মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৮

বর্ডার হাট ব্যবহার করে চোরাচালান

বর্ডার হাট ব্যবহার করে চোরাচালান

মাহাবুর আলম সোহাগ: রাজীবপুর, কুড়িগ্রাম থেকে: ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ধারে বসবাস করা চোরাকারবারিদের মিলনমেলার স্থানে পরিণত হয়েছে কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার বর্ডার হাট। দু’দেশের চোরাকারবারিরা এখন এ হাটে প্রবেশ করে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র অর্ডার করছেন। পরে উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে অবাধে মাদক, অস্ত্রসহ বিভিন্ন অবৈধ মালামাল পাচার করছেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে।

ফলে এ হাট চালুর পর চোরাচালান বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন হাটের ক্রেতা-বিক্রেতা ও এলাকাবাসী। বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের যৌথ সিদ্ধান্তে ২০১১ সালের ১৬ জুলাই উপজেলার বালিয়ামারী এলাকার পাশে ভারত ও বাংলাদেশ সীমান্তের মধ্যবর্তী স্থানে সোনাভরি নদের তীরে সীমান্ত হাটটি চালু করা হয়।

সপ্তাহের প্রতি বুধবার এখানে হাট বসে। শীতকালে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা এবং গ্রীষ্মকালে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত হাটে কেনা-বেচা চলে। বর্ডার হাটের কয়েকজন দোকানদার অভিযোগ করে বাংলানিউজকে বলেন, প্রতি বুধবার দুই দেশের চোরাকারবারিরা তাদের অবৈধ ব্যবসা নিয়ে আলোচনা করার জন্য এ হাটে প্রবেশ করছেন। কোন সীমান্ত দিয়ে মালামাল পাচার করবেন- হাটের মধ্যে প্রকাশ্যে এসব বিষয়ে আলোচনা করছেন তারা।

হাটের ক্রেতা ভোলা মিয়া বলেন, এলাকার অনেক চোরাকারবারি জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে বার্ষিক প্রবেশপত্র সংগ্রহ করে হাটে আসছেন। অন্যদিকে ভারতের চোরাকারবারিরাও একইভাবে হাটে প্রবেশ করছেন। মূলত তাদেরই আড্ডার স্থান হয়েছে এ হাট। স্থানীয় আনিসুল হক বলেন, এ হাট চালুর পর এলাকায় চোরাচালান বেড়েছে। দু’দেশের চোরাকারবারিরা হাটে প্রবেশ করে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র অর্ডার করছেন। পরে তা চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করছে।

কাপড় বিক্রেতা মানিক বলেন, দুই দেশের ২৫ জন করে মোট ৫০ জন বিক্রেতার হাটে প্রবেশাধিকার থাকলেও ভারত থেকে আসছেন মাত্র ১০ জন বা তারও কম। তারা তাদের উৎপাদিত পণ্য জিরা মসলা, তেঁতুল, সুপারি, সজনে ও কমলাসহ কয়েকটি পণ্য হাটে নিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তা বিক্রি হয়ে যায়। কারণ, তাদের পণ্যের চাহিদা আগে থেকেই বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা জানিয়ে দেন। এর বেশি কোনো মাল নিয়ে আসেন না তারা। ভারতীয়দের যেমন দোকানদারের সংখ্যা কম, তেমনি কম তাদের ক্রেতার সংখ্যাও।

মানিক জানান, বর্ডার হাটে দোকানদার এবং ক্রেতা দুটোই বাংলাদেশের বেশি। ভারতীয়রা বাংলাদেশের কাপড় এবং আরএফএলের প্লাস্টিক পণ্য বেশি কেনেন বলেও জানান মানিক। ক্রেতা ভোলা মিয়া বলেন, যে উদ্দেশ্যে এ হাট চালু করা হয়েছে সেটি সফল হচ্ছে না। তিনি জানান, এ হাটে শুধুমাত্র রাজীবপুরের তৈরিকৃত কাঁচামাল, পণ্য এবং কুটির শিল্পসহ বিভিন্ন জিনিস বিক্রির নিয়ম থাকলেও তা হচ্ছে না। কারণ, রাজীবপুরে এসব পণ্য তৈরির কোনো কারখানা নেই।

হাট ব্যবস্থাপনা কমিটি সূত্রে জানা গেছে, শুরু থেকেই ভারতীয়দের এ হাটের প্রতি আগ্রহ কম ছিল। প্রবেশের তালিকায় ভারতীয় ক্রেতা রয়েছেন মাত্র ৬৯ জন। অন্যদিকে বাংলাদেশি ক্রেতা ৩০০ জনের স্থলে প্রায় আড়াই হাজার আবেদন পড়েছিল। জানা গেছে, উভয় দেশের ৩০০ করে ৬০০ জন ক্রেতা হাটে যাওয়া-আসার কথা থাকলেও এর সংখ্যা এখন অতি নগণ্য। হাটে ধারালো অস্ত্র, মোবাইল ফোন, সিম কার্ড, জুয়েলারি, সিগারেট, ম্যাচ কেনা-বেচা এবং ছোট শিশুদের নিয়ে হাটে বেশ নিষিদ্ধ থাকলেও বাধা মানছেন না অনেকে।

বাংলাদেশ-ভারতের হাট ব্যবস্থাপনা কমিটি এ হাটের তদারকি করে থাকেন। আন্তর্জাতিক সীমানা পিলার ১০৭২-এর ৪ এবং ৫ নম্বর সাব পিলারের মধ্যবর্তী স্থানে জিরোলাইনের উভয় দিকে বাংলাদেশ অংশে ৭৫ গজ এবং ভারত অংশে ৭৫ গজ জায়গা জুড়ে নো-ম্যান্স ল্যান্ডে হাটটি বসে। বাংলাদেশ অংশে কুড়িগ্রাম জেলার রাজীবপুর উপজেলার বালিয়ামারি সীমান্তের ব্যাপারীপাড়া এলাকার জিঞ্জিরাম নদীর পূর্ব প্রান্তে এবং ভারতীয় অংশে রয়েছে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তুরা জেলার আমপাতি মহকুমার মহেন্দ্রগঞ্জ থানার কালার চর সীমান্ত।

চারদিকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ভারত আটটি হাট ছাউনি ও দু’টি শৌচাগার নির্মাণ করেছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নির্মাণ করা হয়েছে হাটের জন্য রাস্তা ও জিঞ্জিরাম নদীর ওপর একটি বাঁশের সাঁকো। হাটের আটটি শেডে উভয় দেশের ১০টি কৃষিজাত পণ্যসহ ৪৭টি পণ্য কেনা-বেচার কথা থাকলেও সব মিলিয়ে ১০টি পণ্যও ক্রয়-বিক্রয় করা হচ্ছে না এখন। হাট পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য উভয় দেশের দু’জন সুইপার রয়েছেন। হাট শেষে তারা  পরিষ্কার করে চলে যান।

হাটের ব্যাপারে হাট ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি অতিরিক্ত ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) আকতার হোসেন আজাদের সঙ্গে এ প্রতিবেদক কথা বলতে চাইলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, আপনি কোন পত্রিকার সাংবাদিক, রাখেন, পরে কথা বলবো। এটা বলে ফোনের লাইনটি কেটে দেন তিনি। রাজীবপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সফিউল আলম বলেন, ভারতে যেদিন কোনো অনুষ্ঠান থাকে সেদিন যদি হাট বসার নির্ধারিত দিন থাকে তাহলে সেদিন আর হাট বসে না। কোনো প্রকার ঘোষণা ছাড়াই ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী (বিএসএফ) হাট বন্ধ রাখে। ফলে মালামাল নিয়ে ফেরত যেতে হচ্ছে বাংলাদেশের দোকানদার ও ক্রেতাদের।

তিনি বলেন, সীমান্ত হাটটি চালু হওয়ায় বালিয়ামারি, মণ্ডলপাড়া, সান্ডারপাড়া, জালছিরাপাড়া, কড়াইডাঙ্গিপাড়া, আলগারচর, লাঠিয়ালডাঙ্গা, ব্যাপারীপাড়া, জাউনিয়ারচর, মিয়াপাড়া ও বাউলপাড়া গ্রামসহ রাজিবপুর এবং এর লাগোয়া রৌমারী উপজেলার বিপুল সংখ্যক মানুষের উপকার হবে ভেবেছিলাম। কিন্তু এখন তেমন কোনো কাজে আসছে না হাটটি। একই সঙ্গে ভারতীয় অংশের বলদানগিরি, ওয়াদাগিরি, জানগিরি, মারহালিপাড়া, কালাইরচর ও ঢাকঢাকিপাড়া গ্রামসহ এর আশপাশের এলাকার লোকজনের আগমন ঘটার কথা ছিল এ হাটে। কিন্তু হাটে যাওয়া-আসা খুব কম তাদের। রাজীবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল লতিফ বাংলানিউজকে জানান, হাটের সকল প্রকার তদারকি করা হয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে। উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে এটির কোনো সম্পর্ক নেই।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026