ইসলাম থেকে ডেস্ক: মানুষের সাতটি মৌলিক গুণ হচ্ছে ১.জীবন ,২.জ্ঞান ,৩.দর্শন ৪.শ্রবণ ৫.কথন, ৬.ক্ষমতা এবং ৭.উদ্দেশ্য এই গুণগুলো প্রকৃতপক্ষে মানুষের রুহের। মানুষের শরীর হচ্ছে একটা জায়গা যা মানুষের রুহের জন্য ঘর হিসেবে কাজ করে। যখন আমরা মারা যাই আমাদের রুহ একটা নতুন শরীরের সাথে সংযুক্ত হয় ।( যা আমাদের চোখে অদৃশ্য এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য গ্রহণযোগ্য)।
মানুষের রুহ যদিও এই পৃথিবীর শরীর বা পরকালের শরীরের সাথে সংযুক্ত থাকুক না কেন এর মৌলিকগুণগুলো এর সাথেই থাকে। এর অর্থ হচ্ছে আমাদের রুহানী মৌলিকগুণাবলী (অথবা মানুষের আত্মার মৌলিক গুণণ) অরিবর্তিত অবস্থায় থাকে যদিও আমরা এই পৃথিবীতে থাকি বা পরকালের জগতে থাকি।আমাদের শরীর যখন কবরে রাখা হয় তখন আমাদের এই জগতের সাথে যে সম্পর্ক তা শেষ হয়ে যায় ।ধীরে ধীরে আমাদের শরীর মাটির নিচে পচে যায় ।
যেহেতু আত্মাকে এই জগতের শরীর থেকে পৃথক করে ফেলা হয় , এটি হারিয়ে ফেলে জীবন ,শোনা,দেখা সকল বৈশিষ্ট্য ।মৃত ব্যক্তিটি ভালো হোক বা খারাপ হোক ,মুসলমান হোক বা অমুসলিম হোক্ তাকে মৃত্যুর পরবর্তী জগতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং একটি নতুন শরীর পায় ।মৃত্যুর পরবর্তী নতুন শরীরের উপর আজাব অথবা সওয়াব হয় ।জাহন্নামেও একই যখন প্রদত্ত নতুন শরীরকে পোড়ানো হয়,একটি নতুন শরীর সংযুক্ত হয় মানুষের সাথে এবং আজাব চিরকাল চলতে থাকে ।
হাদীসে প্রদত্ত কবরের আজাব মাটির কবরের সাথে সম্পৃক্ত না যেখানে আমাদের মৃত শরীর রাখা হয় ।মাটির কবর শুধু ব্যবহৃত হয় আমাদের শরীরগুলোর পচনের জন্য যা আমাদের এই পৃথিবীতে দেওয়া হয়েছিল ।
যে জায়গাটিতে তাদের কবর দেওয়া হয় সেই জায়গাটি মৃত ব্যক্তির জন্য আমাদের জগতের সাথে একটি যোগাযোগের জায়গায় পরিণত হয়।
মৃত ব্যক্তিকে নিম্নোক্ত ভাগে ভাগ করা যায় –
১) অমুসলিম ও মুসলিম সম্প্রদায় যারা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে ।
২) অপরাধী মুসলমান যারা ঠিকমত উওর দিতে পারে নি
৩)সাধারণ মুসলমান যারা পরীক্ষায় পাশ করে ।
৪)সালেহীন ও ভালো মুসলমান যারা পরীক্ষায় পাশ করে ।
৫)আল্লাহর আওলিয়া এবং ইহসানের শেখ ।
অপরাধী মুসলমান
অপরাধী মুসলমানদের শাস্তি দেওয়া হয় তাদের আগের গুণাহের জন্য।তাকে পরকালের জীবনে একটি নির্দিষ্ট বদ্ধ কক্ষে সাজা দেওয়া হয় ।এই কক্ষটির যোগাযোগ থাকে আমাদের জগতের সাথে সেই জায়গায় যেখানে তাকে কবর দেওয়া হয় ।
এই কারণেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) খেজুর গাছের সবুজ পাতা রেখেছিলেন দুইটি কবরের উপর এবং বলেছিলেন যে যতক্ষণ এরা সবুজ থাকবে (অর্থাৎ আল্লাহর জিকির করতে থাকবে এবং এই জিকির দ্বারা)মৃত ব্যক্তির আজাব হ্রাস পেতে পারে ।
হাদীসে আছে ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত,
একদা রাসুলুল্লাহ (সাঃ) দুইটি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং বললেন ,”এই দুইটি মানুষকে আজাব দেওয়া হচ্ছে খুব বড় কোন অপরাধের জন্য নয় ।তাদের একজন কখনও নিজেকে নিজের প্রস্রাবের ছিটা থেকে নিজেকে রক্ষা করে নাই ,অপর একজন গীবত করে বেড়াত ।“
রাসুলআল্লাহ সাঃ তখন খেজুর গাছের একটি সবুজ পাতা নিলেন,এটিকে টুকরো করে ছিড়লেন এবং প্রতিটিকে প্রতিটি কবরের উপর নির্দিষ্ট করে রাখলেন ।
তারা বলল, “ইয়া রাসুলআল্লাহ (সাঃ) !আপনি এমনটি কেন করলেন?”
তিনি উত্তর দিলেন ,”আমি আশা করি যে তাদের আজাব কমে যেতে পারে যতক্ষণনা এগুলি (পাতার টুকরোগুলো)শুকিয়ে যায়।“(বুখারী বই ৪ হাদীস ২১৭)
উপরের হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে ,কবরের আজাব দেখাটা সুন্নাহ এবং অনেক ওলী আল্লাহকে স্পিরিচুয়েল ভিশন (অন্তর্দৃষ্টি ) দেয়া হয়।যা দ্বারা তারা এটা দেখতে পায় ,এবং সুন্নাহ অনুযায়ী সবুজ পাতা এবং টাটকা ফুল কবরের উপর রাখা হয় আজাব কমানোর জন্য ।
এভাবে টাটকা ফুল পাতা কবরের উপর রাখাটা সুন্নাত
কেউ যদি কবর জিয়ারত করে এবং কোরআন তেলাওয়াত করে তাহলে এটা আশা করা যায় যে মৃত ব্যক্তির আজাব কমে যাবে তার বার বার কবর জিয়ারত ও সেখানে কুরআন তেলাওয়াতের জন্য। এমনকি যে মৃত ব্যক্তিটি পরকালের পরীক্ষায় পাশ করেছে এবং আমরা যদি তার কবর জিয়ারত করি এবং কোরআন তেলাওয়াত করি,এটি তাদের সাহায্য করে বেশি পুরস্কার পেতে ।আমরা বাসাতেও প্রার্থনা করতে পারি আল্লাহর কাছে আমাদের মৃত আত্মীয়ের রহমতের জন্য ।
আমরা মিলাদুন্নবী (সাঃ) এর দিন এবং অলি আওলিয়াদের জন্মদিনের দিন গরীবদের যে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করি তা আমাদের মৃত আত্মীয় স্বজন যাদের খুব প্রয়োজন তাদের খুব উপকারে আসে পরকালের জগতে ।
মুসলমান যারা পরালের পরীক্ষায় পাশ করে
একজন সাধারণ মুসলমান যে পরীক্ষায় পাশ করে তাকে তার মৃত্যুর পর পরকালের জগতে একটি বিশেষ কক্ষ দেওয়া হয়,যার একটি জান্নাতের জানালা তার জন্য খোলা থাকে ,যেখান থেকে সে জান্নাতের ঠান্ডা বাতাস পায় ।যেন খুব ক্ষমতাবান এয়ার কন্ডিশনার থেকে ঠান্ডা ,সুগন্ধি ,আরামদায়ক বাতাস বইতে থাকে ।তাকে কেয়ামত পর্যন্ত একটি বিশেষ আরামদায়ক বিছানায় ঘুমাতে দেয়া হয় ।ঘুমন্ত মুসলমানদের আমাদের জগতের সাথে যোগাযোগ থাকে সেই জায়গায় যেখানে তাকে কবর দেয়া হয় ।যখন আমরা তাদের কবর জিয়ারত করি তখন তারা কোনরকমে মাঝে মধ্যে বুঝতে পারে,তথাপি তারা জানতে পারে যে এই জগতের কেউ একজন তার কবর জিয়ারত করে গেছে ।আমাদের তাদের কবর জিয়ারত করা এমনটি যেন তাদের দরজায় নক করার মত,কিন্তু তারা কোনরকমে আমাদের সাথে কথা বলে ।
ভালো মুসলমান ,সালেহীন
একজন ভালো মুসলমান যে পরীক্ষায় পাশ করে তার ঘুমানোর দরকার হয় না।তাকে মৃত্যু পরবর্তী জীবনে পরকালের জগতে ভালো ঘর এবং খাবার দেওয়া হয় ।তারা মুক্ত মানুষ। যখন আমরা তাদের কবর জিয়ারত করি এবং সালাম দেই তারা আমাদের কথা শোনে ।তারা সালামের জবাব দেয় ।তাদেরকে যাই বলা হয় তারা তা শুনতে পায় ।এটা এমন যে আমাদের এই জগতের জীবিত আত্মীয়দের সাথে দেখা করতে যাওয়ার মত।
হাদীসে বর্ণীত আছে “ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত , রাসুলআল্লাহ (সাঃ) মদীনার কিছু কবরের পাশ দিয়ে গেলেন –উনি উনার চেহারামোবারক তাদের দিকে ফিরালো
এবং বললেন তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিতৃ হোক ও কবরবাসী!আল্লাহপাক ক্ষমা করুক আমাদের এবং তোমাদের। তোমরা আমাদের আগে চলে গেছ এবং আমরা অনুসরণ করব ।“(তিরমিজি চাপ্টার ৫৯ হাদীস ১০৫৫)
“যদি একজন সালাম দেয় একজন মৃত ব্যক্তিকে সে জানতে পারে তার কবরের পাস দিয়ে যাওয়ার সময়,মৃত ব্যক্তিটি তার সালামের জবাব দেয় এবং তাকে চিনতে পারে ।যদি একজন সালাম দেয় একজন মৃত ব্যক্তিকে তাহলে সে জানে না যে তার কবরের পাস দিয়ে যাওয়ার সময় ,মৃত ব্যক্তিটি তার সালামের উত্তর দেয়।“(গাজালী লহইয়াউলউমিদ্-দ্বীন, ,জিয়ারাতুল কুবুর)
কিন্তু সমস্যা হল আমরা তাদের দেখতে পাই না।তারা আমাদের দেখতে পায় এবং শনতে পায় যা কিছু বলা হয় ওদের মুখ দিয়ে ও অথবা অন্তরের চিন্তার মাধ্যমে ,তারা সব শুনতে পায়।মৃত্যুর পরবর্তী জগতে শোনার যে নিয়ম নীতি তা এই জগত অপেক্ষা ভিন্ন।তারা মুক্ত মানুষ এবং আল্লাহর রহমত তাদের উপর এবং তাদের মৃত্যু পরবর্তী জীবন আরামদায়ক।
আল্লাহর ওলী এবং ইহসানের শেখ
আল্লাহর ওলী এবং ইহসানের শেখগণ মৃত্যু পরবর্তী জীবনে অসাধারণ স্বাগতম ও জাকজমকপূর্ণ আচরণ পায় ।তারা মৃত্যুর পর আরামদায়ক জীবন উপভোগ করতে থাকে।তারা পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে ,রোজা রাখে যেমন আমরা রাখি রমজানের সময়।
হাদীসে বর্ণিত আছে,”রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন :আল্লাহ জমীনকে হারাম করে দিয়েছেন নবীদের শরীর খেতে।তাই নবীগণ রওজায় জীবিত আছেন এবং তারা প্রত্যেহ তাদের রিজক পান।“(ইবনে মাজাহ্,আবু দাউদ,নাসাঈ,ইবনে হিব্বান,দারমী ইত্যাদি)
হজরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) হতে বলেন ,”নবীগণ রওজায় জীবিত ,এমনকি তারা রওজায় নামায পড়েন”(মুসলিম শরীফ)
কুরআনে আছে “আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তাদেরকে তুমি কখনো মৃত মনে করো না। বরং তারা আল্লাহর কাছে জীবিত ও তারা জীবিকাপ্রাপ্ত(তাদের রিজক দেয়া) হয়।“(সুরা আল ইমরান আয়াত ১৬৯)
কুরআনে আছে “আর যারা আল্লাহর পথে মৃত্যুবরণ করে, তাদেরকে মৃত বলো না।তারা জীবিত কিন্তু তোমরা তা বোঝ না ।“(সুরা আল বাকারা আয়াত ১৫৪)
এই আয়াতগুলো শুধু শহীদদের জন্য নয় ।সাহাবী,ইমাম ও ওলীদের জীবনী পড়া উচিৎ ।তারা কি কষ্ট করে নিজেদের গড়ে তুলেছে ,কত কষ্টের সাথে তাদের নফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে ।কত কষ্ট করে ইসলাম ছড়িয়েছে ।সহীহ ঈমান ছড়ানোর জন্য মানুষ,জিন ও শয়তানের মুখোমুখি হয়েছে ।
রাসুল (সাঃ)নফসের সাথে জিহাদকে বড় জিহাদ বলেছেন যুদ্ধক্ষেত্রে জিহাদের তুলনায় ।
হাদীসে আছে রাসুল (সাঃ) যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরত আসার সময় বলেন “আমরা ছোট জিহাদ (যুদ্ধক্ষেত্র)থেকে ফিরে আসছি এবং বড় জিহাদের(নফসের বিরুদ্ধে) দিকে যাচ্ছি ।“(রাদ আল মুখতার)
সকল ঈমানদার মুসলিম,আল্লাহর ওলীগণ উপরোক্ত কুরআনের আয়াত(ইমরানর ১৬৯)এর অন্তর্ভুক্ত।
তারা ঈদ উদজাপন করেন যেমন আমরা করি।এবং পরকালের জীবনে মিলাদুন্নবী উদযাপন করা হয়।অন্যান্য নবীর জন্মদিনও পালন করা হয়।
কুরআনে আছে
“আর সেই সময়টি উল্লেখযোগ্য, যখন মুসা স্বীয় সম্প্রদায়কে বলিলেন,হে আমার সম্প্রদায়, তোমাদের প্রতি আল্লাহর নেয়ামত স্মরণ কর, যখন তিনি তোমাদের মধ্যে পয়গম্বর সৃষ্টি করেছেন, তোমাদেরকে রাজ্যাধিপতি করেছেন এবং তোমাদেরকে এমন জিনিস দিয়েছেন, যা বিশ্বজগতের কাউকে দেননি।“(মায়িদা ২০)
কুরআনে আছে
“আপনি (ও নবী (সাঃ) বলিয়া দিন যে ,আল্লাহর এই দান ও রহমতের প্রতি সকলেরই আনন্দিত হওয়া উচিৎ;তাহা ইহা( অর্থাৎ পার্থিব সম্পদ )হইতে বহুগুণে উওম যাহা তাহারা সঞ্চয় করিতেছে।“(ইউনুস ৫৮)
হাদীসে আছে আবু কাতদা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী করীম (সাঃ) বলেন”যখন তুমি কোন মৃত ব্যক্তির তত্বাবধায়ক হও,তাদেরকে ভালো কাফন পড়িয়ো,কারণ তারা (মৃত বিশ্বাসীরা)
একজন আরেকজনের জায়গায় যায় এবং একজন আরেকজনের সাথে দেখা করে ।“(তিরমিজি ,ইবনে মাজাহ,বায়হাকী)
যখন আপনি কোন সমাজে থাকেন আপনি অবশ্যই আনন্দ উদযাপন করবেন ঈদের সময় ,
মিলাদুন্নবী এবং অন্যান্য আনন্দময় সময়ে। পরকালের জগতটি আমাদের চোখ থেকে লুকায়িত ।ওলীগণ ,ইহসানের শেখ,সালেহীনগণ তাদের জীবনসাথী ও বাচ্চাদের সাথে পরকালের জগতে মিলিত হন এবং পরকালে তাদের আশে পাশে থাকে তাদের মুরীদগণ ও অনুসারীরা ।
কুরআনে আছে
“যারা ঈমানদার এবং যাদের সন্তানরা ঈমানে তাদের অনুগামী, আমি তাদেরকে তাদের পিতৃপুরুষদের সাথে মিলিত করে দেব ,আর (এই জন্য) আমি তাদের আমলসমূহ হইতে বিন্দুমাত্রও হ্রাস করব না।“(সূরা আত তূর ২১)
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ইহকালের জীবন ও পরকালের জীবনের রাজা।
কুরআনে আছে
“আর আমি বিশ্বের লোকদের প্রতি( আমার )অনুগ্রহ বর্ষণ উদ্দশ্য ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে আপনাকে প্রেরণ করি নাই”(সূরা আম্বিয়া ১০৭)
সালাফি মুনাফিকদের দল আলমে মিসালের অস্তিত্ব এবং আলমে বরজখের (পরকালের জীবনের) উপর সহীহ বর্ণনা (যা আলমে মিসালের অংশ)কে অস্বীকার করে। যখন আমরা আল্লাহর কথা বলি তখন তারা মানুষের মত দেখতে আকাশ দেবতার কথা চিন্তা করে।