বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ০৫:১১

নিখোঁজ মুজিবের লাশ সন্ধানে ডিএনএ পরীক্ষা

নিখোঁজ মুজিবের লাশ সন্ধানে ডিএনএ পরীক্ষা

শীর্ষবিন্দু নিউজ: প্রায় দেড় মাসেরও বেশি সময় পার হলেও খোঁজ মেলেনি যুক্তরাজ্য বিএনপির সহ-সভাপতি ও সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মুজিবুর রহমান মুজিব ও তার গাড়ি চালক রেজাউল হক সোহেলের। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তাদের আজও উদ্ধার করতে পারেনি। এমনকি তার গাড়িরও কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাই নিখোঁজ মুজিবুর রহমান মুজিব ও রেজাউল হক সোহেলের পরিবারসহ আত্মীয়স্বজনরা হতাশ। গত ৪ মে রোববার গুম-খুনের প্রতিবাদে সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দলীয় অনশন কর্মসূচী পালন থেকে সিলেটে ফেরার পথে প্রাইভেট কারসহ নিখোঁজ হন প্রবাসী বিএনপি নেতা মুজিবুর রহমান মুজিব ও তার চালক রেজাউল হক সোহেল।

এদিকে নিখোঁজ মুজিবের লাশ শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে উদ্ধার হওয়া গলিত লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। পুলিশ জানায়, রোববার ছাতক উপজেলার জাউয়াবাজার এলাকার বোকা নদী থেকে মধ্যবয়সী অজ্ঞাত ব্যক্তির অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ওই লাশকে নিখোঁজ বিএনপির নেতা মুজিবের লাশ বলে ধারণা করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের তিন সদস্যের চিকিৎসক দল ওই লাশের ময়নাতদন্ত করেন।

জানা যায়, ৫৬ বছর বয়সী নিখোঁজ মুজিবুর রহমান ১ ছেলে ও ৪ মেয়ে সন্তানের জনক। স্ত্রী-সন্তানসহ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন তিনি। মাঝে মধ্যে দেশে আসলেও লন্ডন কেন্দ্রীক ব্যবসা বাণিজ্য তাঁর, বিভিন্ন ব্যবসার মধ্যে রেস্টুরেন্ট ও প্রপার্টি ব্যবসা উল্লেখযোগ্য। সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ভাতগাঁও ইউনিয়নের খেওয়ালিপাড়া গ্রামের মৃত আসদ আলীর ছেলে নিখোঁজ মুজিবুর রহমান শিশু বয়সেই লন্ডনে যান। প্রায় ৫০ বছর ধরে লন্ডনে বসবাস করে আসছিলেন তিনি। নিখোঁজের ৫ মাস আগে দেশে এসেছিলেন। সুনামগঞ্জ শহরের উকিলপাড়ার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়াহিদের ছেলে গাড়ি চালক রেজাউল হক সোহেলসহ ৪মে সুনামগঞ্জ শহর থেকে সিলেট যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন তিনি।

স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠন তাকে ফিরিয়ে দেবার দাবিতে পথঅবরোধ, বিক্ষোভ ও হরতাল কর্মসূচী এবং কেন্দ্রীয় বিএনপিও তাকে ফিরিয়ে দেবার দাবিতে সংবাদ সম্মেলনসহ নানা কর্মসূচী পালন করলেও এখন এ বিষয়ে বিএনপিও নিরব। ঘটনার ১দিন পর ৫মে নিখোঁজ মুজিবুর রহমানের আত্মিয় দক্ষিণ সুনামগঞ্জ আব্দুল মজিদ কলেজের অধ্যক্ষ রবিউল ইসলাম সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় মুজিব নিখোঁজের একটি জিডি করেছিলেন।

পুলিশ ৬ মে গণ-মাধ্যমকর্মীদের কাছে জানায় মোবাইল ট্র্যাকিংয়ে জানা গেছে, নিখোঁজ মুজিবের মোবাইল ফোন ঘটনার দিন ৪মে রোববার বিকাল ৫টায় জেলার ছাতকের গোবিন্দগঞ্জ এলাকা অতিক্রম করেছে। পরদিন সোমবার পৌনে ১টায় ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা এলাকায় সামান্য সময় চালু ছিল, পরে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ঘটনার শুরুর দিকে মুজিবুর রহমানের স্বজনরা ধারণা করছিলেন, যুক্তরাজ্যের ৫৯ ব্রিকলেনের বিখ্যাত পাব সেভেন স্টার ভাড়া দেওয়া নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে তাকে প্রফেশনাল অপহরণকারীদের দিয়ে অপহরণ করা হতে পারে। সুনামগঞ্জ শহরের পুরাতন বাসস্টেশনের একটি বিপণি বিতান নির্মাণ নিয়ে দ্বন্দ্বের বিষয়টি ওই সময় আলোচনায় আসে। মুজিব নিখোঁজের বিষয়ে তাঁর স্বজন ও আইন প্রয়োগ সংস্থার পক্ষ থেকে একেক সময় একেক তথ্য এবং নানা সুত্রে নানা গুজবও রটে সুনামগঞ্জে।

গত ৮মে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় ১১টায় লন্ডনের ইলফুড শহরে মজিুবর রহমানের বাসার লেটারবক্সে কে বা কারা বাংলায় কাঁচা হাতের লেখা সম্বলিত একটি চিরকুট ফেলে যায় ।ওই চিরকুটে লেখা ছিল নিখোঁজ বিএনপি নেতা মুজিবকে সিলেটের এক স্থানে অপহরণকারীরা আটকে রাখা হয়েছে। চিরকুটে আরো উল্লেখ ছিল, সিলেট থেকে একটি সিএনজির মাধ্যমে মুজিবুর রহমান ও তার গাড়ি চালককে অপহরণ করা হয়েছে। বর্তমানে সিলেটের পৃথক বাসায় তাদের দুজনকে আটকে রাখা হয়েছে। তবে কে বা কারা তাদের অপহরণ করেছে সে বিষয়ে চিরকুটে স্পষ্ট করা না হলেও দুইদিনের মধ্যে তাকে হত্যা করা হতে পারে বলেও চিরকুটে উল্লেখ ছিল।

পরে ছাতকের বাসিন্দা লন্ডন প্রবাসী আব্দুল মুকিতকে মুজিব অপহরণের জন্য সন্দেহ করা হয়। বলা হয় তার কাছে মুজিব কয়েক কোটি টাকা পেতেন। ওই টাকা দেই দিচ্ছি বলে কালক্ষেপণ করতেন আব্দুল মুকিত। মুজিবুর রহমানকে টাকা না দিয়েই লন্ডনে চলে যান তিনি। অপহরণের সঙ্গে আব্দুল মুকিতের ভাগনা সোয়েব আহমদ শামীম ও তার ভাতিজা হাবিবুর রহমান জড়িত থাকতে পারে বলে সন্দেহের কথা জানান মুজবিবুর রহমান মুজিবের ভাতিজা আবুল হোসেন। ১০মে জড়িত সন্দেহে সুনামগঞ্জ শহর থেকে জেলা যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আলী আকবর চৌধুরী, ছাত্রদল কর্মী তারেক আহমদ ও আব্দুল আজিজের ছেলে জিহাদ মিয়া।

একই সময়ে সিলেট ও ময়মনসিংহে ব্যাপক পুলিশি অভিযান চালানো হয়। ওই দিন রাতেই ময়মনসিংহ সদর উপজেলার শিবসাত ইউপি সদস্য চরশিরতা গ্রামের লিয়াকত ও আবুল কালাম আজাদকে আটক করা হয়। তাদের আটকের পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে গণ-মাধ্যমকে আরো নানা তথ্য জানানো হয়। আটক লিয়াকত ও আবুল কালামকে ১৪মে ২দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।১৫মে ব্রিটিশ পুলিশের একটি দল মুজিবের স্বজনদের জানায় মুজিব জীবিত আছেন, শিগরিরই উদ্ধারও হবেন।

১৬ মে যুক্তরাজ্যের দুই গোয়েন্দা কর্মকর্তা মি. নিক ও মি. গ্রাহাম বাংলাদেশে আসেন এবং মুজিব জীবিত আছেন, শিগগির তাকে উদ্ধার করা হবে বলেও মন্তব্য করেন। ২০ মে মঙ্গলবার রাতে এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার কসবা গ্রামের মৃত সফিক উদ্দিনের ছেলে মাহমুদকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২৫ মে তাকেও একদিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ।কিন্তু দীর্ঘদিন পর হলেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এসব তৎপরতায় কোন ফল পাওয়া যায়নি বলে মন্তব্য করেন ‘নিখোঁজ’ মুজিবের স্বজনরা।

এক সময় আইন প্রয়োগকারী একটি সংস্থার দায়িত্বশীল সুত্র থেকে জানানো হয়েছিল নিখোঁজ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী চক্রের অর্থের লেনদেন নিয়ে দরকষাকষি চলছে। আলোচনা সফল হলে মুজিবকে অক্ষত অবস্থায় মাফিয়ারা ফিরিয়ে দিতে পারে বলেও একটি আন্তর্জাতিক পুলিশি সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল। কয়েকদিন পর মোবাইল ট্র্যাকিংয়ে টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ে মুজিবের মোবাইল ধরা পড়লে পুলিশ ওখানেও অভিযান চালায়।

কিন্তু সেখানেও পুলিশি অভিযান নিস্ফল হয়। মুজিবুর রহমানের ভাতিজা আবুল হোসেন বলেন, সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার ও সদর থানার ওসির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি, কোন আপডেট তারা আমাদের জানাতে পারেননি, আমরা খুবই হতাশ। মুজিবের শ্যালক ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন বলেন, আমরা খুবই হতাশ, একমাস পার হলেও আমাদের কাছে কোন আপডেট নেই। পুলিশের কাছেও নেই।

সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বলেন, এখন আর কোথাও অবস্থান করে নিখোঁজ মুজিবুর রহমানকে খোঁজছে না পুলিশ, বিভিন্ন উৎসের তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ চেষ্টা করছে। মাফিয়া চক্রের সঙ্গে মুজিবের সম্পৃক্ততা বা তাদের কারণেই এই ঘটনা ঘটতে পারে এমন বিষয়গুলিও সুনির্দিষ্ট নয়। যেসব তথ্য পাওয়া গিয়েছিল সেগুলি নিশ্চিত ছিল না, সকল তথ্যই ভাসাভাসা। মুজিব জীবিত আছেন বলে আগে যেভাবে বলা হয়েছিল, এখনো সে রকমই মনে করা হচ্ছে।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026