বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৩

সাফল্যে পালক ব্যর্থতার তিলক

সাফল্যে পালক ব্যর্থতার তিলক

অনন্ত হক: ১৯৭৮ সালে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ঘোরতর রাজনৈতিক সঙ্কটে ক্ষমতার বৃত্তে জন্ম নেয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। রাজনৈতিক দল হিসেবে এখন বয়স মাত্র ৩৬ বছর হলেও কয়েক দফায় বিএনপি ক্ষমতায় ছিল প্রায় ১২ বছর। প্রথমবার ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ১০ বছর পর আবার দেখা পায় সিংহাসনের। মাঝে আবার এক মেয়াদে বাইরে থেকে ফিরে আসে ক্ষমতায়।

এখন ক্ষমতা থেকে ছিটকে ৮ বছরের বেশি সময় কাটছে আবার ক্ষমতায় আসা কিংবা অর্থবহ প্রধান বিরোধী দল হিসাবে কার্যকর থাকার চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে। সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা, পরনির্ভরশীলতা, কোন্দল, নীতি ও কৌশলগত সীমাবদ্ধতাসহ নানাবিধ কারণে বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে নাজুক সময় পার করছে। সর্বত্র প্রশ্ন, বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে বিএনপি কি আবার ক্ষমতায় আসতে পারবে? নাকি সরকারি দলের রাজনীতি ও চাপের সামনে কোণঠাসাই হতে থাকবে?

বিএনপির অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ  নিয়ে দলের ভেতরের ও বাইরের নেতা-কর্মী, বিশেষজ্ঞসহ নানা মহলের সঙ্গে কথা বলে তৈরি করা হয়েছে দশ-পর্বে ধারাবাহিক বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন। প্রথমে এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রয়োজনে বিএনপি একটি জরুরি প্রসঙ্গ। কারণ, সামরিক নেতৃত্বের দ্বারা বিএনপি প্রতিষ্ঠা লাভ করলেও বাংলাদেশে একদলীয় ব্যবস্থা থেকে গণতন্ত্রে  প্রত্যাবর্তনের কৃতিত্ব এ দলের। আবার দীর্ঘ সামরিক স্বৈরশাসনের কবল থেকে দেশকে সংসদীয় গণতন্ত্রের নবযাত্রায় আনার ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব দিয়েছে বিএনপি। ফলে বর্তমানে বাংলাদেশে বিরাজমান পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বার্থে বিএনপির ইতিবাচক ভূমিকা সকলের কাছেই প্রত্যাশিত।

বিএনপির সাফল্যের পালকে ব্যর্থতার তিলকও কম নয়। দুই-দুইবার বিএনপি জনগণের অধিকারকে সাংগঠনিকভাবে রক্ষায় শোচনীয়ভাবে অসফল হয়েছে। জনগণ ভোটের মাধ্যমে যে গণতান্ত্রিক ক্ষমতা বিএনপিকে দেশ পরিচালনার জন্য দিয়েছিল, সেটা রক্ষা করতে পারেনি বিএনপি। একবার ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয় সামরিক শাসক এরশাদ। আরেকবার সেনা-সমর্থিত মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনরা। এরশাদ ছিলেন জিয়ার দ্বারা উপকৃত। আর মইনউদ্দিন-মাসুদউদ্দিন-ফখরুদ্দীনরা খালেদা জিয়ার মাধ্যমে সুবিধাপ্রাপ্ত।

আঞ্চলিক ও আত্মীয়তাকে প্রাধান্য দিয়ে এমন ব্যক্তিদের বিএনপি সুযোগ দিয়েছিল, যারা বিএনপিরই বারোটা বাজায়নি- বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারাকেও বিচ্যুত করেছিল। রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা বিএনপিকে বারবার ক্ষমতায় থাকার পরও লজ্জাজনকভাবে পতনের সম্মুখীন করেছে। অনেক বিশ্লেষক এখনও মনে করেন, বিএনপির নেতৃত্ব সজাগ ও বাস্তবতামুখী হলে ১/১১-এর সঙ্কট তৈরি হতো না। সে সময় কৌশলজনক অবস্থান নিয়ে দেশের গণতন্ত্র ও দলকে বিপর্যয়ের কবল থেকে বাঁচাতে পারতো বিএনপি।

স্মরণ করা যেতে পারে যে, ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। মোট ২১০টি আসন নিয়ে চারদলীয় ঐক্যজোট ক্ষমতায় উপবিষ্ট হয়। এ সময়ে চাঁপাই নবাবগঞ্জের কানসাটে বিদ্যুতের দাবিতে আন্দোলনে পুলিশের নির্মম হত্যাযজ্ঞে ১০ জনের অধিক গ্রামবাসী হত্যা, ঢাকার শনির আখড়ায় বিদ্যুৎ ও পানির দাবিতে সাধারণ জনতার আন্দোলনের মতো আরও কয়েকটি আন্দোলন হয়।

এছাড়াও সরকারি ত্রাণ তাহবিল থেকে ত্রাণ সামগ্রী সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ সরকারের বৈধ মেয়াদ ২০০৬ সালের ৬ই অক্টোবর শেষ হওয়ার পর ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে দেশে শুরু হয় ব্যাপক রাজনৈতিক সংঘাত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান পদে বিচারপতি কেএম হাসানকে মেনে নিতে রাজি হয়নি আওয়ামী লীগ। প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ একই সঙ্গে রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের যৌথ দায়িত্ব গ্রহণ করা এবং উপদেষ্টাদের সঙ্গে নানা ধরনের মত-পার্থক্য হওয়ায় পরিস্থিতি নাজুক আকার ধারণ করে।

পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায়  ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি  প্রেসিডেন্ট সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। আর এ সময় থেকে প্রায় দুই বছর দেশ পরিচালনা করেন ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। বিএনপির আবদুর রহমান বিশ্বাস যখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তখনও ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় সেনাপ্রধান জেনারেল নাসিমের সঙ্গে তীব্র বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট আবদুর রহমান বিশ্বাস একজন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষ হওয়ায় প্রবল চাপের মুখেও ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন সেটা পারেননি।

তিনি সামরিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করেন। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, ১/১১ সময়কালে যারা বিএনপির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, তারা শুধু বিএনপির দ্বারা উপকৃতই ছিলেন না, বিএনপিপন্থি বলেই পরিচিত ও সুবিধা প্রাপ্ত ছিলেন। এরাই যখন বিএনপিকে ঘায়েল করে, তখন সেটাকে প্রতিহত করার মতো প্রশাসনিক বা সাংগঠনিকভাবে বিকল্প ব্যবস্থা বিএনপি হাতে রাখেনি। ক্ষমতায় থেকেও সেদিন বিএনপি ছিল নিঃসঙ্গ ও অসহায়।

বিতর্কিত ১/১১-এর সরকারের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৩০ আসন নিয়ে জয়লাভ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। এ নির্বাচনে মাত্র ২৯টি আসন পায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং ২৭টি আসনে জয়লাভ করে জাতীয় পার্টি। বিএনপির এত কম আসন লাভ অবিশ্বাস্য। নির্বাচন কারচুপি ও অনিয়মে পূর্ণ ছিল। ১/১১-এর বিতর্কিত সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিএনপি যে ন্যায্য সুবিধা পাবে না, এটা জানার পরও কেন সেদিন দলটি নির্বাচনে গিয়েছিল এবং অবৈধ সরকারকে বৈধতা পাওয়ার পথ করে দিয়েছিল?

বরং আপসহীন নেত্রীর ইমেজে-দৃপ্ত বেগম খালেদা জিয়া এরশাদের আমলের ১৯৮৬ সালে পাতানো নির্বাচনে না-যাওয়ার মতো এ নির্বাচনেও যদি অংশগ্রহণ না-করতেন, তবে তার ইমেজ উজ্জ্বলতর হতো এবং ১/১১-এর বিতর্কিত সরকার বৈধতা নিয়ে সরে যেতে পারতো না। বাংলাদেশও গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে অগণতান্ত্রিক শাসনের প্রলম্বিত প্রক্রিয়ায় আবর্তিত হতো না। একই ভাবে ২০১৪ সালের নির্বাচনে না-যাওয়ার ক্ষেত্রেও সমালোচনা রয়েছে। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে দলের নেতা-কর্মীরা মাঠে সরব থাকতে পারতো এবং প্রয়োজনে নির্বাচনের আগ-মুহূর্তে বর্জন করে সরে এলে আওয়ামী লীগ বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে বিএনপির সঙ্গে আপস করতে বাধ্য হতো।

এমন পরিস্থিতিতে বেগম খালেদা জিয়াও মার্চ ফর ডেমোক্রেসি আন্দোলনে একাকী হয়ে যেতেন না; দলের প্রার্থী, নেতা-কর্মীরা তার সঙ্গে থাকতেন। বলা হয় ১/১১-এর পর যাদের কথায় নির্বাচনে বিএনপি গিয়েছিল, তাদের কথাতেই এবার নির্বাচনে যায়নি। বিএনপির জোটভুক্ত এ দলটির কথা শোনা ও নির্ভরশীল হওয়া বিএনপির জন্য লাভ না ক্ষতির কারণ হয়েছে, সে প্রশ্নও এখন জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে।

পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনীতিতে দল হিসাবে বিএনপির ভবিষ্যৎ এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বার্থে দলটির ভূমিকার প্রসঙ্গও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ, রাজনৈতিক দল হলো রাজনৈতিক ব্যবস্থার লাইফ-লাইন বা প্রাণরেখা। রাজনীতি পরিচালিত হয় রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে। বস্তুত দ্বি-দলীয় ব্যবস্থার বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ একটি বিতর্কিত ও প্রায়-একদলীয় অবস্থায় ক্ষমতায় আসীন রয়েছে। অপর দল বিএনপি এমতাবস্থায় কি করে তার ওপর দলটির ভবিষ্যতের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎও নির্ভর করছে। অতীতের সাফল্য-ব্যর্থতার শিক্ষায় বিএনপি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের স্বার্থে একটি সঠিক পথ বেছে নেবে বলেই সকলে প্রত্যাশা করেন।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026