সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:৩০

চোখের ডাক্তার

wpid-eyeglass-lenses.jpg

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

 

ডা. ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ দিন শুরু করেন সকালে। যদিও আগের দিন রাত তিনটে পর্যন্ত পড়তে হয়েছে। এরপর সারা দিন হাসপাতালে। বিকেলে প্রফেসরের সাথে অস্ত্রোপচারে সাহায্য করতে অপারেশন থিয়েটারে ঢোকা। সন্ধ্যার আগেই ফিরলেন বাসায়। গাড়িটি একটু গুছিয়ে নেওয়া, সবকিছু ঠিকমত আছে কিনা দেখে নেওয়া। রওনা দিলেন বগুড়ার দিকে। অবরোধের বন্ধনমুক্ত গাড়ির ঢলে রাস্তা বন্ধ। এক মিনিট গাড়ি চলে তো তিন মিনিট বন্ধ। রাস্তার পাশে চড়াই-উতরাই-ই সই। বগুড়া ঢোকার আগে শেরপুরে মায়ের সাথে দেখা করা। এরপর গ্রামের বাড়ি ধুনটে পৌছলেন সকাল পৌনে সাতটায়।

ম্যানুয়াল গাড়িতে বসে স্টিয়ারিং এর সাথে বারো ঘন্টা যুদ্ধের ধকল সামলাতে একটি ঘন্টা ঘুমালেন তিনি। মাত্র একটি ঘন্টা। আমাদের ঘুম ভাঙল ডাক্তার সাহেবের স্বরে, ‘মা কী হয়েছে ডান চোখে?’

সকাল আটটা থেকে জনা বিশেক রোগী দেখা। দশটার সময় ডাল-ভাত খেয়ে রওনা দিলেন আরেকটি হাসপাতালে। পথে আমাদের নামিয়ে দিলেন কম্বল গ্রামের কাছাকাছি। সকাল এগারোটা থেকে জুম’আর সলাতের বিরতি বাদ দিয়ে আসর পর্যন্ত রোগী দেখলেন তিনি। মাসে মাত্র দু’বার আসতে পারেন তিনি–ভিড় হয় অনেক। আসরের সলাত পড়ে করলেন একটি ছোট অস্ত্রোপচার। গ্রামের হাসপাতাল, অস্ত্রোপচারের সবগুলো জিনিস তাকেই গোছাতে হয়। তিনিই নার্স, তিনিই সাহায্যকারী, তিনিই ডাক্তার।

এরপরেও শেষ রোগীটির সাথেও হেসে কথা বলেছিলেন তিনি। নিজ চোখে দেখা। বাজারে নামলেন নানার জন্য দই কিনবেন বলে। গ্রামে এলে বৃদ্ধ নানার সাথে একবার দেখা করে যান তিনি। আত্মীয় অনেক, সম্পর্ক আছে সবার সাথেই। মাত্র দশমিনিটে যতজনের সাথে হাত মেলালেন তাতে বুঝলাম জীবনে একবার যাদের সাথে হাত মিলিয়েছেন তারা ডাক্তার সাহেবকে ভোলেনি।

মাগরিব পড়ে ধুনটে নিজ হাতে গড়া হিফজখানাতে ফিরে এলেন। আমাদের ঘুরে দেখালেন পুরো প্রজেক্ট। তার নিজের দুই সন্তান পড়ে হিফজখানাতে। অন্যের বাচ্চাকে কুরআন মুখস্থ করতে বলবেন আর নিজের বাচ্চারা খালি দুনিয়ার পেছনে ছুটবে? ব্যাপারটা মুনাফেকি মনে হয়েছে তার কাছে। নিজের সন্তানদের মতো তার প্রতিষ্ঠানের বাচ্চাগুলোকেও তিনি এমনভাবে পড়ানোর ব্যবস্থা করেছেন যেন তারা কুরআন হিফজের পাশাপাশি মূলধারার পড়াশোনাতেও পিছিয়ে না থাকে।

প্রতিষ্ঠানের সমন্বায়কের সাথে বসলেন। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সাথে কথা বললেন। কী দরকার শুনলেন, সবার পড়াশোনার খবর নিলেন। প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস সিক্স পাশ করা একটা ছেলে কীভাবে বাংলা পড়তে পারে না—এটা তার কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়। সেইজনই তার এই প্রয়াস। বেশ কয়েকজন গ্রামের মানুষের সাথে কথা বললেন তাদের কাজ নিয়ে। কিছুটা দিক নির্দেশনা দেওয়া, কাজে উৎসাহ দেওয়া। খালি মুখে চিড়ে ভেজে না। এই মানুষগুলোদের তিনি কর্দে হাসানা দিয়েছেন—সুদ ছাড়াই ঋণ। কাউকে গরু, কাউকে ভ্যান, কাউকে সেলাই মেশিন কিনে দিয়েছেন। দিয়েই কাজ শেষ না, খোজখবরও রাখতে চেষ্টা করেন ভদ্রলোক। দু’দিনে এক মাসের কাজ করা সহজ ব্যাপার না। ডা. ইবাহ্রিম সেটা করেন। তিনি পরিকল্পনাও করেন। এ বছর আমরা কম্বল কিনলাম সিরাজগঞ্জের কাজিপুর এলাকার শিমুলদহ গ্রাম থেকে। তিনি খোঁজ নেওয়া শুরু করেছেন কোথায় ঝুট কাপড় পাওয়া যায়। তার গ্রামের মহিলাদের একসাথে করে কম্বল বানানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় কীভাবে। ভালো সুতার দুই সেলাই—এমন কম্বল যার দশ বছরেও কিছু হবে না। আগামী বছর যেন আমরা নিজেরা কম্বল তৈরী করতে পারি।

গ্রাম থেকে বাজার করেন তিনি। সস্তায় পান। আহামরি আয় নয় তার। অপেক্ষায় আছেন—এফসিপিএস পরীক্ষায় উৎরে গেলে আয়ের দিকে হয়ত আরেকটু মনোযোগ দিতে পারবেন। সবজি কিনেছেন। সবটাই তার জন্য নয়। বাসার দারওয়ানকে দেন তিনি—উপহার হিসেবে। দারওয়ান তার ভাই, তার মতোই গ্রাম থেকে উঠে আসা মানুষ—তাজা সবজি পেলে খুশি হয়।

এরপর ফেরা ঢাকার পথে। বিচিত্র অভিজ্ঞতা। তার এক টায়ার মেকানিকের বন্ধুর সাথে বসে চা খেলাম। রাস্তায় আটকে পড়লেই ট্রাক চালকদের কাছে বিনীত অনুনয়–ওস্তাদ একটু যেতে দেন। ৩৩ ঘন্টার ঝটিকা সফর শেষে রাত তিনটায় ঢাকায় পৌছলাম আমরা। অনুরোধ করলেন সরোবরের কোনো কাজে যেন তাকে নেই, অন্য কিছু না হোক এক্সট্রা ড্রাইভার হিসেবে যেন সুযোগ দেই। গাড়ি যে তিনি ভালো চালান আমি তো দেখেছিই।

ডা. ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ কারো কাছে শুধুই একজন সরকারী চাকর। কারো কাছে তিনি সহৃদয় ডাক্তার যিনি বিনে পয়সার চোখ দেখে দেন। ওষুধ দেন। কারো কাছে তিনি সমাজসেবক। কিছু অসহায় ছেলের কাছে তিনি আশ্রয়দাতা, শিক্ষাদাতা। কারো কাছে তিনি বন্ধু।

আমার কাছে তিনি একজন অতি মানব। কোনো চামড়া-আঁটা পোশাক পড়া অতিমানব নন। মোটা চশমা পড়া হাস্যোজ্জল একজন মহামানব। যাদের দেখলে জীবনে কেন বেঁচে আছি এ প্রশ্নটা ঘুরপাক খায়। মনে হয়, অতিমানব না হতে পারি, মানুষ তো হই। পশুর মতো ঘুম-খাওয়া-মলমূত্র বিসর্জন-প্রজননের চক্র থেকে বেরিয়ে তো আসি।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026