রবিবার, ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৮:৩৬

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করতে পারে নরওয়ে

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করতে পারে নরওয়ে

নিউজ ডেস্ক: রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করতে পারে নরওয়ে। বাংলাদেশ সরকারের এ প্রকল্পে তাদের পেনশন ফান্ড থেকে বিনিয়োগ করার কথা ৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার। কিন্তু সম্প্রতি নরওয়ের কাউন্সিল অন এথিকস পরিবেশগত বিপর্যয়ের কথা বিবেচনা করে ওই বিনিয়োগ প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে। তারা বলেছে, এ তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে যে ঝুঁকি রয়েছে তা অগ্রহণযোগ্য।

গতকাল বৃটেনের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, একই রকম তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র ভারতের ছত্তিশগড়ে স্থাপন করার চেষ্টা করেছিল ভারতের জাতীয় তাপবিদ্যুৎ বিষয়ক কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সেক্ষেত্রে ব্যর্থ হয় ভারত। বাংলাদেশের এ প্রকল্পে ভারতের বিনিয়োগ আছে। এর ভিত্তিতে তারা উৎপাদিত বিদ্যুতের শতকরা ৫০ ভাগ নিয়ে নেবে। কিন্তু এর বিপর্যয়ের শিকার হবেন বাংলাদেশের নাগরিক ও পরিবেশ। সুপারিশে দ্য কাউন্সিল অন এথিকস বলেছে, যদি পরিবেশের ভয়াবহ ক্ষতি মোকাবিলা করার জন্য বাড়তি ব্যবস্থা নেয়া হয় তাহলেও উচ্চমাত্রার ঝুঁকি রয়েছে। তাই ওই স্থানে এমন ভয়াবহ ঝুঁকির কথা বিবেচনায় না নিয়ে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা একেবারে অনুচিত।

তবে পরিবেশ রক্ষায় কি করা হচ্ছে সে বিষয়ে পর্যন্ত তথ্য নেই এ সংক্রান্ত কোম্পানির কাছে। একই সঙ্গে ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ পরিবহনে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও ট্রান্সফরমার বসাতে হবে। ফলে এর জন্য প্রয়োজন অতিরিক্ত অবকাঠামো। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দ্য কাউন্সিল অন এথিকস। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ফ্লাই-অ্যাশ বা বর্জ্য আশপাশে ফেলে ভূপৃষ্ঠকে উঁচু করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ওই কাউন্সিল। তারা বলেছে, এক্ষেত্রে বন্যার সময় যদি ওই এলাকায় পানি প্রবেশ করে তাহলে পারদের মতো ভারি ও বিষাক্ত পদার্থ পানি ও মাটির সঙ্গে মিশবে। এমনিতেই আর্সেনিকের ভয়াবহ বিষক্রিয়া রয়েছে বাংলাদেশের পানীয় পানিতে। এতে বাংলাদেশ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। ওদিকে ওই অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরেকটি ভীতির কারণ।

গত বছর মধ্য ডিসেম্বরে ৩ লাখ ৫০ হাজার লিটার তেল ছড়িয়ে পড়ে সুন্দরবনে। একটি কার্গোর সঙ্গে তেলবাহী ট্যাংকারের সংঘর্ষে এ ঘটনা ঘটে। এতে তেল ছড়িয়ে পড়ে নদীর ৪৫ মাইলের বেশি এলাকায়। এতে গাঙ্গেয় ও ইরাবতী জাতের ডলফিনসহ বন্যপ্রাণীর জীবন ঝুঁকিতে ফেলে। ওই তেলের কিছুটা সংগ্রহ করেছেন স্থানীয়রা। ততক্ষণে ইউনেস্কো এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। জবাবে বাংলাদেশ সরকার সুন্দরবনে তেল ছড়িয়ে পড়ায় ও ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের যথার্থতা নিরূপণে গঠন করে মন্ত্রী পর্যায়ের একটি কমিটি। এসব বিষয় বিবেচনায় দ্য কাউন্সিল অন এথিকস রামপাল প্রকল্প থেকে নরওয়ের বিনিয়োগ প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন বাংলাদেশের সুন্দরবন। তার কাছেই নির্মাণ করা হবে ১৩২০ মেগাওয়াটের রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র। এই বন ইউনেস্কোর বিশ্ব প্রত্নতত্ত্বের অংশ বলে ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু এই বনের কাছেই ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে গত দু’বছরের বেশি সময় বিক্ষোভ করেছে সাধারণ নাগরিক, শিল্পী, সামাজিক ও পরিবেশ সচেতন ব্যক্তিরা। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা থেকে দিঘরাজের দিকে ৫ দিনের মার্চ করেন প্রায় ২০ হাজার মানুষ। ওই লংমার্চ প্রায় ২৫০ মাইল পথ অতিক্রম করে। তাদের দাবি- এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বাতিল করা। ১২০ কোটি ডলারের এ প্রকল্পটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে ভারতের জাতীয় তাপবিদ্যুৎ বিষয়ক কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড।

পরিবেশবিদরা অভিযোগ করছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এতে শুধু ম্যানগ্রোভ বনই দূষিত হবে না, একই সঙ্গে কয়লা প্রজ্বলনের ফলে যে নিঃসরণ হবে তাতে জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে। এমনিতেই বাংলাদেশ নিম্নভূমির। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে যেসব দেশ তার অন্যতম বাংলাদেশ। এখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এটাও সত্য এ দেশের অনেক নাগরিকের নেই বিদ্যুৎ সুবিধা। ২০২১ সালের মধ্যে সস্তায় কয়লাভিত্তিক ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চাইছে সরকার।

তবে বাংলাদেশের নাগরিকরা যখন ভুগবেন, পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে তখন এর শতকরা ৫০ ভাগ বিদ্যুতই নিয়ে নেয়ার কথা ভারতের। বলা হয়েছে ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সুন্দরবনের মধ্যে রয়েছে ৯ মাইল দূরত্ব। তবে পরিবেশবিদদের দাবি, এই দূরত্ব ৫ মাইলের বেশি নয়। এরই মধ্যে ওই এলাকা থেকে অনেক পরিবারকে উচ্ছেদ করে তাদের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এসব জমিতে তারা চিংড়ি ও ধান চাষ করতেন। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা অথবা অস্ট্রেলিয়া থেকে ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টন কয়লা আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য ম্যানগ্রোভ বনের ভিতর দিয়ে যেসব নৌপথ আছে তা নিয়মিত খনন করতে হবে, যাতে সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে জাহাজ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। এতে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। পানি বেশি ঘোলা হয়ে উঠতে পারে। স্রোত বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে দেখা দিতে পারে নদীভাঙন। এ নিয়েই পরিবেশবাদীরা সোচ্চার হয়েছেন। ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র শীতল করার জন্য পরিবর্তন করা হয়েছে পশুর নদীর পানির গতিপথ। এতে ম্যানগ্রোভ বন বেশি লবণাক্ত হয়ে ওঠার ঝুঁকি রয়েছে।

অন্যদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে যে গরম পানি নদীতে ছেড়ে দেয়া হবে তাতে জলজ জীবচক্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ধারণা করা হচ্ছে, এখান থেকে বছরে কমপক্ষে ১০ লাখ টন বর্জ্য উৎপাদিত হবে। তবে তা কিভাবে শোধন করা হবে সে সম্পর্কে কোন পরিষ্কার ধারণা দেয়া হয়নি। পরিবেশ বিষয়ক তথ্য বলে যে, পর্যায়ক্রমিক ঘূর্ণিঝড়ের সময় সালফার ডাই- অক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড উড়িয়ে নিতে পারে বাতাস। তবে এ আশঙ্কা, উদ্বেগ প্রশমনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে বলেছেন, সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের কোন ক্ষতি করবে না এই বিদ্যুৎকেন্দ্র।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2025