খলিলুর রহমান: সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মান দেয়া হয়েছিল ১৯৯৮ সালের ২০ ডিসেম্বর। কিন্তু বাংলাদেশ বিমানের একটি অসধু চক্রের কারণে সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এখনো সরাসরি ফ্লাইট চালু হওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে লন্ডন থেকে সিলেট আসা প্রবাসী ও পর্যটকরা নানাভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়- এমএজি ওসমানী বিমাবন্দর ‘আন্তর্জাতিক’ তকমা পাওয়ার পর সিলেট-দুবাই এবং সিলেট-লন্ডন রুটে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হয়। কিন্তু ওসমানীতে রিফুয়েলিং স্টেশন না থাকায় কিছুদিন পরই বন্ধ হয়ে যায় সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। এতে করে বিপাকে পড়তে হয় বৃহত্তর সিলেটের লাখ লাখ প্রবাসীদেরকে। এছাড়া বাধাগ্রস্ত হয় এতদ্ব অঞ্চলের রপ্তানি বাণিজ্যও।
এ
মতাবস্থায় ওসমানী বিমাবন্দর থেকে সরাসরি ফ্লাইট চালুর দাবিতে সিলেট জুড়ে দাঁনা বাঁধে আন্দোলনের। এমন প্রেক্ষিতে ২০১০ সালে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত উদ্যোগ নেন ওসমানী বিমাবন্দরে রিফুয়েলিং স্টেশন নির্মাণের। এই রিফুয়েলিং স্টেশন নির্মাণ প্রকল্পের দায়িত্ব পায় পদ্মা অয়েল কোম্পানি। প্রায় ৫১ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে বিমানের কনস্ট্রাকশন অ্যাভিয়েশন রিফুয়েলিং ফ্যাসিলিটিজ (স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে উড়োজাহাজে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা) নামে ২০১২ সালে শুরু হয় রিফুয়েলিং স্টেশন নির্মাণের কাজ।
এই রিফুয়েলিং স্টেশন নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০১৩ সালের জুন মাস পর্যন্ত। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি এই প্রকল্পের কাজ। ফলে নির্ধারিত বরাদ্দের চেয়ে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩ কোটি ১৫ লাখ ৫০ হাজারে। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় এই ব্যয় বাড়ার পরিমাণ প্রায় ২ কোটি টাকা। গত বছরের মার্চ মাসেই শেষ হয় এ প্রকল্পের কাজ।
কিন্তু যে উদ্দেশ্যে এতো বিশাল অঙ্কের টাকা ব্যয় করে রিফুয়েলিং স্টেশনটি নির্মাণ করা হয়েছিল, তা কোনো অংশেই পূর্ণ হয়নি। নির্মাণের পর ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও উদ্বোধন হয়নি স্টেশনটির। বরং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি অসাধু চক্র বিমানের ক্ষতি হবে বুঝাইয়া সিলেটের প্রবাসীদের ট্রানজিটে নিম্নমানের হোটেলে রেখে নিজেরা অর্থনৈতিকভাবে লাভমান হচ্ছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ-আটাব, সিলেট জোনের চেয়ারম্যান আব্দুল জব্বার জলিল বলেন, ‘লন্ডন থেকে সরাসরি সিলেটে ফ্লাইট আছে। কিন্তু সিলেট থেকে সরাসারি লন্ডনে কোন ফ্লাইট নেই। এতে সিলেটের যাত্রীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ফ্লাইট চালু না হওয়ার কারণে সিলেট অঞ্চলের প্রবাসীরা ঢাকা হয়ে বর্হিবিশ্বে গমন করেন। যার ফলে যাত্রীরা অপরিসীম দূর্ভোগের শিকার হন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অসাধু চক্রটি কৌশলে বর্হিবিশ্বে গমণকারী যাত্রীদেরকে আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবার মান লঙ্ঘন করে উত্তরায় নিম্নমানের বাড়িতে রাখেন। যার জন্য প্রত্যেক যাত্রী ৮ ঘন্টায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে ২ হাজার ২শ’ টাকা পরিশোধ করতে হয়।
এছাড়াও ঢাকা হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে যাত্রীদের ঢুকার আগে নিরাপত্তার অজুয়াত দেখিয়ে তাদের সঙ্গে যাওয়া আত্মীয়-স্বজনদের বাহিরে বের করে দেয়া হয়। শুধুমাত্র যাত্রী একা বিমানবন্দরে ঢুকানো হয়। বিমানবন্দরে ঢুকার সময় যাত্রীর সঙ্গে থাকা মালামাল ওজন করে দেখা হয়। নিময় অনুসর করে যাত্রীরা বাড়ি থেকে মালামাল নিলেও নির্ধারিত পরিমানের চেয়ে বেশি হয়ে গেছে জানান অসাধু কর্মকর্তারা।
এতে করে যাত্রীদের তাদের মালামাল নিয়ে যেতে পারেনা। যাত্রীদের মালামাল বিমানবন্দরে রেখে যেতে বাধ্য হন। এছাড়াও যাত্রীদের মালামালগুলো তাদের স্বজনদের কাছেও পৌঁছানো হয় না। একপর্যায়ে ওইসব মালামাল বিমানবন্দরে থাকা অসাধু চক্রটি ভাগভাটোয়ারা করে নেয় বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, সিলেট অঞ্চল থেকে প্রতি মাসে ৬ হাজার ৪শ’জন যাত্রী বর্হিবিশ্বে গমন করেন। যাত্রী যাওয়া-আসা বাবত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স প্রতি মাসে হোটেল ভাড়া কয়েক কোটি টাকা খরচ বহন করতে হয়। কিন্তু সিলেট থেকে সরাসরি ফ্লাইট হলে প্রতিমাসে বিমান বাংলাদেশের কয়েক কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, কিছু কর্মকর্তার নির্দয় আচরণে প্রবাসী যাত্রীরা দিশেহারা। অভিযোগ উঠেছে, যারা যাত্রীদের সেবা দেয়ার দায়িত্ব নিয়ে বিমানবন্দরে নিয়োজিত আছেন, তাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশই হয়রানি করছেন যাত্রীদের।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, যেখানে বিদেশের শ্রমবাজারে সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে হাড়ভাঙা পরিশ্রমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে আসছেন প্রবাসীরা, সেখানে ইমিগ্রেশনের হাতে তাদের নিয়মিত হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। হয়রানির মাত্রা কখনো কখনো এতই বেশি হয় যে অনেক প্রবাসী শ্রমিক কান্নায় ভেঙে পড়েন। বিদেশ থেকে আসা অনেক যাত্রী বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে ইমিগ্রেশনসহ বিভিন্ন শাখায় সীমাহীন হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
ইমিগ্রেশন বিভাগে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা লন্ডন প্রবাসীদের সঙ্গে সীমাহীন দুর্ব্যবহার করেন। তুই-তোকারি ভাষা, পেটে কলমের গুঁতো দেয়া নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। অপমানজনক এসব ঘটনায় ক্ষুব্ধ অনেক যাত্রী দুঃখে-ক্ষোভে কেঁদে ফেলেন। যাদের কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে, সেই প্রবাসীদের সঙ্গে কাস্টম বিভাগের আচরণ আরও রূঢ়, আরও ন্যক্কারজনক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক লন্ডন প্রবাসী অভিযোগ করেন- ইমিগ্রেশন চেকিংয়ের সময় কাউন্টারে বসে থাকা পুলিশ সদস্যরা খুব ধীরে-সুস্থে কাজ করেন। যাত্রীদের সঙ্গে তাদের কথা বলার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয়, যেন সবাই অপরাধী। তাদের দেখলে মনে হয় তারা সবসময় ক্লান্ত আর যাত্রীদের উপর অনেক বিরক্ত।
সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক হাফিজ আহমদ বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমাদের কিছু করা নেই। এটা সম্পূর্ণ বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স দেখশুনা করে।’