সিরাজুল ইসলাম: বাংলাদেশ থেকে অবৈধ পথে ইরানে শ্রমিক আসা বন্ধ করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ এবং ইরান সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার পরও অবস্থার তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি। শক্তিশালী দালালচক্রের সহায়তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতি মাসে অন্তত ৭০ থেকে ৮০ জন বাংলাদেশী ইরানে আসছে। তেহরানে বাংলাদেশ দূতাবাসের একটি সূত্র এমন তথ্যই জানিয়েছেন।
সূত্র মতে তৃতীয় দেশে পাঠানোর জন্যে এসব অবৈধ শ্রমকিকে ইরানে আনে দালালরা। এদের একটা অংশকে তুরস্ক হয়ে গ্রিস কিংবা ইতালিতে পাঠায়। তবে সবাইকে শেষ পর্যন্ত এসব দেশে পাঠাতে পারে না কিংবা পাঠানো হয় না। শতকরা ১৫ থেকে ২০ ভাগ লোক গ্রিস কিংবা ইতালিতে যাওয়ার সময় ইরান ও তুরস্কের সীমান্তে ধরা পড়ে। ইউরোপের দেশে যেতে ব্যর্থ হওয়া এসব লোক উপায়হীন হয়ে ইরানের ভেতরে অবৈধভাবে থাকতে বাধ্য হয়। শুরু হয় তাদের অবৈধ জীবন।
বাংলাদেশ থেকে এসব অবৈধ শ্রমিক আবার পথে পথে দালাল চক্রকে অর্থ দিতে বাধ্য হয়। ক্ষেত্রবিশেষে একই ব্যক্তি কয়েকটি দালালচক্রের হাতবদল হন। বাংলাদেশ থেকে প্রধানত দুবাই এবং ওমান হয়ে ইরানের ভেতরে প্রবেশ করানো হয় বিদেশ যেতে ইচ্ছুক এসব বাংলাদেশী নাগরিককে। এর প্রতিটা দেশে রয়েছে সক্রিয় দালালচক্র।
এরা প্রত্যেক দেশে আলাদা আলাদাভাবে অর্থ বা চাঁদা গ্রহণ করে। টাকা আদায়ের জন্য বিদেশে আসা লোকজনকে মারধর করা হয় এবং উপোস রেখে, খাবার না দিয়ে নানাভাবে কষ্ট দেয়া হয়। বিদেশে আসার সময় একবার টাকা দিতে হয়। পরে আবার দালাল চক্রের হাতে পড়ে জীবনের হুমকির মুখে কয়েকবার টাকা দিতে হয়। বৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার তুলনায় সাকুল্যে সে অর্থের পরিমাণ অনেক বেশি হয়।
অর্থাৎ স্বাভাবিক উপায়ে বৈধ পথে বিদেশ যেতে গেলে যে খরচ হয় তার চেয়ে অবৈধ পথে কয়েকগুণ বেশি অর্থ খরচ হয়। তারপরও থেকে যায় জীবনের ঝুঁকি এবং অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার অনিশ্চয়তা।
সূত্র জানান, গ্রিস ও ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে বিরাট সংখ্যক লোককে প্রতিমাসে বন্দর আব্বাস এলাকা দিয়ে ইরানে ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। এর সত্যতা নিশ্চিত করেছন তেহরানের পার্শ্ববর্তী একটি ছোট্ট শহরে অবৈধভাবে প্লাস্টিক কারখানায় কাজ করা বাংলাদেশী নাগরিক শাহেদ (ছদ্মনাম)। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, যশোর থেকে বৈধভাবে কাগজপত্র করে তিনি ২০১১ সালের দিকে দুবাই এসেছিলেন। সেখানে কিছুদিন কাজ করার পর দালাল চক্রের এক সদস্য তাকে আরও উন্নত আয়ের আশা দেখিয়ে সৌদি আরবে নেয়ার কথা বলে। সে সময় শাহেদের পিতাও সৌদি আরবে থাকতেন।
সৌদি যেতে পারলে সুবিধা হবে এ কথা চিন্তা করে বাপ-ছেলে দুজনই সানন্দে রাজি হন। সৌদি পাঠানোর নাম করে দুবাই থেকেই দালাল চক্র মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়। কিন্তু তারপরের কাহিনী শুধুই নির্মমতায় ভরা।
ইরানে আসার স্মৃতিচারণ করে শাহেদ জানান, দালাল চক্র একদিন দুবাই থেকে রাতের আঁধারে তাদের নিয়ে রওয়ানা দেয়। ১২ ঘণ্টার পথ পায়ে হেঁটে পাহাড়-জঙ্গল ডিঙিয়ে অবশেষে ওমানে পৌঁছান তারা। সেখানে এক বাসায় ১২ দিন থাকার পরে একদিন মাইক্রোবাসে করে বন্দর আব্বাসের দিকে আনে। শাহেদ জানান এ দলে ছিল প্রায় ৪০ জন। ছোট নৌকায় সাগর পেরিয়ে কূলে ওঠার পর সাতদিন কাটাতে হয় জঙ্গলে।
পরে একদিন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এক ভবনে নেয়া হয় শাহেদদের। সেখানে নতুন দালালচক্র তাদের আটকে রাখে প্রায় দেড় মাস। এসময় তাদের খাবার দাবার দেয়া হতো তবে টাকার জন্য দেশের লোকজনকে ফোন করে চাপ দেয়া হতো। শাহেদ জানান, বন্দর আব্বাসে কুমিল্লা ও কুষ্টিয়ার কয়েক দালাল তাদের আটকে রাখে। উপায়হীন হয়ে শাহেদ দালালচক্রের দেশের অ্যাকউন্টে তিন লাখ ৭০ হাজার টাকা দেন।
এরপর বন্দর আব্বাস থেকে তেহরানে পাচার করা হয়। সেখানে পৌঁছানোর পরও কয়েক বাংলাদেশী দালাল তার কাছ থেকে নতুন করে টাকা আদায়ের ফন্দি করে। কিন্তু নানা চেষ্টায় তা থেকে রক্ষা পান শাহেদ। অবশেষে একটি প্লাস্টিকের কারখানায় তার কাজ মেলে। তার ওই এলাকায় অন্তত ৫০ জন বাংলাদেশী অবৈধভাবে কাজ করেন বলেও জানান।
শাহেদ জানান, নানা জটিলতার পর তিনি এখন মোটামুটি ভাল আছেন। কিন্তু সেই দিনগুলোর দুঃসহ স্মৃতি ভুলতে পারেন না। তিনি বলেন, বিদেশে আসা বাবদ তিনি প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন। অথচ এই টাকা দিয়ে দেশেই কত কিছু করা যেত। এভাবে কেউ যেন বিদেশে না আসেন সে পরামর্শও দিয়েছেন শাহেদ।
অবৈধ শ্রমিক আসার এ ঢল ঠেকাতে কি ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে জানতে চাইলে বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা জানান, ইরান সরকারের পক্ষ থেকে যেমন কড়া পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তেমনি বাংলাদেশ সরকারও অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়া লোকজনের বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অবৈধ শ্রমিক আসা ঠেকানোর জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে দূতাবাস কিন্তু খুব একটা সফল হওয়া যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, দালাল চক্রের হাতে যে নির্যাতন সহ্য করতে হয় এবং দফায় দফায় যে পরিমাণ টাকা ব্যয় হয় তা জানা থাকলে কেউ অবৈধ পথে বিদেশে আসার কথা চিন্তা করবে না। এছাড়া, পথে পথে মৃত্যুঝুঁকি তো রয়েছেই। তিনি জানান, এসব অবৈধ বাংলাদেশী শ্রমিকদের জন্য প্রতি মাসে ইরান সরকারের কাছ থেকে ট্রাভেল পারমিট নিয়ে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হয়। ফলে বিদেশের মাটিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকে না।
সূত্র জানান, প্রতি মাসে ৭০-৮০ জন বাংলাদেশী ঢোকে ইরানে আবার প্রায় এ পরিমাণে বাংলাদেশী নাগরিক প্রতিমাসে ইরান থেকে দেশে ফিরে যায়। এ কাজে যত দালাল চক্র জড়িত তার মধ্যে বন্দর আব্বাস এলাকায় রয়েছে সবচেয়ে শক্তিশালী চক্র।
এ সম্পর্কে বাংলাদেশ দূতাবাসের সিনিয়র পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা জানান, বছর দুয়েক আগে ইরানে অবৈধ বাংলাদেশী নাগরিক ধরা পড়লে জাহেদান সীমান্ত দিয়ে পাকিস্তানে পুশব্যাক করা হতো। তাতে ধরা পড়া লোকজন ভয়াবহ নির্যাতন ও কষ্টের শিকার হতো।
কিন্তু জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন বা ন্যাম সম্মেলন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইরান সফর করার সময় এ নিয়ে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়। সেই চুক্তির কারণে পাকিস্তানে পুশব্যাক করা বন্ধ হয়েছে এবং ট্রাভেল পারমিট পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু অবৈধভাবে শ্রমিক আসার ঢল না থামলে যে কোন মুহূর্তে আবার জাহেদান সীমান্ত দিয়ে পাকিন্তানে পুশব্যাক শুরু হতে পারে।