আব্দুল্লাহিল ওয়ারিশ |
রেলপথে নাশকতা প্রতিরোধে সারা দেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ১৮-দলীয় জোটের ডাকা হরতাল-অবরোধে দেশের বিভিন্ন স্থানে রেলপথে নাশকতার ফলে এর মধ্যে বেশ কয়েকটি বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে অনেক যাত্রী হতাহত হওয়ার পাশাপাশি নষ্ট হয়েছে যাত্রীদের মালামাল ও রেলের সম্পদ। এ কারণে রেল কর্তৃপক্ষ এ ব্যবস্থা নিয়েছে।
রেল পুলিশ-জিআরপি ঢাকা রেঞ্জের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার আবদুর রহমান প্রথম আলো ডটকমকে জানান, সারা দেশে রেললাইনে দুই কিলোমিটার অন্তর অন্তর দুই শিফটে চারজন করে আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
রেলে নাশকতার ঘটনায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় মোট ৩৭টি মামলা হয়েছে। আসামি করা হয়েছে প্রায় দেড় হাজার মানুষসহ অজ্ঞাতনামা অনেককে। নাশকতায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে শতাধিক মানুষকে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে রেলওয়ে লাইন ও ফিশপ্লেট খুলে ফেলা এবং রেললাইনে আগুন দিয়ে অবরোধ করে রাখে হরতাল-অবরোধকারীরা। এতে বেশ কয়েকটি ট্রেন দুর্ঘটনায় পড়ে। কয়েক জায়গায় হতাহতের ঘটনাও ঘটে।
রেলওয়ের ঢাকা রেঞ্জ অফিস ও সংশ্লিষ্ট জিআরপি থানা বলছে, গত ২৭ অক্টোবর থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রেললাইনে নাশকতার অভিযোগে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে লালমনিরহাট ও চাঁদপুর রেলওয়ে থানায়। এই দুটি থানায় ছয়টি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ ছাড়া গাইবান্ধার বোনারপাড়া রেলওয়ে থানায় পাঁচটি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া থানায় চারটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
দিনে রেললাইন পরীক্ষা করে দেখছেন রেলওয়ের এক কর্মী। ছবি: দুলাল ঘোষ, আখাউড়া
ঢাকা, জামালপুর, ঈশ্বরদী, সান্তাহার, জামালপুর ও লাকসাম রেলওয়ে থানায় দুটি করে মোট ১২টি এবং খুলনা, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও ভৈরব রেলওয়ে থানায় একটি করে মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় দেড় হাজারের বেশি মানুষসহ অজ্ঞাতনামা অনেককে আসামি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে পুলিশ বিভিন্ন এলাকা থেকে ১০৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে নিশ্চিত করেছে রেলওয়ে থানাগুলো।
গাইবান্ধার বোনারপাড়া: ৪ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে সান্তাহার-লালমনিরহাট রেল রুটের গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া রেলস্টেশনের অদূরে বুরুঙ্গি নামক স্থানে ট্রেনের ইঞ্জিন ও তিনটি বগি লাইনচ্যুত হয়। এতে চারজন নিহত ও অর্ধশতাধিক যাত্রী আহত হয়। দুর্বৃত্তরা রেলপথের ফিশপ্লেট ও ক্লিপ খুলে ফেলায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।এ ছাড়া ৩০ অক্টোবর, ১১, ২৭ ও ২৮ নভেম্বর বোনারপাড়া এলাকায় নাশকতা চালায় হরতাল-অবরোধের সমর্থকেরা। এসব ঘটনায় দায়ের করা পাঁচটি মামলায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান বোনারপাড়া রেলওয়ে থানার ওসি সাইদুর রহমান।
রেললাইন পাহারায় আনসার সদস্যরা। ছবি: আলমআখাউড়া: গত ২৬ অক্টোবর থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আখাউড়া এলাকায় চারটি নাশকতার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ৩০ অক্টোবর কসবা-ইমামবাড়ি সেকশনে রেললাইনের সেতুতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। ১০ নভেম্বর হরতালকারীরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনের পশ্চিম পাশে রেললাইনে ও স্টেশনে ৮-১০টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। এ সময় তাঁরা টিকিট কাউন্টার, যাত্রীদের অপেক্ষা কক্ষ ও স্টেশন মাস্টারের কক্ষে ভাঙচুর চালায়। ২৭ নভেম্বর ইমামবাড়ি স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনের তিনটি বগিতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। একই সঙ্গে রেললাইনও উপড়ে ফেলে তারা। একই দিন রাত তিনটার দিকে রেললাইনে নাশকতা চালায় দুর্বৃত্তরা। এ সব ঘটনায় চারটি মামলায় ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান আখাউড়া রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইদুল ইসলাম।
চাঁদপুর: চাঁদপুর-লাকসাম রেলপথের বিভিন্ন স্থানে গত ২৬ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয়টি নাশকতার ঘটনায় জিআরপি থানায় মামলা হয়েছে ছয়টি। এ পর্যন্ত ২০ জনকে আটক করা হয়েছে। চাঁদপুর জিআরপি থানার ওসি সুভাষ কান্তি দাস জানান, পরপর দুটি অবরোধের সময় বিএনপি ও জামাত-শিবিরের কর্মীরা চাঁদপুর-লাকসাম রেলপথের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি নাশকতা চালায়।
নাশকতা ঠেকাতে রেল রুট পর্যবেক্ষণে বিশেষ ট্রেন। রয়েছেন নিরাপত্তা কর্মীরা। ছবি: দুলাল ঘোষ, আখাউড়া
লালমনিরহাট: লালমনিরহাট বিভাগীয় রেলওয়ে জিআরপি থানা সূত্রে জানা যায় গত ২৮ অক্টোবর থেকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত লালমনিরহাট জেলার সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগর ও তিস্তা রেলওয়ে স্টেশনের মধ্যবর্তী স্থান, মহেন্দ্রনগর রেল ক্রসিং পয়েন্ট, কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী ও হাতীবান্ধা রেলওয়ে স্টেশনের মাঝামাঝি, কালীগঞ্জ উপজেলার তুষভান্ডার ও কাকিনা রেলওয়ে স্টেশনের মাঝামাঝি স্থানে নাশকতা চালায় হরতাল-অবরোধ সমর্থকেরা। এসময় তারা রেল লাইন উপড়ে ফেলে। এসব ঘটনায় মোট ছয়টি মামলা হয়। লালমনিরহাট রেলওয়ে জিআরপি থানার ওসি শামছুল আলম শাহ বলেন, বিভিন্ন নাশকতার অভিযোগে ছয়টি মামলায় ২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।|
রাজশাহী: গত ৩০ নভেম্বর রাত পৌনে দুইটার দিকে রাজশাহী থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া ধূমকেতু এক্সপ্রেস ট্রেন সারদা স্টেশনের দেড় কিলোমিটার পূর্বে নন্দনগাছিতে দুর্ঘটনায় পড়ে। দুর্বৃত্তরা রেললাইনের ফিশপ্লেট খুলে স্লিপার তুলে রাখায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ট্রেনের ইঞ্জিন ও পাঁচটি বগি নিচে পড়ে যায়। পরে ৩ নভেম্বর ওই লাইনে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
ঈশ্বরদী: ঈশ্বরদীরেল থানা এলাকায় সাম্প্রতিক হরতাল-অবরোধে রেলওয়েতে দুটি নাশকতার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
সান্তাহার: সান্তাহার রেলওয়ে থানা এলাকায় গত ২৮ নভেম্বর দুটি নাশকতার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ৬০০-৭০০ মানুষকে আসামি করা হয়। এ সব ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করে।
খুলনা: খুলনা রেলওয়ে থানার বসুন্দিয়া এলাকায় নাশকতা চালায় অবরোধ সমর্থকেরা। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া ময়মনসিংহ এলাকায় নাশকতার অভিযোগে দুজন, জামালপুরে দুটি মামলায় একজন, ভৈরবে একটি মামলায় চারজন, চট্টগ্রামে একটি মামলায় তিনজন ও ঢাকা রেলওয়ে থানায় দুটি মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
নিরাপত্তা জোরদার
জিআরপি ঢাকা রেঞ্জের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার আবদুুর রহমান জানান, নাশকতা ঠেকাতে মোতায়েন করা আনসার সদস্যদের পাশাপাশি রেলওয়ে পুলিশ ও রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনীও টহল অব্যাহত রেখেছে। এ ছাড়া ইঞ্জিনের সঙ্গে একটি কোচের জরুরি শাটল ট্রেন রাতের যাত্রীবাহী ট্রেনকে নিরাপত্তা দিচ্ছে।
রেলওয়ের সুবিধা ভোগ করা জনগণকে রেলপথে নাশকতা প্রতিরোধে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন দুলাল ঘোষ, আখাউড়া; আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ, রাজশাহী; আবদুর রব, লালমনিরহাট; শাহাবুল শাহীন তোতা, গাইবান্ধা; আলম পলাশ, চাঁদপুর ও মাহবুবুল হক দুদু, ঈশ্বরদী প্রতিনিধি)