বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৮

ফাটল ধরতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি আরব সম্পর্ক

ফাটল ধরতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি আরব সম্পর্ক

শীর্ষবিন্দু আন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক: আরব বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সখ্য অনেক দিনের। সৌদি আরবের সামনে কোনো বিপৎসংকেত বাজলেই যুক্তরাষ্ট্র সাঁৎ করে পাশে হাজির। কোনো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগাতে গেলে, অস্ত্রের মজুত বাড়াতে গেলে, সবার আগে যুক্তরাষ্ট্রেরই দ্বারে হাজির হয় সৌদি আরব।

তেমনি সৌদি আরবের অর্থে যুক্তরাষ্ট্রেরও পকেটে স্বাচ্ছদ্য আসে। তবে সম্প্রতি এই দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্কে যেন টান ধরছে। ভাবগতিকে মনে হচ্ছে, সম্পর্কে আস্থার জায়গাটি যেন টলছে। বিশেষ করে, এ মনোভাব সৌদি আরবের।

সম্প্রতি বিবিসি অনলাইনে প্রকাশিত কিম ঘাটাসের এক বিশ্লেষণেও এমন আভাস দেওয়া হয়েছে। ওই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের ওপর রিয়াদের আস্থা হারানোর মূলে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ইরান-নীতি।

গত মাসে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে দেশটির সঙ্গে ছয় বিশ্বশক্তির (জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্য রাষ্ট্র ও জার্মানি) একটি প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন এই সমঝোতা চুক্তিকে মোটেও ভালোভাবে নেয়নি সুন্নি-অধ্যুষিত সৌদি আরব ও তার আরব মিত্রদেশগুলো। ইরানের সঙ্গে ওবামার শান্তি স্থাপনের সিদ্ধান্তে এই দেশগুলো গভীরভাবে উদ্বিগ্ন, ক্ষুব্ধ।

সৌদি আরবের অভিযোগ, আগামী মাসে চুক্তিটি চূড়ান্ত করা হলে শিয়া-অধ্যুষিত ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথ সুগম হবে। চুক্তির আওতায় পাওয়া অর্থসহায়তা অঞ্চলটিতে দুরভিসন্ধিমূলক কাজে লাগাতে পারে তেহরান।

একই সঙ্গে সৌদি আরব বারবার ইঙ্গিত দিয়েছে, তেহরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করলে রিয়াদও ওই পথে হাঁটবে। সৌদি আরবের সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান প্রিন্স তুর্কি বিন ফয়সাল সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ায় এক সম্মেলনে বলেন, ‘ইরানের যা থাকবে, আমাদেরও তা থাকতে হবে।’ এরই মধ্যে খবর বেরিয়েছে, পাকিস্তানের কাছ থেকে পারমাণবিক বোমা কেনার কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সৌদি আরব।

সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের বিরোধ বেশ পুরোনো। বলা যায়, অঞ্চলটিতে এক রাষ্ট্র অন্যকে নিজের সবচেয়ে বড় শত্রু বলে গণ্য করে। সেই প্রেক্ষাপটে তেহরানকে নিয়ে রিয়াদের মাথাব্যথা নতুন কিছু নয়।

তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তেহরানের সঙ্গে ছয় বিশ্বশক্তির চুক্তির বিষয়ে রিয়াদের তীব্র আপত্তি ওয়াশিংটনের কাছে খুব একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। নানা বাধা পেরিয়ে প্রাথমিক চুক্তি হওয়ার পর এক সাক্ষাৎকারে ওবামা বলেন, ইরানকে পারমাণবিক বোমা তৈরি থেকে বিরত রাখা এবং মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে টেকসই স্থিতিশীলতার জন্য চুক্তিটি ছিল- এক জীবনে একটাই সুযোগ। বোঝাই যাচ্ছে, ওবামার এই ইরাননীতি সৌদি আরবের প্রত্যাশিত নীতির ঠিক বিপরীত।

হতোদ্যম না হয়ে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চূড়ান্ত চুক্তি আটকাতে সৌদি আরব নানাভাবে এখনো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এতে ওবামা কান দিচ্ছেন বলে মনে হয় না। তাঁর কথাবার্তায় এমন আভাস মেলে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সরকারি অবকাশযাপন কেন্দ্র ক্যাম্প ডেভিডে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরান নিয়ে সৌদি আরব ও তার আরব মিত্রদের উদ্বেগের প্রসঙ্গটি এলে এক অর্থে তা নাকচই করেন ওবামা।

একই স্থানে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) নেতাদের সঙ্গে সম্মেলন শেষে বক্তব্যে ওবামা বলেন, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মহলের সম্ভাব্য চুক্তিটি উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য হুমকি নয়। ‘অসাধারণ পরিবর্তনের’ এই সময়ে দেশগুলোর সুরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ।

একসঙ্গে কাজ করার মধ্য দিয়ে ইরানের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ও সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক স্থাপন করা উপসাগরীয় দেশগুলোর পক্ষে সম্ভব হবে বলেও আশা করেন ওবামা। এসব কথা বলে জিসিসি নেতাদের একটু সান্ত্বনার কথাও শোনান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। প্রয়োজন হলে সামরিক শক্তি নিয়ে পারস্য উপসাগরীয় মিত্রদের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। ওবামার কৌশল স্পষ্ট। ইরান বা সৌদি জোট—কোনো পক্ষকেই হাতছাড়া করতে চান না তিনি। আবার উদ্দেশ্যও হাসিল করা চাই। যুক্তরাষ্ট্রের এমন অবস্থানে অসন্তুষ্ট সৌদি আরব। রিয়াদ চায় তেহরানের টুঁটি একেবারে শক্ত করে চেপে ধরুক ওয়াশিংটন।

রিয়াদ কার্যত তেহরানের সঙ্গে ছয় বিশ্বশক্তির চুক্তি ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে। সেটা তারা বুঝতেও পারছে। এমন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আর নির্ভর না করে রিয়াদ ভিন্ন পন্থায় তেহরানকে শায়েস্তা করার কৌশল নিয়েছে। বৈরুত, বাগদাদ, দামেস্ক ও সানার ওপর তেহরানের প্রভাব কমাতে তৎপর রয়েছে রিয়াদ।

রিয়াদের এই প্রচেষ্টার একটা জলজ্যান্ত উদাহরণ সম্প্রতি ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের ওপর সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক হামলা। বিশ্লেষকদের চোখে, মূলত ইয়েমেনে তেহরানের সঙ্গে ছায়াযুদ্ধে জড়িয়েছে রিয়াদ।

অতীতে সৌদি আরব কখনো এভাবে হুট করে কোনো যুদ্ধে জড়ায়নি। এটা পরিষ্কার যে, ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গিয়ে সামরিক জোটের নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা পরীক্ষা করছে সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারিয়ে সৌদি আরব এখন সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের নতুন সামরিক শক্তি হতে চায়।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026