এটা উভয় রাষ্ট্রের বিজয় বলে উল্লেখ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। ভারতও সমুদ্রসীমার এই রায় মেনে নিয়েছে। এই রায় নিয়ে বিএনপির আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে বৃহস্পতিবার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী হাফিজউদ্দিন আহমেদ, সাবেক কূটনীতিক রিয়াজ রহমান, শমসের মবিন চৌধুরী ও ইনাম আহমেদ চৌধুরী।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ বলেন, আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতে বাংলাদেশের পক্ষে অভিজ্ঞ ও দক্ষ প্রতিনিধি না থাকায় সমুদ্রে আমরা ন্যায্য সীমানা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছি। দক্ষিণ তালপট্টি হাতছাড়া হয়েছে। আমরা মনে করি, এই রায়ের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে ভারতের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রায়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় হাফিজউদ্দিন সাংবাদিকদের একই কথা বলেছিলেন। তার প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার ভারতের কাছ থেকে ন্যায্য হিস্যা আদায় করে নিয়েছে।
হাফিজ বলেন, সরকার সমুদ্র বিজয়ের যে কথা বলেছে, তা সঠিক নয়। মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণেও তারা একই রকম কথা বলেছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ওই সময়ে আমরা কয়েকটি গ্যাস-তেল ব্লক হারিয়েছি। দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের বিষয়ে তিনি বলেন, এই দ্বীপটি বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জিয়াউর রহমান আমলে এই দ্বীপটির মালিকানা দাবি তোলা হয়। তিনি (জিয়া) এই দ্বীপের মালিকানার বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।
ওই সময়ে ভারতও এই দ্বীপের দাবি জানিয়েছিল। এই নিয়ে দুই দেশের যুদ্ধ জাহাজও সেখানে গিয়েছিল। এই দ্বীপটির অধিকার ছেড়ে দেয়া উচিৎ হয়নি। তালপট্টি দ্বীপের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি ও আদালতে বাংলাদেশের ডেপুটি এজেন্ট অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. খুরশেদ আলম বলেছেন, তালপট্টি এখন নেই। তালপট্টি যে জায়গায় ছিল এ সীমানাটি ভারতের দিকে পড়লেও এর নিচের (দক্ষিণে) বিশাল জায়গায় আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলা তালপট্টি নিয়ে বিএনপির বক্তব্যে হাফিজের দিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বৃহস্পতিবারই বলেছেন, তারা কিছুই করেনি, কিন্তু খুঁত ধরার একটা চেষ্টা। ওই ভদ্রলোককে বলতে হবে যে… তাকে একটু সাগরে পাঠায়ে দাও, ওই দ্বীপটা কোথায়? ওই দ্বীপে একটা বাড়ি করে থাকেন, সে তো ভোলার মানুষ।
তালপট্টি দ্বীপ বাংলাদেশের মানচিত্রে ছিল না জানিয়ে খুরশেদ আলমের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত জানিয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন বলেন, দক্ষিণ তালপট্টি আছে, এটি ১৯৭৫ সালের ম্যাপই প্রমাণ করে। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে এ সংক্রান্ত মানচিত্র প্রকাশ করা হয়েছিল। এখন ভারত পেয়েছে বলে সরকার বলছে, এর কোনো অস্তিত্ব নেই। খুরশেদ সাহেব ওই সময়ে নৌবাহিনীতে কাজ করতেন। তিনি নৌবাহিনীর যুদ্ধ জাহাজ নিয়ে তালপট্টিতে অবস্থান নিয়েছিলেন। সেখানে একটি লাইট হাউজও স্থাপন করা হয়েছিল। এখন তিনি ভিন্ন কথা বলেছেন, বলেন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা শমসের মবিন।
সালিশ আদালতে বাংলাদেশের পক্ষে অভিজ্ঞ আইনজ্ঞ এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন হাফিজ। ভারতের পক্ষে সেদেশের বিচারক পি এস রাও নিয়োগ পেয়েছেন। অথচ আমাদের পক্ষে দেশের কোনো বিচারক নয়, ঘানার নাগরিক বিচারক টমাস মেনশাহ নিয়োগ পান। পিএস রাও ভারতের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি কয়েকটি নোট-অব ডিসেন্টও দিয়েছেন। আর বাংলাদেশের পক্ষের বিচারক কোনো নোট-অব ডিসেন্ট দেননি। ভারতের পক্ষে সে দেশের অ্যাটর্নি জেনারেল অংশ নিলে বাংলাদেশের পক্ষে তা না হওয়ার কথাও বলেন বিএনপি নেতা।
ড. কামাল হোসেনের মতো আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞ এবং সাবেক সচিব কে এস মোর্শেদের মতো অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের এই ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমে ব্যবহার করা হয়নি। ফলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। সমুদ্রসীমা রক্ষায় আগের সরকারগুলো উদাসীন ছিল- আওয়ামী লীগ নেতাদের এই বক্তব্যের জবাবে হাফিজ বলেন, বিএনপি সরকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আলাদা মেরিটাইম সেল, দক্ষ জনবল নিয়োগ, একটি আলাদা ভবনসহ বিশেষজ্ঞদের যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিয়েছিল।
কেবল তাই নয়, সেময় সমুদ্রে জাহাজ নিয়ে জরিপও চালানো হয়েছিলো। অথচ বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ৭৫ পরবর্তী সরকারগুলো এ বিষয়ে কোনো কাজ করেনি। এটি সঠিক নয়। রায়ের বিস্তারিত তুলে ধরতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা মনে করি, এই রায়ে অনেক অসঙ্গতি রয়েছে। আমরা কতটুক পেয়েছি বলা হলেও ভারত কতটুকু পেল, তা সরকার বলছেন না। অনেককিছুই দেশবাসী জানছে না। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বৈদেশিক কূটনীতি প্রতিবেশী দেশ নিয়ন্ত্রণ করছে। সেজন্য রায়ের বিষয়ে আমরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাই।