শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ: সন্তানের প্রতি মায়ের মমত্ববোধ জগতের সকল তুলনার ঊর্ধ্বে। পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর শব্দ ‘মা’। মাত্র একটি অক্ষরের শব্দ ‘মা’, অথচ তাতেই যেন সমস্ত ভালোবাসা, আবেগের সম্মিলন। সম্পর্কের বেড়াজাল ছিন্ন করে সবাই দূর পরবাসে মিলতে পারে। চলে যেতে পারে প্রেমাবেগের বন্ধনের প্রিয়সীও। কিন্তু মা’র স্নেহ-ভালোবাসার বন্ধন কখনই ছিন্ন হবার নয়।
‘
আমার মা অভাব-অনটন বুঝতে দিতেন না। যেদিন ঘরে অন্য খাবার থাকতো না, সেদিন সামান্য চাল-ডালের খিচুড়ি রেধে আচার দিয়ে খেতে দিতেন আমাদের। মা বলতেন, আসো আজকে আমরা গরিব খিচুড়ি খাবো’।
এভাবেই আবেগঘন কন্ঠে মায়ের কথা বলছিলেন শেখ হাসিনা। ৮ আগস্ট। বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৮৭তম জন্মদিন। দিনটি উপলক্ষে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনের আলোচনা সভায় নিজের মায়ের স্মৃতিচারণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘ঘরে খাবার না থাকলেও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অকাতরে সাহায্য করতেন বাবা। দলের কাজকর্ম, আন্দোলন-সংগ্রামে তার প্রয়োজনে নিজের সম্পদ দিয়ে সাহায্য করতেন মা। মা-বাবা কখনো আমাদেরকে অভাব বুঝতে দেননি। কৌশলে সেসব অভাব মেটাতেন আর আমাদেরকে ভিন্নভাবে বোঝাতেন’।
‘নিজের জন্য কখনও কিছু চাননি মা। অথচ সারাজীবন এই দেশের কল্যাণে, মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। এ দেশকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। আব্বার সঙ্গে থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন, এদেশের মানুষ ভালো থাকবে, সুখে-শান্তিতে বাস করবে। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাবার পাশে থেকে সে স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করেছেন।’
‘মায়ের আত্মত্যাগ বাবাকে এগিয়ে নিয়েছে বলেই স্বাধীনতা এনে দিতে পেরেছেন তিনি। এ স্বাধীনতার জন্য মায়ের অবদান অবিস্মরণীয়’।
একের পর এক ঘাত-প্রতিঘাত কীভাবে সহ্য করতে হয়েছে, সে কথাও বলেন তিনি। হাসিনা বলেন ‘আমার মাকে কখনও ভেঙে পড়তে দেখিনি। মা বাবাকে কখনও বলেননি, তুমি রাজনীতি ছাড়ো, সংসার করো। এতো কষ্ট তিনি করেছেন। কখনও হতাশ হননি, হাল ছাড়েননি। কখনও একটানা ২ বছর আমার বাবাকে কাছে পাইনি। এ নিয়ে আমার মা কখনও কোনো অভিযোগ-অনুযোগ করতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন তার স্বামী দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য কাজ করছেন’।
১৯৩০ সালের ০৮ আগস্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় সম্ভ্রান্ত শেখ পরিবারে জন্মগ্রহন করেন ফজিলান্নেছা মুজিব। তার ডিাক নাম রেণু। বাবা শেখ জহুরুল হক ও মা হোসনে আরা বেগম। ৩ বছর বয়সে পিতা ও ৫ বছর বয়সে মাতাকে হারান রেণু।রেণু’র পিতার ইচ্ছে ছিলো কন্যাকে পড়ালেখা শেখাবেন। কিন্তু ওই সময় একটা অজপাড়া গাঁ থেকে এ ধরনের চিন্তা অনেক বড় বিষয়। পিতার আকস্মিক মৃত্যুতে বিষয়টি অসম্ভব হয়ে পড়ে। তবুও হাল ছাড়েননি তিনি। অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়েছেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, আগস্ট মাসে আমার মা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্ম হয়েছে, এই মাসেই ঘাতকরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এই মাসেই ১৫ আগস্ট আমার ভাই কামাল, জামাল, রাসেলসহ ১৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগের এই প্রধান নেতা। অতীতের চড়াই-উতরাই জীবন স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আব্বাকে গ্রেফতার করা হলো। তিনদিনের নোটিশে আমাদের বাড়ি ছাড়তে হলো। মালপত্র নিয়ে আমরা রাস্তায় আশ্রয় নিলাম। আমরা বাসা খুঁজতে শুরু করলাম। সে এক ভয়ংকর দিন’।
দেশবাসীর কাছে ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্য দোয়া প্রার্থনা করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই দেশের স্বাধীনতা অর্জনে আমার মায়ের ভূমিকা ছিলো। একটার পর একটা ঘাত-প্রতিঘাত এসেছে। আমার মাকে কখনও ভেঙে পড়তে দেখিনি। মা বাবাকে কখনও বলেননি, তুমি রাজনীতি ছাড়ো, সংসার করো। এতো কষ্ট তিনি করেছেন। কখনও হতাশ হননি, হাল ছাড়েননি। মা সব সময় বাবার সঙ্গে ছায়ার মতো ছিলেন’।
মায়ের আত্মত্যাগ বাবাকে এগিয়ে নিয়েছে বলেই স্বাধীনতা এনে দিতে পেরেছেন তিনি। এ স্বাধীনতার জন্য মায়ের অবদান অবিস্মরণীয়’– বলেন বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার কন্যা শেখ হাসিনা।
অতীতের চড়াই-উতরাই জীবন স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আব্বাকে গ্রেফতার করা হলো। তিনদিনের নোটিশে আমাদের বাড়ি ছাড়তে হলো। মালপত্র নিয়ে আমরা রাস্তায় আশ্রয় নিলাম। আমরা বাসা খুঁজতে শুরু করলাম। সে এক ভয়ংকর দিন।
বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব নেপথ্যে থেকে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামে নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অনুপ্রেরণা ও সাহস দিয়েছেন।
জননেত্রী বলেন ‘বঙ্গমাতা’-ই বোধ হয় সবচেয়ে আগে জানতেন, এই দেশ একদিন স্বাধীন হবে। এজন্য তিনি কোনোদিন করাচিতে যাননি, যেতেও চাননি। এমনকি ভুট্টো ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হয়ে বাবার কাছে এলে মা তার সঙ্গে দেখাও করেননি। মা বলেছিলেন, ওদের সঙ্গে থাকবো না, দেখা করবো কেন? এভাবেই স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন’।
বঙ্গবন্ধুর ২৩ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে নেপথ্যের প্রেরণাদাত্রী হিসেবে বঙ্গমাতার অবদান তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, তার দূরদর্শিতাই আমাদের স্বাধীনতার পথ খুলে দিয়েছে।
ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। একজন মা। জননী। ‘বঙ্গমাতা’।যার সারাটি জীবন কেটেছে নানান চড়াই–উতরায়ের মধ্যে । কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত কবিতার লাইন দু’টি খুব মনে পড়ে:
‘কোনকালে একা হয়নি তো জয়ী পুরষের তরবারী
শক্তি দিয়েছে সাহস দিয়েছে প্রেরনা দিয়েছে বিজয় লক্ষী নারী।’
লাইন দু’টি যেন ‘বঙ্গমাতা’-কে নিয়েই লেখা। যিনি অকৃত্রিম ভালোবাসায় আখড়ে রেখেছিলেন নিজের পরিবারকে। পরম মমতায় জড়িয়ে রেখেছেন সমগ্র জাতিকে। মায়ের ঋণ কী কখনও শোধ করা যায়?মায়ের মুখের হাসি যেন আমাদের ভুলিয়ে দেয় সকল দুঃখ,কষ্ট,যন্ত্রণা।
জগতের নিষ্ঠুর নিয়ম অনুযায়ী সকলকে একদিন পাড়ি দিতে হয় পরলোকে। নিতে হয় মৃত্যুর স্বাদ। তবুও থেকে যায় তাদের স্মৃতি। যে স্মৃতি আমাদের প্রেরণা যোগায়। অনুভবের সেই প্রেরণা থেকে শক্তি পেয়ে এগিয়ে চলছেন শেখ হাসিনা। এগিয়ে চলছি আমরাও। ‘বঙ্গমাতা’-র হাসিমাখা মুখটি যেন আমাদের মনে শ্রদ্ধা জাগায়। শক্তি যোগায়। বাঁচতে শেখায়। ভালোবাসতে শেখায়। চির অম্লান এই হাসি নিয়ে তিনি পরলোক থেকে আমাদের দেখছেন। আশীর্বাদ করছেন।
সর্বংসহা নারী ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের প্রতি স্বাধীন বাংলার একজন সন্তান হিসেবে রইলো অশেষ শ্রদ্ধা।