সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৫

দাঁত ভাঙা গাড়ি ধরার ফাঁদ

দাঁত ভাঙা গাড়ি ধরার ফাঁদ

মামুনুর রশিদ/রুদ্র মিজান:

দাঁত ভেঙে গেছে গাড়ি আটকানো ফাঁদের। ডিভাইস স্থাপনের মাত্র তিন দিনের মধ্যেই এমন অবস্থা হয়েছে যানবাহন চলাচলে অনিয়ম রোধে নেয়া পরীক্ষামূলক এই প্রকল্পের। উল্টোপথে গাড়ি চলা ঠেকাতে গত শুক্রবার রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘সুগন্ধা’ সংলগ্ন হেয়ার রোডে পরীক্ষামূলকভাবে এটি স্থাপন করা হয়। ‘প্রতিরোধ’ নামের এই ডিভাইস স্থাপন করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। ডিভাইস সম্পর্কে ট্রাফিক পুলিশ জানিয়েছিল, উল্টো পথে ডিভাইস পার হওয়ার চেষ্টা করলেই ধাতব দাঁতের আঘাতে গাড়ির চাকা ফুটো হয়ে যাবে। এতে যানজট ও দুর্ঘটনা হ্রাস পাবে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তার আগেই ডিভাইস পঙ্গুত্ব বরণ করেছে।

গতকাল সকালে দেখা গেছে, ওই ডিভাইসের অনেক দাঁত বা কাঁটা ভেঙে গেছে। কোথাও কোথাও কাঁটা দেবে গিয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে। ভেঙেছে ডিভাইসের সিপ্রং। তার আগে রোববার রাতে ভেঙেছে ডিভাইসের কয়েকটি ধাতব দাঁত। কিন্তু গতকাল ভেঙে যাওয়ার পরিমাণ বেশি হওয়ায় এ নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ডিভাইস ভেঙে যাওয়ায় ডিভাইস স্থাপনকারী ডিএমপি ও যানবাহন চালক ও মালিকদের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। ডিভাইসের দাঁত ভেঙে যাওয়ার কারণে এমনিতেই গাড়ির চাকা ফুটো হচ্ছে। গতকাল ডিভাইস এলাকায় ধাতব কাঁটার আঘাতে একটি প্রাইভেট কার (ঢাকা মেট্রো-ব ৩৭০২৫১)সহ বেশ কয়েকটি গাড়ির চাকা পাংচার হয়।

সরজমিনে গতকাল হেয়ার রোডে গিয়ে দেখা গেছে, চালকেরা গাড়ির গতি কমিয়ে সংশয় নিয়ে ডিভাইস পার হচ্ছেন। কর্তব্যরত পুলিশ সার্জেন্ট ও কনস্টেবল গাড়িচালকদের দ্রুত পার হওয়ার জন্য হাত দিয়ে ইশারা করছেন। ভাঙা ডিভাইসের উপর দিয়ে এক ধরনের ঝুঁকি নিয়ে গাড়িগুলো যাতায়াত করছিল। সূত্র আরও জানায়, ডিভাইসের দাঁতগুলো রাস্তার উপর তিন ইঞ্চি উঁচু হয়ে সার্বক্ষণিক দাঁড়িয়ে থাকার কথা থাকলেও তা উল্টো কাজ করার বিষয়ে পুলিশ নিশ্চিত নয়। এজন্য ডিএমপি পুলিশের সহযোগিতায় বুয়েটের চার প্রকৌশলী ডিভাইস পরিদর্শন করেছেন। তারা বর্তমান টেকনিক্যাল সহায়তার পরিবর্তে নতুন করে গবেষণা শুরু করার আশ্বাস দিয়েছেন।

রাজধানীর ধোলাই খালের সোহেল মেটাল নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই ডিভাইস তৈরি করে। ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে ট্রাফিক পুলিশ বিভাগকে তা সরবরাহ করে ওই প্রতিষ্ঠান। প্রকৌশলী জাহান আলমের কারিগরি সহযোগিতায় তা তৈরি হয়েছে বলে প্রচার করা হয়। সরজমিনে ওই প্রতিষ্ঠানে গেলে আশপাশের ব্যবসায়ীরা জানান, জাহান আলম ওই প্রতিষ্ঠানেরই একজন পরিচালক। ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাদেক হোসাইনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কর্মকর্তাদের। সেই সুবাধেই ওই ডিভাইস তৈরির কাজটি করে ওই প্রতিষ্ঠান। এই ডিভাইসটি সফল হলে শহরের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের ডিভাইস স্থাপনের কাজ ওই প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হবে বলে আশ্বস্ত করেছিলেন জনৈক পুলিশ কর্মকর্তা। পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্কের কারণেই এই প্রতিষ্ঠান ডিভাইস তৈরির কাজ পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে তা অস্বীকার করে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, প্রায় ৩০ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে কাজ করছে এই প্রতিষ্ঠান। গুণগত কাজের কারণেই সরকারি বিভিন্ন কাজ তারা  পেয়ে থাকেন।

ডিভাইসের ধাতব কাঁটাগুলো বিদেশী স্টেনলেস স্টিলের তৈরী। এমনকি এতে ব্যবহৃত সিপ্রং, বক্স, কাঁটা বা দাঁত, প্লেইট সবই স্টেনলেস স্টিল বা এসএস-এর। এ কারণে ঝড় বৃষ্টি, ধুলো বালিতে ক্ষতির কোন সুযোগ নেই বলে প্রতিষ্ঠানে কর্মরতরা জানিয়েছেন। সঠিক পথে গাড়ি যখন ডিভাইস দিয়ে যাবে তখন এর দাঁতগুলো বসে যায়। কারণ এতে ব্যবহার করা হয়েছে সিপ্রং। গত দেড় মাসে প্রতিষ্ঠানটি এই ডিভাইস তৈরি করেছে। ডিএমপি ও ওই প্রতিষ্ঠানের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, ওই ডিভাইসের উপর দিয়ে প্রতি মিনিটে ৪৫টি গাড়ি যাতায়াত করে। প্রতিদিন ডিভাইসের দাঁতগুলো ১ লাখ ২০ হাজার বার আপ-ডাউন করে।

গত ২৩শে মে ডিভাইস স্থপানের পর সকাল থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত তা পর্যবেক্ষণ করেন ওই প্রতিষ্ঠানের লোকজন। দিনে ডিভাইস-এর দাঁত ভাঙেনি বলে দাবি করেন সোহেল মেটালের পক্ষে পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পালনকারী আলাউদ্দিন। তিনি জানান, রোববার রাতে কয়েকটা দাঁত ভাঙে। এ ঘটনা ঘটে আনুমানিক রাত ১টার দিকে। ওই সড়ক দিয়ে লরি এবং ২০ টনের অধিক ওজনের যানবাহন যাতায়াত করায় তা ডিভাইসের দাঁত ভেঙেছে। একই ভাবে ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাদেক হোসাইন বলেন, ২০ টন ওজন ক্যাপাসিটি ডিভাইসের ছিল। এখন আমরা ২০০ টন ওজনের ক্যাপাসিটি সংবলিত ডিভাইস তৈরি করবো। তিনি আরও জানান, ডিভাইস তৈরির আগে দীর্ঘ দুই মাস হেয়ার রোডের ওই এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু রাতে যে এত ওজনবাহী যানবাহন যাতায়াত করে তা তখন বোঝা যায়নি।

ট্রাফিক (দক্ষিণ) ডিসি খান মো. রেজওয়ান মানবজমিনকে বলেন, হেয়ার রোডের ডিভাইস মেশিন পরীক্ষামূলক বসানো হয়েছে। এ ছাড়া ডিভাইস দেখে অনেক গাড়িচালক কিছু না বুঝে গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে দেন। এতে ডিভাইসের কাঁটাগুলো ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।  প্রাথমিকভাবে ডিভাইসটি বিদেশ থেকে আমদানি করতে গেলে দেড় কোটি টাকা ব্যয় হতো। এজন্য দেশীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে মাত্র পাঁচ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি পরীক্ষামূলক চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

গত ২৩শে মে ডিভাইস স্থাপন উদ্বোধন করেন পুলিশের আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার। এ সময় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার বেনজীর আহমেদ, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আবদুল জলিল, মিলি বিশ্বাস, শেখ মারুফ হাসান, যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মীর রেজাউল আলম, যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম, ডিএমপির ডিসি (মিডিয়া) মাসুদুর রহমানসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026