অর্ণব সান্যাল: পেটানো শরীর। পরনে লুঙ্গি আর শার্ট। নাম তাঁর আজিজ পাটোয়ারি। লালমনিরহাট থেকে তিনি ঢাকায় এসেছেন ১২ দিন হয়েছে। রিকশা চালাচ্ছেন এই কদিন। জানালেন, আরও সাত–আট দিন চালাবেন। তারপরই বাড়ির পথ ধরবেন। ঈদে ঢাকায় থাকার কোনো সম্ভাবনা আছে কি না জানতে চাইলে বলেন, ‘লাখ টাকা দিলেও থাকুম না।’
প্রতিবছরই রাজধানীতে ঈদের এক মাস আগে থেকে দেখা যায় এমন মৌসুমি রিকশাচালকদের। এ সময়ে খেত-খামারে কাজ না থাকায় বাড়তি রোজগারের আশাতেই ঢাকায় আসেন তাঁরা। আর ঈদের আগে তা বেশ ভালোই হয় বলে জানান বাইরের জেলা থেকে আসা এমন কয়েকজন রিকশাচালক।
আজিজ পাটোয়ারি যেমন ১২ দিনেই জমিয়ে ফেলেছেন ছয় হাজার টাকা। গ্রামে থাকা পরিবারের সদস্যদের কাছে তা বিকাশ করে পাঠিয়েও দিয়েছেন। আগামী এক সপ্তাহে আরও দুই-তিন হাজার টাকা আয় করা যেতে পারে বলে আশা করছেন তিনি। আর তা হয়ে গেলেই কিনবেন গাড়ির টিকিট। তবে ঈদের ডামাডোলে টিকিট জোগাড় করা বেশ কষ্টকর হবে বলেই মনে করছেন তিনি।
মো. রফিক ঢাকা এসেছেন ছয় দিন হলো। তাঁর বাড়ি রংপুর। সেখানে মা, বাবা, ভাই, বোন আছেন। মাঠের কাজ না থাকায় ঈদের আগে ঢাকায় রিকশা চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন রিকশার মালিককে দিতে হয় ১০০ টাকা। এ ছাড়া থাকা-খাওয়ার খরচ তো আছেই। সব বাদ দিয়ে ২০-২৫ দিনে হাতে থাকে আট থেকে নয় হাজার টাকা। সেই টাকা দিয়েই ঈদের খরচ মেটাবেন তিনি। রফিক জানালেন, গত বছরও একই সময়ে ঢাকা এসেছিলেন তিনি।
কামরাঙ্গীরচরের পশ্চিম রসুলপুরে একটি রিকশার গ্যারেজের ম্যানেজার মো. সোবহান শেখ। তিনি জানান, ঈদ উপলক্ষে ঢাকার বাইরে থেকে প্রচুর রিকশাচালক আসেন। বেশি আসেন উত্তরবঙ্গ থেকে। তাঁরা মূলত ঈদের খরচ মেটাতেই মৌসুমি এই পেশা বেছে নেন। তাঁদের জন্য গ্যারেজের মালিকেরাও মেসের ব্যবস্থা করেন। সোবহান বলেন, ‘ঢাকায় আইস্যা এঁরা ভাবে সিঙ্গাপুর আইছে। গেরামে খেতে বা মাটির রাস্তায় ধানের বস্তা টাইন্যা এঁরার অভ্যাস। এহানকার পিচের রাস্তায় তো টাইন্যা গাড়ি চালায়। তয় টেরাফিকের (ট্রাফিকের) নিয়ম বোঝে না।’
তবে এসব রিকশাচালক একটি সাধারণ সমস্যায় পড়েন। সেটি হলো ঢাকার অলিগলি না চেনা। সে ক্ষেত্রে যাত্রীরাই তাঁদের রাস্তা চিনিয়ে নিয়ে যান বলে জানালেন পাটগ্রামের মো. হামিদুল ইসলাম। অভাবের তাড়নায় চার দিন হলো ঢাকায় এসেছেন তিনি। এবারই প্রথম রাজধানীতে রিকশা চালাচ্ছেন। ভাড়া নেওয়ার আগেই যাত্রীদের বলছেন রাস্তা চিনিয়ে দিতে। যাত্রীরাও আপত্তি করছেন না।
এসব রিকশাচালকের অনেকেই ঈদের আগে বাড়ি ফিরে যান। তবে বাস-ট্রেনের টিকিটের দাম বেশি হলে কেউ কেউ থেকে যান ঢাকাতেই। ঈদের দিন ও তার পরের কয়েক দিন রিকশা চালিয়ে তারপর বাড়ি ফেরেন। নাটোরের রবিউল আলম তেমনই একজন। তিনি বললেন, টিকিটের দাম বেশি হলে ঈদ ঢাকাতেই করবেন। তবে বউ-ছেলেমেয়ের জন্য জামাকাপড় কেনার টাকা পাঠিয়ে দেবেন।
কাঁঠালবাগান মোড়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অধীনে যানজট নিরসনে কাজ করা আনসার সদস্য মো. আবদুল লতিফ বলেন, ঈদের আগে রিকশার সংখ্যা বেশ বেড়েছে। এসবের মধ্যে নতুন রিকশাচালক অনেক। তবে এসব রিকশাচালক ট্রাফিকের নিয়মকানুন বোঝে না বললেই চলে। প্রায়ই সিগন্যাল না বুঝেই রিকশা চালান। হয়তো আমি থামার সংকেত দিয়েছি, কিন্তু এঁরা রিকশা চালাতেই থাকে, বলেন তিনি।