান্দাদের আমলনামা সমূহ প্রথমে এখানে নিয়ে আসা হয়। অতঃপর এখান থেকে আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। ফেরেশতা বা নবী-রাসূল কেউই এই স্থান অতিক্রম করতে পারেননি, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যতীত।
কুরআনে এ শব্দটি উল্লেখিত হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন: وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَىٰ -عِندَ سِدْرَةِ الْمُنتَهَىٰ – عِندَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَىٰ “নিশ্চয় সে তাকে আরেকবার দেখেছিল, সিদরাতুলমুন্তাহার নিকটে, যার কাছে অবস্থিত জান্নাতুল মা’ওয়া বসবাসের জান্নাত। (অর্থাৎ মিরাজের রাতে নবী সা. জিবরাঈলকে সেখানে প্রকৃত রূপে আরেকবার দেখেছিল) (সূরা নাজম: ১৩, ১৪ ও ১৫)”
প্রচলিত অর্থে সিদরাতুল মুনতাহা হচ্ছে মহাবিশ্বের শেষ প্রান্তসীমা। সিদরাতুল মুনতাহার অপর নাম রয়েছে দুটি। একটি কাল্বের প্রথম স্তর আর আরেকটি সুদূরের মাকাম। সিদরাতুল মুনতাহার পর থেকে শুরু হয় অবিনশ্বর বা শাশ্বত জগৎ।
সিদরাতুল মুনতাহার ফুল হাজার অঞ্চলের তৈরি মটকার ন্যায়, পাতাগুলো হাতির কানের ন্যায় আর এই গাছের রং অনবরত পরিবর্তন হতে থাকে। পৃথিবীতে আমরা সবাই যেসব রং দেখি, সেগুলো সাতটি রংধনুর সৃষ্টি রং। কিন্তু সিদরাতুল মুনতাহার রং অন্যরকম, সেটা বুঝানো অসম্ভব। সিদরাতুল মুনতাহার চারপাশে অনেক প্রজাপতি ঘোরাঘুরি করে।
সিদরাতুল মুনতাহার পাদদেশ থেকে চারটি নদী/ঝর্ণাধারা প্রবাহমান। দুটি নদী বাহিরে মানে পৃথিবীর দিকে আর বাকি দুটি নদী/ঝর্ণা ভিতরে প্রবাহিত। পৃথিবীতে প্রবাহিত নদী দুটির একটি ফোরাত নদী ও অপরটি হলো নীলনদ। ভিতরের দুটি নহরের একটি হাউজে আল কাওসার যা হাশরের মাঠের দিকে প্রবাহিত ও অপরটি সালসাবিল যা জান্নাতের একটি স্তর জান্নাতুল মাওয়ার দিকে প্রবাহিত। ইসরা ও মেরাজের সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ই একমাত্র এটি অতিক্রমের অনুমতি পান।
এই বর্ণনাটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সিদরাতুল মুনতাহা অতিক্রম করছিলেন সেই সময়ের। হাদীসে এসেছে: মিরাজের রাতে নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম ফিরে এসে সিদরাতুল মুনতাহা সম্পর্কে বলেছিলেন, “আমি সিদরাতুল মুনতাহা দেখলাম। এর ফল (বড়ই) যেন ‘হাজার’ নামক স্থানের (বড়) মটকার ন্যায়। আর তার পাতা যেন হাতীর কানের মতো বড়।
সিদরাতুল মুনতাহার মূল থেকে চারটি ঝরনা প্রবাহিত হয়েছে। দুইটি ঝরণা ভেতরে, আর দুইটি ঝরণা বাইরে। এই (চারটি ঝরণা) সম্পর্কে আমি জিবরাঈলকে জিজ্ঞাসা করলাম।
তিনি বললেন, ভেতরের দুইটি ঝরণা জান্নাতে অবস্থিত। আর বাইরের ঝরণা দুইটির একটি হল (ইরাকের) ফুরাত, আর অপরটি হল (মিশরের) নীল নদ। (হিলিয়াতুল আওলিয়া, ৩/৭২ এর সমার্থ বোধক হাদীসকে জামে সাহীহ গ্রন্থে ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন)

Leave a Reply