নিউজ ডেস্ক: মহেশখালীতে ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ৩৬ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে সরকার, যা হবে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যয়ের প্রকল্প। কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীতে এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন না করতে কেন নির্দেশনা দেয়া হবে না- তা জানতে চেয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে একটি রুলও জারি করেছিল হাই কোর্ট।
পরিবেশবাদীদের আপত্তির মধ্যেই গত বছর সুন্দরবনের কাছে রামপালে ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ভিত্তি স্থাপনের পর মহেশখালীতে এই প্রকল্প অনুমোদন করল সরকার। বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যুতের প্রায় ৭৫ শতাংশই আসে গ্যাস থেকে; কয়লা থেকে আসে ৩ শতাংশেরও কম। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার মোট বিদ্যুতের ৫০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে।
কার্যপত্রে প্রকল্পটিকে উল্লেখ করা হয়েছে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি মূল্যমানের উন্নয়ন প্রকল্প হিসাবে। এতে বলা হয়েছে, মহেশখালীর মাতারবাড়ি ও ধলঘাটা ইউনিয়নে চলতি বছরই এ প্রকল্পের কাজ শুরু হবে; শেষ হবে ২০২৩ সালের অক্টোবরে। এই সময়ের মধ্যে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৬৪৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১০৪ কোটি ২৬ লাখ, ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ২৯৪১ কোটি ৪০ লাখ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫৮২৮ কোটি ১৮ লাখ, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৪৮৬ কোটি ৬৬ লাখ, ২০১৯-২০ অর্থ বছরে ৩৭৫৯ কোটি ২ লাখ, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৪৬৬১ কোটি ৫২ লাখ, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬৯৬৭ কোটি ৫২ লাখ এবং ২০২২-২৩ অর্থ বছরে ৬৫৯০ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয় হবে বলে ধরা হয়েছে।
প্রকল্পের সার সংক্ষেপে বলা হয়েছে, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ‘আলট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি’ ব্যবহার করা হবে, যাতে কেন্দ্রের কর্মদক্ষতা হবে ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ। বাংলাদেশের বর্তমানে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর গড় কর্মদক্ষতা ৩৪ শতাংশের বেশি নয়। বেশি কমর্দক্ষতার প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে কম কয়লার প্রয়োজন হবে এবং কম কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে। ফলে বায়ুদূষণসহ পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে একেবারেই কম।
এছাড়া নাইট্রাস অক্সাইডের পরিমাণ কমিয়ে আনতে এ প্রকল্পে লো রেট বার্নার, সালফার-ডাই অক্সাইড নিঃসরণ কমাতে ডি-সালফারাইজেশন পদ্ধতি এবং ছাই বা এ্যাশ নির্গমণ কমাতে ইলেকট্রোস্ট্যাটিক প্রিসিপিটেটর ব্যবহার করা হবে বলে সার সংক্ষেপে উল্লেখ করা হবে। দেশে মাতারবাড়িতেই প্রথমবারের মতো বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বাষ্প তৈরি ও শীতলীকরণে সমুদ্রের পানি (সারফেস ওয়াটার) ব্যবহার করা হবে।
এ প্রকল্পের ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট চলবে ৪৭০০-৫২০০ কিলোক্যালরি/ কিলোগ্রাম মানের আমদানি করা কয়লায়। সার্বিক কর্মকাণ্ডের জন্য আবাসিক-অনাবাসিক বিভিন্ন ধরণের ভবন, পানিশোধন ব্যবস্থা, জেটি নির্মাণসহ একটি টাউনশিপ নির্মাণ করা হবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি আল্ট্রা-সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি সমৃদ্ধ হওয়ায় মূল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যন্ত্রপাতির দাম পড়বে বেশি। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সাব-বিটুমিনাস কয়লা ব্যবহার করা হবে। এ কয়লার দাম বিটুমিনাস কয়লার চেয়ে কম হওয়ায় বিদ্যুতের দাম কম হবে।
একনেকের বৈঠক শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ভবিষ্যতে ওই এলাকায় আরও দুটি পাওয়ার প্ল্যান্ট করা হবে, নির্মাণ করা হবে এলএনজি টার্মিনাল। পরিবেশ অধিদপ্তর এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট সার্টিফিকেট দেয়ায় পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা নেই।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহতি, শিল্পমন্ত্রী আমরি হোসনে আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী আবদুল লতফি সিদ্দিকী, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
সরকার মাতারবাড়িতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়ার পর মহেশখালীর তিন বাসিন্দা হাই কোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। এর প্রাথমিক শুনানি করে বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের বেঞ্চ গত ১০ ফেব্রুয়ারি একটি রুল জারি করে।
প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি এবং চারপাশের জীবনের প্রতি ধ্বংসাত্মক বিবেচনায় এবং অত্যন্ত উর্বর জমি ও অধিবাসীদের স্বাস্থ্য রক্ষায় মাতারবাড়িতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন না করতে কেন নির্দেশনা দেয়া হবে না- তা জানতে চাওয়া হয় ওই রুলে।
এ বিষয়ে জানতে আবেদনকারীদের আইনজীবী ব্যারিস্টার শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মঙ্গলবার তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের পক্ষ থেকে রুলের জবাব তারা পেয়েছেন। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের অসহযোগিতায় রুলের শুনানি করা সম্ভব হচ্ছে না। সেখানে তারা বলেছে, এই প্রকল্পের ফলে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু কোনো প্রামাণ্য দলিল তারা দেখাতে পারেনি।
এই আইনজীবী জানান, রিট আবেদনে তারা দুটি বিষয় তুলে ধরেন। প্রথমটিতে বলা হয়- এ ধরনের প্রকল্প করতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিতে হবে। কিন্তু রুলের জবাবে এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। দ্বিতীয়ত আমরা বলেছি, প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকায় প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় ৬ হাজার মানুষ বাস করে। এ প্রকল্পটি হলে তারা উচ্ছেদ হবে, জনস্বাস্থ্য হুমকিতে পড়বে। পাশাপাশি নিচু এলাকার মানুষ পুরো ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। করতেই যদি হয়, এ প্রকল্প সরিয়ে সমুদ্রের দিকে নিয়ে যাওয়া হোক। কিন্তু এ সম্পর্কেও আমরা কোনো বক্তব্য পাইনি।
জাকির বলেন, জনস্বাস্থ্য-জীববৈচিত্র্র্য-জলাভূমি-প্রাকৃতিক সম্পদ ইত্যাদি বিষয়ও রুলে ছিল। এসব বিষয়েও কোনো বক্তব্য রুলের জবাবে নেই। এ কারণে আমরা রুল শুনানি করতে চাই। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের অসহযোগিতার কারণে সেটা করতে পারছি না।