
সেই সঙ্গে টাঙ্গাইল-৪ আসন থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের দলীয় সংসদ সদস্য পদেরও দ্রুত অবসান চান এ দলটির নেতারা।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল গত ১২ অক্টোবর দলের কার্যনির্বাহী সংসদের সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, দলের সদস্য না থাকলে সংসদ সদস্য পদও থাকবে না।
ওই সভাতেই লতিফ সিদ্দিকীকে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রাথমিক সদস্য পদ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। তাকে দলের প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে চূড়ান্তভাবে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ওই সভায়।
এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে আওয়ামী লীগের ইতিহাসে গত কয়েক দশকের মধ্যে লতিফ সিদ্দিকীই হবেন একমাত্র নেতা, যিনি দল থেকে বহিষ্কৃত হলেন।
একমাত্র ধর্মীয় বিষয় নিয়ে কথা বলে সমালোচনার ঝড় ওঠার কারণেই দলের এই প্রবীণ নেতাকে বহিষ্কার করাসহ স্থায়ীভাবে সাংগঠনিক সম্পর্ক ছিন্ন করার কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে আওয়ামী লীগ নেতারা জানান।
সাম্প্রতিক, দল ও নেতৃত্বের দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েও এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার হননি দলের দুই নেতা। এরা হলেন আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুর রহমান মান্না ও সুলতান মুহাম্মদ মনসুর।
এই দুই নেতা গত কয়েক বছর হলো দল থেকে বিচ্ছিন্ন। বিভিন্ন সময় তারা আওয়ামী লীগ ও সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনাও করেছেন।
মাহমুদুর রহমান মান্না নিজে আলাদা দলও গঠন করেছেন। সুলতান মুহাম্মদ মনসুর আওয়ামী লীগের বাইরে বিভিন্ন ফোরামের সঙ্গে প্রকাশ্য যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। এর পরও তাদের বিরুদ্ধে দল কোনো সাংগঠনিকভাবে শান্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি বা দল থেকে বহিষ্কৃত হননি।
বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সভাতেও আলোচনা হয়েছে। তাদের কারণ দর্শানো নোটিস দিয়ে দল থেকে বহিষ্কার দাবি করা হয় সভায়। কিন্তু এর পরও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
আওয়ামী লীগের নেতারা জানান, এর আগে ড. কামাল হোসেন, কাদের সিদ্দিকী, মোস্তফা মহসিন মন্টু আওয়ামী লীগ ছেড়ে গেছেন। কিন্তু তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়নি।
আওয়ামী লীগ ছেড়ে বাকশাল গঠন করেছিলেন প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক। তাকেও তখন দল থেকে বহিষ্কার করা হয়নি। পরে তিনি আবার আওয়ামী লীগে ফিরে এসেছিলেন।
কিন্তু, লতিফ সিদ্দিকীর ক্ষেত্রে ঘটেছে ব্যতিক্রম ঘটনা। ধর্মের সমালোচনা করায় দ্রুতই তাকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র গঠনতান্ত্রিক বিধান অনুসরণ করার জন্যই তাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়।
তিনি এর যে জবাবই দেন না কেন, তিনি আর দলে থাকতে পারছেন না। এ ব্যাপারে গত ১২ অক্টোবর কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় সর্বসম্মত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে নেতারা আরো জানিয়েছেন।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী হজ ও তাবলিগ জামাতের বিপক্ষে কথা বলে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছেন। তার ওই বক্তব্যের কারণে দ্রুতই তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে মন্ত্রিসভা ও দলের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
শুধু তাই নয়, লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্য পদও দ্রুত বাতিল চায় আওয়ামী লীগ। তবে যেহেতু এটি সাংবিধানিক বিষয়, তাই এর চূড়ান্ত অবসান সময় সাক্ষেপ হতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করছেন।
সাংবিধানিক ধারা অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য দল পরিবর্তন করলে, দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গেলে বা ফ্লোর ক্রস করলে তার সদস্য পদ বাতিল হবে। লতিফ সিদ্দিকীর ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
তাই, তার সদস্য পদ বহাল থাকছে। এই মুহূর্তে তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন। দেশে ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই। দেশে ফেরার অনুকূল পরিস্থিতিও নেই তার জন্য। তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলাও হয়েছে। তাকে গ্রেফতারে পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
তার দেশে ফেরার দায়িত্ব সরকার নেবে না বলেও জানা গেছে। এ অবস্থায় টানা ৯০ কার্যদিবস লতিফ সিদ্দিকী সংসদে উপস্থিত না থাকলে স্বাভাবিকভাবেই তার সদস্য পদ বাতিল হয়ে যাবে। তবে এত দিন অপেক্ষা করার সম্ভাবনা নেই। তার সংসদ সদস্য পদ দ্রুত বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য স্পিকারের হস্তক্ষেপ চাওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।
গত ১৩ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের কাছে লতিফ সিদ্দিকীর সদস্যপদ থাকবে কিনা এ প্রসঙ্গে সাংবিধানিক ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এ সম্পর্কে দলের সাধারণ সম্পাদক কথা বলেছেন। তিনি একইসঙ্গে দলের নীতি-নির্ধারক ও মন্ত্রী অর্থাৎ সরকারেরও নীতি-নির্ধারক। তার বক্তব্যের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার ধৃষ্টতা আমার নেই। আমি শুধু সাংবিধানিক ব্যাখ্যা দিতে পারি।
তিনি বলেন, আমার দৃষ্টিতে তার সংসদ সদস্যপদ যাওয়ার মতো কিছু হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞ বা হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্ট এর ব্যাখ্যা দিতে পারেন। লতিফ সিদ্দিকীর নির্বাচনী এলাকা শূন্য হয়েছে বলে ঘোষণা করা মুশকিল হবে। তিনি পদত্যাগ করলে তা বলা যেত।
এদিকে, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী দল থেকে বাদ পড়লেও সংসদ সদস্যের পদে থাকছেন বলে গত ১৪ অক্টোবর সংসদের প্রধান হুইপ আ স ম ফিরোজ এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন।
তবে এ নিয়ে কোনো বিতর্ক সৃষ্টি হলে স্পিকার দেশে ফিরে এসে আইন বিশ্লেষণ করে তার সমাধান দেবেন বলেও তিনি জানান।
ফিরোজ বলেন, লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্য পদ থাকছে। সংসদ সদস্য পদ বাতিলের বিদ্যমান যে আইন, তা তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কারণ, তিনি দলের বিরুদ্ধে ভোট দেননি, পদত্যাগও করেননি।
দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে সংসদে কিছু করেননি; যে কারণে তার বিষয়টি ফ্লোর ক্রসিংয়ে পড়েনি।