মোহাম্মদ মাকছুদ উল্লাহ: মহান আল্লাহ যদি ক্ষমা না করেন, তাহলে কারো পক্ষেই মুক্তি লাভ করা সম্ভব হবে না। কারণ, কিয়ামতের দিন পার্থিব জীবনের চুলচেরা হিসাবের পরই স্থায়ী পরিণতি জান্নাত বা জাহান্নাম নির্ধারিত হবে।
এ
রশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহতায়ালা প্রত্যেককেই তার কৃতকমের্র প্রতিদান দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।’ (সূরা ইব্রাহিম : ৫১) পৃথিবীতে আমরা জীবনের প্রয়োজনে প্রতিমুহূর্তে অযাচিতভাবে বাধ্য হয়ে মহান আল্লাহর অগণিত নেয়ামত ভোগ করে চলেছি। একইভাবে অজ্ঞাতে বহু পাপাচারও করে চলেছি। আল্লাহর অপার অনুগ্রহের বিনিময় পরিশোধ করে এবং পাপরাশির বদলা মিটিয়ে কারো পক্ষেই মুক্তির সোপানে আরোহন করা সম্ভব নয়।
শুধু তারাই মুক্তিপ্রাপ্তদের কাতারে শামিল হবে, যাদের মহান আল্লাহ নিজ গুণে ক্ষমা করে দেবেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : তোমাদের মধ্য হতে কেউই তার আমলের বিনিময়ে জান্নাতে যেতে পারবে না।
সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনিও না? রাসূলুল্লাহ (সা.) উত্তরে বললেন, মহান আল্লাহ যদি স্বীয় রহমত ও অনুগ্রহ দ্বারা আমাকে বেষ্টন করে না নেন, তাহলে আমিও না। এ সময়ে আল্লাহর রাসূল নিজের মাথায় হাত রাখেন। (মুসনাদে আহমাদ : ৭৪৭৯)
বস্তুত মহান আল্লাহর ক্ষমাই মুক্তির আসল সম্বল। হজরত সাফওয়ান ইবনে মুহরিয আল-মাযিনী থেকে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, একদিন আমি আবদুল্লাহ ইবনে উমারের (রা.) সঙ্গে তাঁর হাত ধরে চলছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞাসা করল, আপনি কিয়ামতের দিন মুমিন বান্দার সঙ্গে মহান আল্লাহর আলাপচারিতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে কী বলতে শুনেছেন?
তখন উত্তরে তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি : কিয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা মুমিন বান্দাকে নিজের কাছে নিয়ে নেবেন। অতঃপর তার ওপর স্বীয় রহমতের আবরণ দিয়ে তাকে ঢেকে দেবেন। তারপর তিনি তাকে বলবেন, অমুক পাপের কথা কি তুমি জানো? সে বলবে হ্যাঁ, হে আমার রব। এভাবে আল্লাহতায়ালা তার সমস্ত পাপের স্বীকৃতি তার কাছ থেকে আদায় করে নেবেন। আর সে মনে করবে, তার ধ্বংস অনিবার্য। তখন আল্লাহতায়ালা বলবেন, পৃথিবীতে আমি তোমার পাপ গোপন করে রেখেছিলাম আর আজ আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। তারপর তার সওয়াবের আমলনামা তাকে দিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু কাফির ও মুনাফিকদের সম্পর্কে সাক্ষীরা বলবে, এরাই তো তাদের প্রতিপালক সম্পর্কে মিথ্যা বলেছিল।
সাবধান! জালিমদের ওপর আল্লাহর লানাত। (সহিহ আল-বোখারি : ২৩৭৭) ক্ষমা ছাড়া যেহেতু বাদার মুক্তির অন্য কোনো উপায় নাই, তাই মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বারবার বান্দাকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে আহ্বান করেছেন। যেমন এরশাদ হয়েছে, ‘আর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, সীমাহীন দয়ালু।’ (সূরা আন-নিসা : ১০৬ ) আরো এরশাদ হয়েছে, ‘আর যে পাপাচার করে বা নিজের ওপর জুলুম করে বসে অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে অবশ্যই আল্লাহকে ক্ষমাশীল ও দয়ালু হিসেবে পাবে। (সূরা আন-নিসা : ১১০)
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ক্ষমা করতেই ভালোবাসেন। একবার রাসূলুল্লাহ (সা.) হজরত আয়েশা (রা.)-কে দোয়া শিক্ষা দিতে গিয়ে বললেন: তুমি বলবে, আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্না’, অর্থাৎ হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমা করতে ভালোবাস, অতএব আমাদের ক্ষমা করে দাও। মহান আল্লাহ ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; কিন্তু বান্দার ক্ষমালাভের যোগ্যতা তো থাকতে হবে। আর এ কথা সত্য যে বান্দা নিজের যোগ্যতায় আল্লাহর দরবারে কোনো কিছুরই দাবিদার হতে পারে না।
তাই একমাত্র বিশেষ সুযোগে ক্ষমা প্রার্থনা ছাড়া অন্য কোনো উপায়ই নেই। আর সে বিশেষ সুযোগটা হলো পবিত্র মাহে রমজান। বিশেষ করে মাহে রমজানের দ্বিতীয় ১০ দিন। এ ১০ দিনে পরম করুণাময় আল্লাহ বান্দার সীমাহীন গুনাহ ক্ষমা করেন বলেই রাসূলে কারিম (সা.) এ ১০ দিনের নাম দিয়েছেন মাগফিরাতের দশক।
তিনি (সা.) বলেছেন: এটি এমন একটি মাস, যার প্রথম দশক রহমতের আর দ্বিতীয় দশক মাগফিরাতের এবং তৃতীয় দশক জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য। (সহিহ ইবনে খুযাইমা, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ১৯১, হাদিস : ১৮৮৭) আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সকলের জানা-অজানা সব গুনাহ ক্ষমা করে দিন! আমিন।