সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬, ০২:৪০

সূর্যের আলোকে দূরে রেখেই বাঁচতে হবে ওদের

সূর্যের আলোকে দূরে রেখেই বাঁচতে হবে ওদের

আকাশ ইসলাম: একটু আপনার চোখটা বন্ধ করে দেখুন তো? দেখবেন নিজেকে কতখানি অসহায় লাগে। আদতে এই পৃথিবীর আলো, প্রকৃতি আর সৌন্দর্য থেকে কোন মানুষই বঞ্চিত থাকতে চায় না। জন্মের পর দেড় বছরের মাথায় ‘জেরোডার্মা পিগমেন্টোসাম’ রোগে আক্রান্ত হয়ে দিনের আলো দেখার সুযোগ হারিয়ে ফেলেছে ফুটফুটে দুই শিশু—মনীমউজ্জামান ও শ্রাবণী জামান।

ত দিন বেঁচে থাকবে, তত দিনই এই ভাই-বোনকে সূর্যের আলো থেকে দূরে রাখতে হবে। এর চেয়ে নির্মম আর নিষ্ঠুর পৃথিবীতে কী হতে পারে? রাজধানীর উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরে এভাবে নির্মম বাস্তবতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে তারেকউজ্জামান খান ও লতিফা আক্তার মনি দম্পতির এই দু’সন্তান। কারণ একটাই সূর্যের আলো তারা সহ্য করতে পারে না। সকালের স্নিগ্ধ আলোও তাদের জন্য ক্ষতিকর।

এ কারণেই ঘরের চার দেয়ালের অন্ধকারেই আবদ্ধ তাদের জীবন। এছাড়া উপায়ও নেই। একটি ঘরে এসি লাগিয়ে আলো ঢোকার পথ বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। বাড়ির অন্য ঘরগুলোতে দরজা, জানালা দিয়ে আলো ঢুকছে। এতেই ক্ষতি হচ্ছে ওদের। সন্তানের কষ্ট সহ্য করতে পারেন না বাবা-মা। কিন্তু তাদের করার বা কী আছে?

বাবা বলেন, “ওদের একটু ভালো রাখার জন্য পুরো বাসায় সূর্যের আলো যাতে ঢুকতে না পারে সে ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কিন্তু ভাড়া বাড়িতে এবং আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে তা করা সম্ভব হচ্ছে না। চোখের সামনে ছেলে-মেয়ে দুটো শুধুই কষ্ট পাচ্ছে।” তাদের বড় মেয়ে শ্রাবণীর বয়স ১১ বছর। আর ছেলে মনীমের বয়সও ৭ পেরিয়ে আট হতে চললো। ওরা দুজনই জন্মের দেড় বছরের মাথায় আক্রান্ত হয় ‘জেরোডার্মা পিগমেন্টোসাম’ নামক এক বিরল জটিল রোগে। বাবা-মা সন্তানের এমন অবস্থায় সঙ্গে সঙ্গে দেশি-বিদেশের বিভিন্ন স্কিন ও চক্ষু বিশেষজ্ঞদের সরণাপন্ন হন।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এই রোগের একমাত্র ক্ষতিকারক দিক হলো- সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মির প্রভাব। ওরা যত দিন বেঁচে থাকবে, তত দিনই ওদের সূর্যের আলো থেকে দূরে রাখতে হবে। সরেজমিনে তারেকউজ্জামানের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল-দরজা জানালা লাগানো চারপাশে ভারী পর্দা টানিয়ে রাখা ঘরের একটি রুমে তারা দু’ভাই-বোন শ্রাবণী ও মনীম সবে ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলাচ্ছে কিন্তু কিছুতেই আমার দিকে তাকাতে পারছে না।দীর্ঘ সময় পর যখন তারা তাকানোর চেষ্টা করল তখন দেখা গেল, তারা আর দশজন শিশুর মতো নয়। এসময় তাদের চোখগুলো অস্বাভাবিক লাল হয়েছিলো। দেখলে যে কেউ হয়তো ভাবতে পারেন তাদের হয়তো চোখ নিয়েছে।

কিন্তু বিষয়টি মোটেও তা নয়, তারা আসলে বিরল রোগ জেরোডার্মা পিগমেন্টোসাম-এ আক্রান্ত। চিকিৎসকদের পরামর্শক্রমে তারা বাসার অন্ধকার রুমেও সানগ্লাস পরে আছে। চোখের যন্ত্রণায় মুখ তুলে বেশিক্ষণ কথা বলতে পারে না। মাথা নিচু করে খুব আস্তে করে কথা বলে। দু’জনেরই সারা শরীরে কালো ও সাদা ছোপ ছোপ দাগ। তাদের শরীরে অসংখ্য ছোট ছোট গোটা বা মেজ হয়েছে।

এছাড়াও সম্প্রতি তাদের চোখে ধরা পড়েছে মরণব্যাধি ক্যান্সারের জার্ম। “ছয় ঘণ্টা পর পর তাদের চোখে কৃত্রিমভাবে পানি(রিফ্রেস টিআর) ড্রপ ব্যবহার করতে হয়। যখন চোখে আলাদা পর্দা পড়ে যায়, তখন অস্ত্রোপচার করতে হয়। দুবার ভারতে নিয়ে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। ছয় মাস আগে ফলোআপে আবার ভারতে যাওয়ার কথা ছিল।কিন্তু আর্থিক অনটনের কারণে তা আর হয়ে উঠেনি বলে দীর্ঘ শ্বাস ফেলেন তাদের বাবা-মা।

চোখের পানি মুছতে মুছতে তাদের মা জানান, দীর্ঘ চাকরি জীবনে আমাদের যা সঞ্চয় ছিলো তা এই দু’সন্তানের জন্যই ব্যয় করেছি। তাদের প্রতিবার তাদের নিয়ে ভারত গেলে আমাদের প্রায় ১০ থেকে ১২লাখ টাকা খরচ হয়। এতো বিশাল অঙ্কের টাকা ব্যয় করার মতো সামর্থ এখন আর আমাদের নেই বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন শিশু দুটির মা।

তাদের বাবা সাবেক এনজিও কর্মকর্তা জানান, “রোগটি ধরা পড়ার পর থেকে একদিনও নেই যে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হয়নি বা চোখের ড্রপ ছাড়া চলেছে। ভারতে গেলে দুই ছেলেমেয়ের পাশাপাশি আমাদেরও যেতে হয়। ওদের আলো থেকে বাঁচিয়ে ভারত নিয়ে যাওয়া, সেখানে থাকা, অস্ত্রোপচার করার জন্য এতো বিপুল অঙ্কের টাকা খরচ করার মতো অবস্থা এখন আর আমাদের নেই।”

মনীম এর বয়স কম। ও সারা দিন রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি দিয়ে খেলে। শ্রাবণীর কোনো বন্ধু নেই। বাইরে যেতে পারে না। ছোট ভাইয়ের সঙ্গে খেলায় মন বসে না। দুজনের দিন কাটে অনেকটা একাকিত্বের মধ্যে। এবাবে আর কত সময় কাটতে পারে। বাহিরে যাবার জন্য প্রাণপন যুদ্ধ করে। বায়না করে একটু বাহিরে নিয়ে যাবার জন্য। বাবা, মা বাড়ি থাকলেও সূর্যের আলোর কারণে দিনের বেলায় তাদের বাইরে নিয়ে যাওয়া যায় না। সন্ধ্যার দিকে যখন বাইরে সূর্যের আলো থাকে না, তখনই বাবার মোটরবাইকে মাঝে মধ্যে ঘুরতে বের হয় দুই ভাইবোন। বড় হয়ে কী হবে—জানতে চাইলে মনীম জানাল সে চিকিৎসক হতে চায়। কেন চিকিৎসক হতে চায়—জানতে চাইলে বলে, আমার যে লাগবে।

তার ধারণা, সে চিকিৎসক হলে নিজের ও বোনের চিকিৎসা নিজেই করতে পারবে। শ্রাবণীকেও একই প্রশ্ন করা হলে ও চুপ করে থাকে। হয়তো সে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু বলতে সাহস পাচ্ছে না। তার শরীর প্রায়ই হুট করে খারাপ হয়ে যায়। তখন দেয়ালে মাথা ঠুকে বসে থাকে। মাঝে মধ্যে চোখ ঝাপসা হয়ে যেখানে-সেখানে পড়েও যায়।

অশ্রু সিক্ত চোখে তারেক জানান, তারা খুব মেধাবী কিন্তু তাদের এমন রোগের কারণ কোনো স্কুলই তাদের ভর্তি নিতে চায় না। অবশেষে বহু অনুরোধে শুধুমাত্র পরীক্ষায় অংশ নেয়া শর্তে তাদের বাসার পাশের একটি স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে।পরীক্ষার সময় শুধু হাতে-পায়ে গ্লাফস, সানগ্লাস ও সানব্লক ক্রিম ব্যবহার করে স্কুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে তাদের স্কুলে যাওয়ার প্রতি প্রবল আগ্রহ আছে। তিনি আরো জানান, এ পর্যন্ত তিনবার তাদের অপরেশন করা হয়েছে।

রাজধানীর ইসলামীয় চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শ্রাবণীকে পুনরায় চোখে অপরেশন করতে বলছেন চিকিৎসকরা।গত বছর অপারেশনের পর শ্রবণীর চোখে ক্যান্সার ধরা পড়েছে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অপরেশন করা প্রয়োজন। ফুটফুটে এ দুই শিশুর চিকিৎসার জন্য দ্রুত ভারতের চেন্নাই নিতে বলেছেন চিকিৎসকরা। চেন্নাইয়ের শঙ্কর নেত্রনালয়ে এর আগেও দু’বার তাদের নেওয়া হয়েছে। এখন সেখানে নিতে মোট ১০-১২ লাখ টাকা প্রয়োজন। অপরেশনের পরবর্তীতে দিতে হয় থেরাপি। সেটা অত্যন্ত ব্যয় সাধ্য। বাংলাদেশে রোগটির শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা করছেন ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজের চর্মরোগ বিভাগের প্রধান ডাঃ মো. জামাল উদ্দিন।

তিনি বলেন, এই রোগে যারা আক্রান্ত হয় সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি তাদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। শরীর ড্রাই হয়ে যায়। শরীরে কালো কালো দাগ পড়ে। চোখে সমস্যা দেখা দেয়। শ্রবণশক্তি কমে যায়। আস্তে আস্তে তাদের চোখ ও চামড়ায় ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ে। এই রোগের সুচিকিৎসা কী এবং তা কেমন ব্যয় সাধ্য জানতে চাইলে চর্মরোগ ও লেজার বিশেষজ্ঞ ডাঃ জামাল উদ্দিন বলেন, এই রোগের প্রধান চিকিৎসা হলো সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মির প্রভাবমুক্ত আবাসন ব্যবস্থা। উন্নত দেশে এ রোগীদের জন্য বিশেষ আবাসন ব্যবস্থা, আল্ট্রাভায়লেট প্রট্রেকটিভ সিট, লাইট, ক্যাপসের ব্যবস্থা করা হয়। যাতে তারা ভালো থাকে।

কিন্তু আমাদের দেশে এ রোগে আক্রান্তদের জন্য এমন কোনো ব্যবস্থা নেই। কারণ রোগটি এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে বিরল। গত বছর অপারেশনের পর শ্রাবণী ও মনীমের চোখে ক্যান্সার ধরা পড়ে। তাই যত দ্রুত সম্ভব তাদের অপরারেশন করতে হবে। ফুটফুটে এ দুই শিশুর চিকিৎসার জন্য ভারতের চেন্নাইয়ের শঙ্কর নেত্রনালয়ে নেয়ার পরামর্শও দেন । সেখানে নিতে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা প্রয়োজন। এত অল্প সময়ের মধ্যে বিশাল অঙ্কের এই টাকা জোগাড় করা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

যদি কোন সহৃদয় বিবেকবান মানুষ বা কোন প্রতিষ্ঠান এই দুই শিশুর জন্য এগিয়ে আসতে পারেন তাহলে হয়ত অনেকটা দিনই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে পারবে। সহায়তা পাঠাতে পারেন তারেকউজ্জামান খানের ডাচ-বাংলা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর-১৪৮১০৩৩৭৫২০ অথবা বিকাশ নম্বরে ০১৭১২২৬৩৮৯৬ (ব্যক্তিগত)।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026