শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩২

স্ত্রীর জন্য একাই কুয়ো খুঁড়ে ফেললেন

স্ত্রীর জন্য একাই কুয়ো খুঁড়ে ফেললেন

আন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক: কুয়ো থেকে পানি আনতে গিয়েছিলেন সংগীতা। কিন্তু দলিত বলে উচ্চবর্ণের মানুষ অপমান করল তাঁকে। পানি না নিয়ে ঘরে ফিরতে হলো। স্ত্রীর এই অপমান সইতে পারলেন না বাপুরাও তাজেঁ। বাড়ির উঠানে একাই কুয়ো খুঁড়তে শুরু করলেন। টানা ৪০ দিন খুঁড়ে পানিতে ভরিয়ে দিলেন সেই কুয়ো। ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের নাগপুরের ওয়াশিম জেলার কলম্বেশ্বর গ্রামে।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মার্চের ঘটনা। কলম্বেশ্বর গ্রামের দিনমজুর দলিত বাপুরাও তাজেঁর স্ত্রী সংগীতা উচ্চবর্ণের এক ব্যক্তির কুয়ো থেকে পানি আনতে গিয়েছিলেন। সেদিন ওই ব্যক্তি নিম্নশ্রেণির বলে বাপুরাওয়ের স্ত্রীকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেদিন আর খাওয়ার পানি আনা হয়নি তাঁদের। বাড়িতে ফিরে সংগীতা বিষয়টি বাপুরাওকে জানান। এ অপমান মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি। রাগে-ক্ষোভে সেদিন হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিলেন।

এরপরই মাথায় জেদ চেপে যায় বাপুরাওয়ের। পানির জন্য আর ভিক্ষা নয়, নয় অপমান। নিজের কাঁধেই নিতে হবে নিজেদের নির্ভরতার চাবি। পরদিন ঘুম থেকে উঠে জমানো টাকা নিয়ে মালেগাঁও শহরে গিয়ে কুয়ো খোঁড়ার জন্য যন্ত্রপাতি কিনে আনেন। এরপর খোঁড়া শুরু করেন কুয়ো। এ কাজে কেউই তাঁকে সহযোগিতা করেননি। পরিবারের সদস্যরাও এগিয়ে আসেননি। তাঁর এই কাণ্ডে অনেকেই ক্রূর হাসি হেসেছিলেন। পাহাড়ি এই তল্লাটে কোনো জায়গায় দীর্ঘদিন পানির দেখা মেলেনি। পানির অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে গ্রামের তিনটি কুয়ো। অচল হয়েছে একটি নলকূপও।

কিন্তু এসবের তোয়াক্কা না করে কাজ চালিয়ে যান বাপুরাও। স্ত্রীর জন্য শুধু কুয়ো খুঁড়লে তো আর পেটে দানাপানি পড়বে না। তাই দিনমজুরের কাজে যাওয়ার আগে চার ঘণ্টা ও কাজ থেকে ফিরে দুই ঘণ্টা কুয়ো খোঁড়ার কাজ করেছেন তিনি। দিনে ১৪ ঘণ্টা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তিনি। এভাবে চার-পাঁচজন মানুষের কাজ একাই করে ৪০ দিন পর মাটির ১৫ ফুট নিচে পানির খোঁজ পান তিনি। স্ত্রীর জন্য খুঁড়ে ফেলেছেন ছয় ফুট চওড়া কুয়ো। সামনের দিনে তিনি কুয়োটির গভীরতা আরও পাঁচ ফুট ও চওড়া আরও আট ফুট বাড়াতে চান। এখন শুধু স্ত্রী নন, ওই, অঞ্চলের সবাই বাপুরাওয়ের খোঁড়া কুয়ো থেকে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করে নিয়ে যান।

বাপুরাও তাজেঁ বলেন, ‘আমি ওই কুয়ো মালিকের নাম জানতে চাই না। দরিদ্র ও দলিত বলেই তিনি আমার স্ত্রীকে অপমান করেছেন। সেদিন কেঁদেছিলাম আমি। সেদিনের অনুভূতি কী হয়েছিল, তা বোঝাতে পারব না। এরপরই ভাবি, আর কোনো দিন এই গ্রামের কাউকে পানি ভিক্ষা করতে দেব না। এ কারণেই আমি কুয়ো খোঁড়ার চেষ্টা শুরু করি।’

এই গ্রামে যেহেতু পানি নেই, এ কারণে কুয়ো খোঁড়ার আগে আমি অনেক প্রার্থনা করেছি। এখন খুব ভালো লাগছে যে আমার চেষ্টা সফল হয়েছে,’ বলছিলেন দলিত হয়েও ডিগ্রি ক্লাস পর্যন্ত পড়াশোনা করা বাপুরাও তাজেঁ।

সংগীতা বলেন, ‘ইশ্, কুয়ো খোঁড়ার সময় তখন কেন যে তাঁকে ভেংচি কেটেছিলাম, এখন আফসোস হচ্ছে।’

জয়শ্রী নামে বাপুরাওয়ের এক প্রতিবেশী বলেন, ‘বাপুরাওকে ধন্যবাদ। এখন আমরা নিয়মিত পানি নিতে পারি। আগে এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে অন্য গ্রাম থেকে পানি আনতে হতো। অনেক সময় অপদস্থ হতে হতো।’

এ ঘটনার পর বাপুরাও তাজেঁর নাম গ্রাম ছাড়িয়ে চলে গেছে শহুরে মানুষের কাছে। মারাঠি একটি টেলিভিশন চ্যানেল তাঁর সাক্ষাৎকার সম্প্রচার করেছে। শহরের তহসিলদার খুশি হয়ে উপহারও দিয়েছেন তাঁকে। শুধু তা-ই নয়, বলিউড অভিনেতা নানা পাটেকর ফোনে তাঁর সঙ্গে আলাপ করেছেন। শিগগির দেখা করার কথাও বলেছেন তিনি। একই জেলার এক সমাজকর্মী তাঁকে পাঁচ হাজার রুপি উপহার দিয়েছেন।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪৫৬
৭৮৯১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026