সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২৫

আতঙ্কের নাম সিলেট ছাত্রলীগ

আতঙ্কের নাম সিলেট ছাত্রলীগ

আতঙ্কের নাম সিলেট ছাত্রলীগসেরাজুল ইসলাম সিরাজ: সিলেট থেকে: সিলেটে সিপিবির সমাবেশে হামলা চালায় ছাত্রলীগ। তখন খোদ প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছিলেন জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে। ওই হামলার নেতৃত্ব দেওয়া জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি হিরন মাহমুদ নিপুকে বহিষ্কারও করা হয়েছিলো।

কিন্তু অল্পদিনের ব্যবধানে সেই হিরন মাহমুদ নিপুকে প্রমোশন দিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা বানানো হয়েছে। স্থানীয়রা মনে করেন, সবই ছিলো লোক দেখানো। অল্প দিনের ব্যবধানে পুরস্কৃত করা হয়েছে ক্যাডার লালনকারী এই ছাত্রলীগ নেতাকে।

আর কেন্দ্রীয় কমিটির পদ পেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে নেমে পড়েছেন চাঁদাবাজিতে। টিলাগড় ও এমসি কলেজ এলাকায় নিপু’র ক্যাডারবাহিনীর দৌরাত্ম্যে অতিষ্ট এলাকাবাসী। চলাফেরা করেন এলাকাবাসীর কাছে ‘চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী’ হিসেবে পরিচিত দেবাংশু দাস মিঠু, জাহাঙ্গীর আলম, ডায়মন্ড ও বদরুল ইসলামকে নিয়ে।

সিপিবি সমাবেশে ওই হামলায় সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বাসদ নেতা রাজেকুজ্জামান রতনসহ সিপিবি বাসদের ২০ নেতাকর্মী আহত হয়। ওই ঘটনায় সিপিবির পক্ষ থেকে নিপুসহ ৬১ জনকে আসামি করা হয়। কিন্তু সেই মামলা এখন অন্ধকূপের মধ্যে চলে গেছে।

সিপিবি সিলেট জেলার সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন সুমন বাংলানিউজকে কলেন, ‘ওই মামলার বিষয়ে পুলিশের কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। প্রধান আসামি নিপু হাইকোর্ট থেকে জামিনে রয়েছে। অন্যরা জামিন না নিলেও পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। চার্জশিট প্রদানের বিষয়েও পুলিশের কোনো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।’

তবে সিলেট মেট্রোপলিট্রন পুলিশের (এসএমপি) ভারপ্রাপ্ত কমিশনার এসএম রোকনউদ্দিন দাবি করেছেন, আসামিরা জামিনে রয়েছে। যে কারণে পুলিশের কিছু করার নেই। তদন্ত শেষ হলেই চার্জশিট দেওয়া হবে। এখানে কে ছাত্রলীগ আর কে-কি দেখবে না পুলিশ।

অভিযোগ আছে, নিপুর এই সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে মদদ দিয়ে যাচ্ছেন সিলেট সিটি করপোরেশন (২০ নম্বর ওয়ার্ড) কাউন্সিলর মহানগর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক আজাদুর রহমান ও মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা রণজিৎ সরকার।

এই দুই নেতার মদদে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে নিপু গ্রুপ। এদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না খোদ দলীয় নেতাকর্মীরাও। টিলাগড়, মেজর টিলা, মোহাম্মদপুর, ইসলামপুর, নূরপুর শ্যামলী আবাসিক এলাকায় তাদের অবাধ বিচরণ।

শোনা যায়, খোদ পুলিশ  প্রশাসনও তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায় না।

নিপু গ্রুপের ক্যাডাররা নানা রকম সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িত বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই দাবি করেছেন। নগরের অন্যসব এলাকায় রাতের বেলা তেমন ছিনতাই না ঘটলেও টিলাগড় ও বিমানবন্দর সড়কে প্রায়শ ঘটছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। কথিত আছে, নিপু গ্রুপের লোকজনও এসবের সঙ্গে জড়িত।

নিপু বাংলানিউজকে জানান, টিলাগড় ও এমসি কলেজ এলাকায় ছিনতাই ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। তবে এর সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। প্রতিদ্বন্দ্বীরা তার ভাবমূর্তি নষ্টের জন্য এসব কাজ করে থাকতে পারে।

সিলেট মেট্রোপলিট্রন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার এসএম রোকনউদ্দিন বলেছেন, টিলাগড় এলাকাটি অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। আগে রাতে ওই এলাকায় মানুষ যেতে ভয় পেতো। এখন অনেক কমে গেছে। আগের তুলনায় নাই বললেই চলে।

নিজ দলের লোকজনও রেহাই পাচ্ছে না নিপু গ্রুপের হাত থেকে। নিপু গ্রুপের ক্যাডারদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, এমসি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা ফয়জুল ইসলাম। তার উপর তারা হামলা করেছে।

ফয়জুল ইসলাম বাংলানিউজকে জানিয়েছেন নিপুর নেতৃত্বে টিলাগড় এলাকায় তার উপর হামলা করা হয়। তার মাথা পিঠ ও পায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়। দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও এখনও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না আর।

এমসি কলেজ ছাত্রলীগ কর্মী সুমন দাস, শামীম আহমদ ও জুলহাসও নিপু গ্রুপের ক্যাডারদের হামলার শিকার হন। জুলহাসকে কালাশী রোডে রামদা দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়। এছাড়া আরও অনেক ঘটনা রয়েছে।

এদের কারণে ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ছাত্রলীগ সম্পর্কে সিলেটের সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হচ্ছে। তাদের কাছে সিলেট ছাত্রলীগ আদর্শ নয়, বরং আদর্শহীন এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম।

শুধু নিপু নন,  আরো অনেকেই আছেন যারা স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ হিসেবে পরিচিত। যারা নিজেদের বিতর্কিত কর্মকান্ডের কারণে সংগঠন থেকে বহিষ্কৃত হযেছেন। কিন্তু অল্পদিনের ব্যবধানেই মুক্ত হয়ে ফিরে এসেছেন সগৌরবে।

এসব কারণে মেধাবীরা এখন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে ছাত্রলীগ থেকে। আর সেই স্থান দখল করছে চিহ্নিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও টেন্ডারবাজরা। এদের কারণে সিনিয়র নেতারাও তটস্থ। ভয়ে কিছু বলতেও সাহস সাহস পান না।

মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমেদ কামরানের বক্তব্যেও অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে। নিপুর সম্পর্কে মন্তব্য করতে রাজি হন নি। সিলেট আওয়ামী লীগের এই নীতি নির্ধারক বলেন, বিভিন্ন সময়ে বেশ কিছু দু:খজনক ঘটনা ঘটেছে। আমরা চেষ্টা করেছি বসে এসবের শান্তিপূর্ণ সুরাহা করতে।

নিপু গ্রুপের ক্যাডাররা সিলেট মুরারী চাঁদ(এমসি) কলেজ ছাত্রাবাসে অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ চালায়। ওই সময় সারাদেশে নিন্দার ঝড় ওঠে। সরকার ছাত্রাবাসটি পুনর্নির্মাণ করে দেয়। কিন্তু যারা অগ্নিসংযোগ করে জ্বালিয়ে দিয়েছিল ছাত্রাবাসটি তাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়েই সম্প্রতি নতুন ভবন উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।

সিলেট ছাত্রলীগের হামলা ও চাঁদাবাজিতে অতিষ্ট সাধারণ জনগণ। রেহাই পাচ্ছে না সংবাদকর্মীরাও। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি হামলার কারণে চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন সংবাদকর্মীরা। দু’বছরে ১৬ জন সাংবাদিক ছাত্রলীগের হামলার শিকার হয়েছেন।

স্থানীয় সাংবাদিকরা মনে করছেন, কোনো ঘটনারই বিচার না হওয়ায় ছাত্রলীগের ক্যাডাররা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।  তারা আরও বেশি অপরাধপ্রবণ হ’য়ে উঠেছে। এর খেসারত দিয়েছেন বদরউদ্দিন আহমেদ কামরান। আগামীতে আরও খেসারত দিতে হবে আওয়ামী লীগকে—এ আশংকা সংশ্লিষ্ট অনেকের ।

ছাত্রলীগের সভাপতি এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগ বাংলানিউজকে বলেন, কারো বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পেলে ছাত্রলীগ সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়।
সিলেটে সাংবাদিকের উপর বারবার হামলার ঘটনাগুলোকে তিনি ‘প্রশাসনের ব্যর্থতা’ বলে চালিয়ে দিয়ে বলেন, ‘এ ব্যাপারে ব্যর্থতার জন্য প্রশাসনই দায়ী।’

ছাত্রলীগ সভাপতি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার বাংলানিউজের সাংবাদিকের উপর হামলায় যাদের নাম এসেছে তাদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছে ছাত্রলীগ। অভিযুক্ত ছেলে দু’টির উল্টা-পাল্টা কাজের জন্য নিপু কয়েকদিন আগে বকা দিয়েছে।’

‘নিপু বিরুদ্ধে কোনো তথ্য নেই। তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026