মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৫

মোদির সামনে অর্থনীতির ১০ চ্যালেঞ্জ

মোদির সামনে অর্থনীতির ১০ চ্যালেঞ্জ

শীর্ষবিন্দু নিউজ ডেস্ক: নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের প্রার্থী হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন নরেন্দ্র মোদি। জনগণকে উন্নয়নের জোয়ারে ভাসানোর স্বপ্ন দেখিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতের প্রধান নির্বাহী হবেন হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির এই নেতা।

১৯৮০ দশকের পর প্রথমবারের মতো ভারতের অর্থনীতি সবচেয়ে মন্দা পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে খেতে শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট সরকারকে বিদায়ই নিতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় দ্রুত ভারতকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে তোলার ঘোষণা দিয়ে কোটি কোটি ভারতবাসীকে আশাবাদী করেছেন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী মোদি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কথিত ‘গুজরাট মডেল’ দিয়ে রাজ্যের উন্নয়নে উদাহরণ সৃষ্টি করলেও সারা ভারতের প্রেক্ষাপটে তিনি যে সমস্ত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার বাস্তবায়ন খুবই কঠিন। গত এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ৫ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে টেনে তুলতে বিদ্যুৎ, সড়ক ও রেল প্রকল্পে থমকে যাওয়া বিনিয়োগগুলোকে গতিশীল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মোদি। তাদের মতে, প্রতিশ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য মোদির নতুন সরকারকে ১০টি খাতে সংস্কারের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী হতে হবে।

১. পণ্য ও সেবা কর (জিএসটি)

ভারতের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী এই অপ্রত্যক্ষ কর সংস্কারের মাধ্যমে রাজ্য ও কেন্দ্র পর্যায়ে চলমান ভিন্ন কর ব্যবস্থা তুলে দিয়ে একক কর ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে। এর মধ্য দিয়ে রাজস্ব আদায় বাড়ানো হবে এবং একই সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেনের ব্যয় কমানো হবে।

ভারতের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ইউপিএ সরকারের সময়ে জিএসটি প্রবর্তনের পরিকল্পনা করা হলে বিভিন্ন রাজ্যের তীব্র আপত্তির মুখে তা স্থগিত হয়। এমনকি বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোর সরকারের পক্ষ থেকেও আপত্তি আসে। কারণ, তাদের শঙ্কা ছিল জিএসটি প্রবর্তনের মাধ্যমে রাজ্যের আর্থিক ক্ষমতা খর্ব হবে।

রাজ্য সরকারগুলোর উদ্বেগ আমলে নিয়ে বিজেপি যথাসময়ে জিএসটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছে। বিরোধী দলে থাকলেও সংস্কারের প্রশ্নে কংগ্রেস বিজেপিকে সমর্থন দেবে বলে জানিয়েছে দলের শীর্ষ এক নেতা। করখাতের এই সংস্কারের জন্য সংবিধান সংশোধনের বাধ্যবাধকতা থাকায় ব্যাপকভিত্তিক সমর্থন ছাড়া তা সম্ভব নয়।

২. রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া

ভোক্তা মূল্য সূচকের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং মুদ্রানীতি প্রণয়নে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার গভর্নরের পাশাপাশি একটি কমিটিকে দায়িত্ব দেয়াসহ বিভিন্ন সংস্কারের প্রস্তাবনাসহ গত জানুয়ারিতে একটি সুপারিশ প্রণয়ন করে আরবিআইয়ের একটি প্যানেল। এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে আরবিআই আইনে পরিবর্তন আনতে হবে।

আইন পরিবর্তনের বিষয়ে বিজেপি নেতারা বিস্তারিত মুখ না খুললেও গভর্নর রঘুরাম রাজনের জন্য এটা কঠিন কাজ হবে। দেনা ব্যবস্থাপনা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রণীত মুদ্রানীতির মধ্যে প্রায়ই দ্বন্দ্ব তৈরির প্রেক্ষাপটে মোদির সরকারকে হয়তো আরবিআই থেকে দেনা ব্যবস্থাপনা থেকে আলাদাই করতে হবে।

৩. বেসরকারিকারীকরণ

ভারতের ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি কমিয়ে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে বহুকাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির লক্ষ্যে নতুন সরকারকে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বেসরকারিকরণের দিকে নজর দিতে হবে। চলতি অর্থবছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত চাঙ্গা পুঁজিবাজারের উপর ভর করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বিক্রি করে ৩০০ কোটি ডলার বাজার থেকে সংগ্রহ করেছে সরকার। কিন্তু এটা নির্ধারিত মূল লক্ষ্যমাত্রার মাত্র এক তৃতীয়াংশ।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে বাজার থেকে ৯৬২ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছিল বিদায়ী কংগ্রেস সরকার, যার লক্ষ্য ছিল, বাজেট ঘাটতি কমিয়ে জিডিপির ৪ দশমিক ১ শতাংশে নামিয়ে আনা। আগামী সরকারকে হয়তো এই লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করতে হবে।

৪. ভর্তুকি

বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং রেটিংয়ের পতন ঠেকাতে মৌলিক পণ্যগুলোর ওপর কিভাবে ভর্তুকি দেয়া হবে তা নিয়ে মোদির নতুন সরকারকে পরীক্ষা-নীরিক্ষা চালাতে হবে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ভারতের ভর্তুকি ব্যয় ছিল জিডিপির ২ দশমিক ২ শতাংশ। বিজিপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, উন্নয়নের জন্য তহবিল প্রাপ্তিতে ছাড় না দিয়েই তারা বৃহত্তর ক্ষেত্রে আর্থিক শৃঙ্খলা আনবেন।

৫. শ্রম

কর্মসংস্থা-ঘন শিল্পের উন্নয়নে এবং প্রতিবছর চাকরির বাজারে আসা তরুণদের জন্য এক কোটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চায় বিজেপি। এর শ্রম আইনে পরিবর্তন আনতে হবে, যদিও আইনের পরিবর্তন রাজনৈতিকভাবে কঠিন হবে। এছাড়া কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভারতীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা উৎসাহিত করতে চান মোদি।

৬. প্রতিরক্ষা

প্রতিরক্ষা খাতে আরো বিদেশি বিনিয়োগ টানার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ভারতের আমদানি হ্রাস, সমরাস্ত্র ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং অপারেশন ও প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় হার্ডঅয়ার সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুততর করার পরিকল্পনা আছে।

বিশ্বে সবচেয়ে বড় অস্ত্র আমদানিকারক দেশ ভারতের প্রতিরক্ষা খাতে বর্তমানে ২৬ শতাংশ বিদেশি মালিকানা স্বীকৃত আছে। শুধুমাত্র আধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এই বিনিয়োগসীমা তুলে দেয়ার প্রস্তাবনা রয়েছে বিজেপির। দলটি বলছে, প্রতিরক্ষা খাতে বৃহত্তর বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ করে দেয়া হবে।

৭. বিমা

ভারতের সাড়ে চার হাজার কোটি ডলারের বিমা খাতে বিদেশি বিনিয়োগের সীমা ২৬ থেকে বাড়িয়ে ৪৯ শতাংশ করার উদ্যোগ নেয়ার কথা রয়েছে। আগে এধরনের উদ্যোগ নেয়া হলেও রাষ্ট্রায়ত্ত বিমা কোম্পানিগুলোর কর্মচারীরা এবং তাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকরা তাতে বাধা দিয়েছে। গত মার্চে বিজেপির এক নেতা বলেছিলেন, তারা এই অচলাবস্থা ভাঙতে কংগ্রেসের সঙ্গে কথা বলেছেন।

৮. ব্যাংকিং

ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে বিপুল পরিমাণ মন্দ ঋণ থাকায় অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়েছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে।আগামী সরকারকে এসব মন্দ ঋণ পুনরুদ্ধারে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে সহায়তা করতে হবে। মন্দ ও পুনঃতফসিলিকৃত ঋণ মিলে ভারতের মোট ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ একহাজার কোটি ডলার, যা মোট ঋণের ১০ শতাংশ। রেটিং সংস্থা ফিচ পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০১৫ সালের মার্চ নাগাদ ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ মোট ঋণের ১৪ শতাংশ হবে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) মতে, মন্দ ঋণ বাড়ায় এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ভারতের প্রবৃদ্ধির পুনরুদ্ধারের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে মধ্যবর্তী বাজেটের সময় এই খাতের মন্দ ঋণের সঙ্গে মূলধনের অনুপাত ঠিক রাখতে ১৮৯ কোটি ডলার বরাদ্দ রাখা হলেও বিশ্লেষকরা বলছেন আরো অর্থের প্রয়োজন হবে।

৯. বিদ্যুৎ

ভারতজুড়ে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থারর উন্নয়নে তথাকথিত গুজরাট মডেল বাস্তবায়ন করতে পারে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার। গুজরাটে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করায় এই মডেল ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। রাজ্যটিতে বিদ্যুতের একক সঞ্চালন লাইনের পরিবর্তে কৃষক, বাড়িঘর ও কোম্পানিগুলোর জন্য আলাদা আলাদা সঞ্চালন লাইন তৈরি করে দিয়েছিল মোদির রাজ্য সরকার।

১০. গ্যাসের দাম

গত জানুয়ারিতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গ্যাসের দাম বৃদ্ধির রূপরেখা দেয় কংগ্রেস সরকার। এই রূপরেখা গত এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও নির্বাচনের আগে জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টির আশঙ্কায় সরকারকে দাম না বাড়াতে পরামর্শ দেয় কংগ্রেসের নির্বাচন পরিচালনাকারীরা।

এর মধ্যে গত সপ্তাহে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য সরকারকে নোটিস দিয়েছে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ, এর অংশীদার বিপি এবং নাইকো রিসোর্সেস। বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার ওই রূপরেখা কিছুটা সংশোধনের পর তা বাস্তবায়নের একটি সুনির্দিষ্ট সময় ঘোষণা করবে।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026