শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬, ০৬:০১

স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্বে গভীর সঙ্কটে জাতীয় পার্টি

স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্বে গভীর সঙ্কটে জাতীয় পার্টি

রাজনীতি ডেস্ক: এরশাদ-রওশন দ্বন্দ্বে গভীর সঙ্কটে পড়েছে জাতীয় পার্টি। দলের নেতৃত্ব নিয়ে চলছে এ সঙ্কট। মন্ত্রিসভায় থাকা না থাকা নিয়েও অস্থিরতা চলছে দলে। দুই ধারার পরস্পরবিরোধী তৎপরতার কারণে জাতীয় পার্টি এখন সঙ্কটে ভুগছে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে ছড়িয়ে পড়ছে বিশৃঙ্খলা। জাতীয় পার্টিতে দলীয় প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আগের মতো আর নিয়ন্ত্রণ নেই; বরং তিনি এখন অনেকটাই কোণঠাসা।

ফলে রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ নিয়ে গভীর সঙ্কটে পড়েছে জাতীয় পার্টি। দলের বেশির ভাগ নেতাকর্মী এখনো এরশাদের পক্ষে এমনটি ধারণা করা হলেও রওশন এরশাদের প্রতি সরকারের আশীর্বাদ থাকায় তার পাল্লাও ভারী বলে মনে করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে জাতীয় পার্টিতে এখন হ-য-ব-র-ল অবস্থা বিরাজ করছে বলে জানিয়েছেন দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা।

তবে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা মনে করেন, পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ ও বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদের মধ্যকার এ দ্বন্দ্বের মূলে রয়েছে বিরোধী দলের নেতার পদ। এরশাদ এখন এই আসনে বসতে চান, আর রওশন কোনো মতেই পদ ছাড়তে রাজি নন। দলের অনেকেই মনে করেন, এরশাদের স্বপ্ন ছিল দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার। কিন্তু সেটা যখন হতে পারেননি, তখন তিনি অন্তত বিরোধী দলের নেতার আসনে বসতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু রাজনৈতিক চোরাবালিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত আটকে যান তিনি। এই পদটিও হাতছাড়া হয়ে চলে গেছে তার সহধর্মিণী রওশন এরশাদের কাছে। জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলাকালে তাকে বসতে হচ্ছে দ্বিতীয় আসনে অর্থাৎ বিরোধী দলের উপনেতার নির্ধারিত আসনে। এটা এরশাদের জন্য মোটেও স্বস্তিকর নয়। তাই তিনি নানাভাবে চেষ্টা-তদবির করেও বিরোধী দলের নেতার পদটি পেতে ব্যর্থ হয়েছেন।

নানা কারণে সরকারের ওপর মহল এরশাদকে মোটেই আস্থায় নিতে বা বিশ্বাস করেন না বলে জানান তারই দলের নেতারা। আর এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করছেন রওশন। পার্টির নেতৃত্ব এখন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। এর ফলে দু’জনের অনুসারী দলের নেতাকর্মীরাও ঘুরপাক খাচ্ছেন।

এ দিকে সরকারের অংশীদার থেকে বেরিয়ে এসে এরশাদ জাতীয় পার্টিকে সংসদে এবং সংসদের বাইরে সত্যিকারের বিরোধী দলেরভূমিকায় নিতে চাইলেও বাদ সেধে আছেন রওশন। তিনি বিরোধী দলে থাকার পাশাপাশি সরকারেও থাকতে চান। মূলত দু’জনের এই পথ চলা নিয়ে জাতীয় পার্টির মধ্যে দুই ধারার সৃষ্টি হয়েছে।

দলে এরশাদ এবং রওশনের দ্বন্দ্বের বিষয়টি এখন প্রকাশ্য। রওশনপন্থী শীর্ষ নেতারা সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত। তারা দল গোছানোর চেয়ে নিজেদের আখের গোছাতেই বেশি ব্যস্ত। অন্য দিকে দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা অধিকাংশই এরশাদপন্থী। এরশাদের কোনো কর্মসূচিতে জাতীয় পার্টির মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা এমপিরা সচরাচর যান না।

দলের এই সঙ্কট আরো পরিষ্কার হয়ে উঠেছে সম্প্রতি সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভা নির্বাচনে। এ নির্বাচনে ভরাডুবির পর আরো হতাশা নেমে এসেছে দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে। দিন দিন পরিস্থিতি এমন দিকে যাচ্ছে যে, দলটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি স্বীকার করে বিরোধী দলের নেতা রওশন সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, জাতীয় পার্টি এখনো টিকে আছে এটিই বড় কথা।

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী জি এম কাদের ফেসবুকে জাতীয় পার্টির কঠোর সমালোচনা করেন। বর্তমানে জাতীয় পার্টির নিজস্ব কোনো রাজনীতি নেই এবং দলকে সরকারের সব ‘অপকর্মের’ দোসর বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জাপা সূত্র জানায়, গত দুই বছরে সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে পারেনি জাতীয় পার্টি। মন্ত্রিসভায় থাকা না থাকা নিয়েও অস্থিরতা চলছে দলের ভেতরে। রওশন প্রথম দিকে মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে আসার প্রস্তুতি থাকলেও এখন তিনি পদত্যাগের বিপক্ষে কারণ মতার অংশীদার জাতীয় পার্টির মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা এখন আর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগে আগ্রহী নন।

দলের একাধিক প্রেসিডিয়াম সদস্য আলাপকালে জানান, জাতীয় পার্টির মূল সঙ্কট চলছে নেতৃত্ব নিয়ে। মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে সঙ্কট ঘনীভূত হয়েছে।

প্রেসিডিয়ামের একটি অংশ কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। তারা মনে করেন, সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে লজ্জাজনক হারের পেছনে বর্তমান মহাসচিবের ‘বিতর্কিত’ কর্মকাণ্ডই দায়ী। বিপুল অর্থ খরচ ও পরিশ্রমের পরও প্রত্যাশিত ফল পাননি জাতীয় পার্টির মেয়র পদপ্রার্থীরা। তিন সিটিতে মাত্র ১৩ হাজার ৬০০ ভোট পেয়েছেন মেয়রপ্রার্থীরা। দল সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদেরও একই হাল ছিল। জাপার ৮১ জন কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে জয় পেয়েছেন মাত্র একজন। দলের মহাসচিব প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করায় জাপার এই পরিণতি বলে চেয়ারম্যানের কাছে কয়েকজন নালিশ করেছেন। অথচ এই সিটি নির্বাচন ঘিরে দলের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

বর্তমান মহাসচিবের অধীনে সারা দেশে কাউন্সিল অধিবেশনের মাধ্যমে কমিটি গঠনের বিষয়টিও ঝুলে গেছে। গত ডিসেম্বরে কাউন্সিল শেষ করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তা শুরুই হয়নি। কাউন্সিল হলে নতুন নেতৃত্ব আসতে পারে, এই ভয়ে নীরব আছেন দলের সিনিয়র নেতারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন যুগ্ম মহাসচিব জানান, কাউন্সিল করতে নির্বাচন কমিশন থেকে চাপ আছে। অনেকে ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করছেন যাতে কাউন্সিল হয়। কিন্তু যারা দলের ভালো চায় না তারাই কাউন্সিল আটকে রেখেছে।

জানা গেছে, জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক জেলা ৭৬টি। এর মধ্যে মাত্র রাজশাহীতে কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি করা হয়েছে। বাকি ৭৫টি জেলায় কোনো কমিটি হয়নি। এসব জেলার মধ্যে অন্তত ২৫টি জেলা আহ্বায়ক কমিটি এবং বাকিগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়েই চলছে। গত বছরই সাংগঠনিক জেলার ৩৩টিতে সম্মেলনের প্রস্তুতি কমিটি করার জন্য চিঠি দেয়া হয়ছিল।

কিন্তু এসব জেলার কেউই তখন সেই চিঠির জবাব দেননি। ফলে তারা সম্মেলন করবেন কি না তা-ও জানতে পারেনি কেন্দ্রীয় কমিটি। এ অবস্থায় পরের পদপে কী হবে তা-ও নির্ধারণ করতে পারেননি দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা। এমন কিছু সাংগঠনিক জেলা আছে, যেগুলোতে এক যুগের বেশি সময়ে কোনো কাউন্সিল হয়নি। এ রকম জেলার মধ্যে রয়েছে বরিশাল মহানগরে ১১ বছর ও বরিশাল জেলায় ১৪ বছর কাউন্সিল হয়নি। অপর দিকে খুলনায় ৭ বছর কাউন্সিল হয়নি।

তবে এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব বলেন, আমাদের কাউন্সিল হচ্ছে না এটা ঠিক নয়। ৭৬টি সাংগঠনিক জেলায় ইতোমধ্যে ১৮টিতে আমরা কাউন্সিল করেছি। রমজানের আগে বেশ কয়েকটি জেলায় কাউন্সিল করব। হরতাল-অবরোধের কারণে কাউন্সিল আটকে ছিল। জাপার মন্ত্রীদের পদত্যাগ সম্পর্কে তিনি বলেন, চেয়ারম্যান প্রেসিডিয়ামের সাথে পরামর্শ করে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পদত্যাগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026