মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১০

বগুড়ায় তৈরি টুপি বিশ্ববাজারে

বগুড়ায় তৈরি টুপি বিশ্ববাজারে

টি. এম. মামুন: বগুড়া: কিছুদিন আগেও বগুড়ায় নারীরা ঘরে টুপি তৈরি করতেন পরিবারের সদস্যদের জন্য; নিতান্তই সখের বসে। এরপর পাড়া-মহল্লা ছাড়িয়ে গ্রাম, গ্রাম থেকে উপজেলা, উপজেলা হয়ে জেলা, তারপর রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে সেই টুপি। পরবর্তীতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করায় উৎপাদিত এসব টুপি এখন বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়েছে।

টুপি তৈরি ও বাজারজাত করে একের পর এক স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন বগুড়া জেলার টুপি তৈরিতে নিযুক্ত নারী কারিগরেরা। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে জাতীয় অর্থনীতিতেও।

এদিকে, মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদ-উল ফিতরকে সামনে রেখে টুপি তৈরির চাপ আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। বহির্বিশ্বে চাহিদা মিটিয়ে টুপি সরবরাহ করতে হিমশিম থেতে হচ্ছে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে। তাইতো নির্ঘুম কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন পাড়াগাঁয়ের ‘টুপিকন্যারা’। তাদের কারিগরি নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় সুতো আর ক্রুশ কাটার মিলিত বন্ধনে তৈরি হচ্ছে রং-বেরংয়ের বাহারি টুপি।

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার চকধলি গ্রামের ‘জুয়েল ক্যাপ ডিপো’র স্বত্বাধিকারী মো. জুয়েল আকন্দ বাংলানিউজকে জানান বগুড়ার টুপি তৈরির ইতিহাস।

তিনি জানান, ১৯৯৩ সালে তার দাদা আব্দুর রশিদকে (বর্তমানে মৃত) শখের বসে একটি টুপি তৈরি করে দেন তার মা ফরিদা বেগম। ছেলের বউয়ের হাতের তৈরি টুপি মন কারে শ্বশুরের। এরপর বাজার থেকে আরও সুতা এনে পরিবারের অন্যদের জন্যও টুপি তেরি করতে বলেন আব্দুর রশিদ। ফরিদা বেগমের তেরি টুপি কদর পায় প্রতিবেশীদের কাছেও। প্রতিবেশীদের আগ্রহে ফরিদা বেগম টুপি তৈরির কৌশল শিখিয়ে দেন পাড়া-প্রতিবেশী নারীদের। এরপর হাতে তৈরি এসব টুপি ছড়িয়ে পড়ে পাড়া-মহল্লায়।

হাতে তৈরি এসব টুপির জনপ্রিয়তা ও চাহিদা বিবেচনা করে বাণিজ্যিকভাবে টুপি তৈরির চিন্তা আসে ফরিদা বেগমের পরিবারের। এরপর ঢাকার সদরঘাটের চ্যানেল ওয়ান ইন্টারন্যাশনাল থেকে সুতা কিনে পাড়া-মহল্লায় বিতরণ করে টুপি বানিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়। কিন্তু চাহিদার তুলনায় প্রয়োজন মতো ঢাকার দোকানগুলো সুতা সরবরাহ করতে না পারায় নিজেই সুতা তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। শুরু হয় যন্ত্র কিনে নিজের তৈরি সুতা দিয়ে টুপি বুননের কাজ। মাত্র এক বছরের মাথায় বগুড়া বড় মসজিদ এলাকায় অবস্থিত নুরুল্লাহ ও বিসমিল্লাহ টুপি ঘরে পাইকারি টুপি বিক্রি শুরু করেন ফরিদা।

পরবর্তীতে আরও অধিক লাভ পেতে সরাসরি ঢাকার চকবাজারে টুপি বিক্রি শুরু করে পরিবারটি। চকবাজার থেকে বগুড়ায় তৈরি এসব টুপি বর্তমানে রপ্তানি হচ্ছে ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, দুবাই, ইন্দোনেশিয়া ও চীনে। এরপর এসব দেশ থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে বগুড়ার টুপি। মালিক পক্ষের দাবি- বাংলাদেশ তো বটেই, এশিয়ার মধ্যে এতবড় টুপি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান আর দ্বিতীয়টি নেই।

টুপি বুননের সঙ্গে জড়িতরা বাংলানিউজকে জানান, বগুড়ার সদর উপজেলার একাংশ, শেরপুর ও ধুনট উপজেলার অধিকাংশ গ্রামসহ সারিয়াকান্দী, শিবগঞ্জ, কাহালু এবং পার্শ্ববর্তী সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুর, রায়গঞ্জ ও তাড়াশ উপজেলার কয়েক লাখ নারী এই পেশার সঙ্গে জড়িত।

টুপি বুননের কাজে জড়িত ধুনট উপজেলার স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের স্কুল শিক্ষার্থী শারমিন, আফরোজা, লাবনী, পলি, গৃহবধূ বিশ্বহরিগাছা গ্রামের সালেকা, শিরিনা আকতার, কুলসুম বিবি জানান, তারা অনেক ছোট থেকেই নিজেকে টুপি তৈরির পেশার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ঠিকভাবে কাজ করলে দিনে ৩টি টুপি বুননো সম্ভব।

তারা বলেন, লেখাপড়ার ফাঁকে, টেলিভিশন দেখতে দেখতে, গল্প করতে করতে বসে, বা সাংসারিক কোনো কাজের ফাঁকে ফাঁকে টুপি বুননো যায় অনায়াসে। শিক্ষার্থীরা তাদের লেখাপড়ার ও বিনোদন খরচ যোগাতে পারে। একজন গৃহিণী তার অর্জিত আয় দিয়ে সংসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একজন কর্মী অন্যান্য কাজের ফাঁকে প্রতিমাসে অনায়াসে আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকা আয় করতে পারেন।

গ্রাম পর্যায়ে টুপি তৈরির মহাজন হিসেবে পরিচিত আব্দুল মান্নান ও শহিদুল ইসলাম জানান, ৭০ টাকা দামের একটি মোটা ববিন সুতা দিয়ে ১৫ থেকে ১৬টি ও ৮০ টাকার চিকন ববিন সুতা দিয়ে ২০ থেকে ২২টি টুপি তৈরি করা যায়। এক ডজন মোটা সুতার টুপি ৩০০ থেকে ৪৮০ টাকায় কিনে ৩৬০ থেকে ৪২০ টাকায় এবং চিকন সুতার টুপি ৩৬০ থেকে ৬০০ টাকায় কিনে ৪২০ থেকে ৬৬০ টাকায় বিক্রি করা হয়। পাইকারি হিসেবে প্রকারভেদে আনারস টুপি ৪৭ টাকা, গাছফুল ৩০ টাকা, মৌমাছি ২৪ থেকে ২৮ টাকা, মাকড়শা ২৫ টাকা, বিস্কুট ২০ থেকে ২২ টাকা, পাঁচ পয়সা ও কদমফুল ১৬ টাকা করে ক্রয় করা হয়।

মেসার্স জুয়েল ক্যাপ ডিপো’র স্বত্বাধিকারী মো. জুয়েল আকন্দ বাংলানিউজকে জানান, শুধুমাত্র বগুড়াতে প্রায় ৪ লাখ নারী এই পেশার সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে। এছাড়া বর্তমানে তার নিয়ন্ত্রণাধীন কর্ম এলাকা থেকে প্রতিমাসে ১০ লাখ পিস টুপি তৈরি করা হচ্ছে।

সুতা তৈরির জন্য শুল্কমুক্ত মেশিনারি আমদানিসহ সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা পেলে ব্যবসাটি আরও দ্রুত প্রসার লাভ করবে বলেও জানান জুয়েল আকন্দ।

 




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026