শীর্ষবিন্দু নিউজ: অভিযোগ উঠেছে, রানা প্লাজার ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা ক্ষতিপূরণ চাইতে বিজিএমইএ ভবনে গেলে তাদের নিয়ে এমন ঠাট্টা-তামাশাই করেন সভাপতি মো: আতিকুল ইসলাম।
রানা প্লাজার ধ্বংসস্তুপের নিচে পড়ে কোমর ভেঙ্গে অক্ষম হয়ে গেলেও ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না এক শ্রমিক। উপরন্তু তিনি বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষের নির্মম রসিকতার শিকার হয়েছেন। আর সেই রসিকতা করেন বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম নিজেই। এই হতভাগ্য শ্রমিককে তিনি বলেছেন, কোমর ভাঙলে ক্ষতিপূরণ নেই, হাত বা পা কেটে নিয়ে এসো, ক্ষতিপূরণ পাবে।
গত বছরের ২৪ এপ্রিল রানাপ্লাজা ধসে নেমে এসেছিলো ভয়াবহ বিপর্যয়। ভবনের পাঁচটি গার্মেন্ট কারখানায় প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক কর্মরত ছিলো। ১৭ দিন উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়ে ১১শ’ ২৭ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। অনেক মৃতদেহেরই খোঁজ মেলেনি তখনও। আর আহত হন তিন হাজারের বেশি শ্রমিক। তাদের কারো হাত কেটে, কারো পা কেটে বের করে আনা হয় ধ্বংসস্তুপের মধ্য থেকে। এতে কারো চোখ যায়, কারো কোমর ভাঙে, কারো বা সৃষ্টি হয় দারুণ মানুসিক চাপ। সে অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারেননি বেঁচে যাওয়া শ্রমিকরা। তার মধ্যে তাদের জীবনের ঘানি টানার নতুন চাপ। সে অবস্থায় সামান্য যেটুকু ক্ষতিপূরণ বিজিএমইএ দিতে চেয়েছিলো তা নিয়েও চলছে এমন নির্মম ঠাট্টা-রসিকতা ও টালবাহানা।
রানা প্লাজা গার্মেন্টস শ্রমিক ইউনিয়ন এর সভাপতি এমাদুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, রানা প্লাজার কর্মরত অনেক শ্রমিক ছিলেন যারা এখন মানসিকভাবে অসুস্থ। অনেকেরই হাত পা কাটা না গেলেও শরীরের বিভিন্ন অংশ মারাত্মভাকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ-কারণে অনেকেই কোনো কাজ করতে পারছেন না, ভারি কাজ করা হয়ে উঠেছে অনেকের পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু এ ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দিতে চাইছে না বিজিএমইএ।
এমাদুল বলেন, এই শ্রমিকদের সাথে নিয়ে একাধিকবার বিজিএমইএতে গিয়েছি। বিজিএমইএ সভাপতি আমাদের নিয়ে কেবলই ঠাট্টা মশকরা করছেন। বলছেন, তোমাদের হাত পা তো কাটা যায় নাই। ক্ষতিপূরণ পেতে হলে হাত পা কেটে আসো। প্রমাণ স্বরূপ হাত-পায়ের কাটা টুকরো নিয়ে আসো তাহলেই ক্ষতিপূরণ দেবো।
এমাদুল ইসলাম জানান শ্রমিকদের রানা প্লাজায় কাজ করার নানা প্রমাণ নিয়ে গেলেও ফল হয়নি। এমনকি তারা যে শারীরিকভাবে ভারি কাজ করতে পারবে না সে বিষয়ে ডাক্তারের সার্টিফিকেট নিয়ে গেলেও একই ধরনের কথা বলেছেন বিজিএমইএ সভাপতি।
অন্যদিকে এসব বিষয় নিয়ে প্রতিবাদের চেষ্টা করা হলে বিজিএমইএ সভাপতি ও নেতাদের সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন সময়ে মোবাইল ফোনে হুমকি ধামকি দিচ্ছে বলে জানান একাধিক ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক। ইসমাইল (ছদ্মনাম) বলেন, এমাদুল ভাইয়ের সাথে যেদিন আমরা ক্ষতিপূরণের জন্য গিয়েছিলাম বিজিএমইএতে সেদিনের পর থেকে আমার ফোনে বিভিন্ন জন ফোন করে হাত পা ভেঙে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। বলছে, ক্ষতিপূরণ চাস। হাত পা ভাইঙ্গা লুলা বানায়া দিলে গিয়া ক্ষতিপূরণ নিস।
রানা প্লাজার এসব শ্রমিক আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পাঠানো সাহায্য থেকে একেক জন সব মিলিয়ে ৩০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা সহায়তা পেয়েছেন। যা দিয়ে চিকিৎসার ব্যয় বহনই সম্ভব হয়নি। কাজ করতে না পারার কারণে রানা প্লাজার ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা এখন না খেয়ে পরিবারসহ রাস্তায় নামতে বসেছেন। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে তাদের। কিছুদিন আগে টঙ্গীর তুরাগ পাড়ে রানা প্লাজায় আহত একজন নারী শ্রমিক আত্মহত্যা করেন। যেভাবে সময় যাচ্ছে, এমন আরো অনেক শ্রমিক আত্মহননের পথ বেছে নেবেন বলেই মনে করছেন এমাদুল ইসলাম।
এসব বিষয়ে বিজিএমইএ এর সভাপতি মো: আতিকুল ইসলামের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তা সম্ভব হয়নি। তবে বিজিএমইএ’র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রানা প্লাজা ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে এ পর্যন্ত ৯০৯ জনকে এক লাখ টাকা থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। আর অঙ্গহানি হয়েছে এমন ৩৬ জন শ্রমিকের প্রত্যেককে ১০ লাখ টাকার বেশি পরিমাণ অর্থ সহায়তা করা হয়েছে।