অন্যকিছু ডেস্ক: ব্রিটেনের ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকরা তাদের ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে যৌনতার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে উদ্বেগজনকভাবে দূরত্ব বজায় রাখেন কিংবা বিব্রত বোধ করেন।
সুতরাং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকরাই যদি ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে যৌনতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে গিয়ে লজ্জায় লাল হয়ে যান তাহলে বাবা-মায়েরাই বা কীভাবে নিজেদের সন্তানদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলবেন?
হাফিংটন পোস্ট যুক্তরাজ্য শাখাকে এনএসপিসিসির এক মুখপাত্র বলেন, বাচ্চাদের সঙ্গে যৌনতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলাটা বাবা-মায়েদের জন্য একটু বেশি কঠিনই হতে পারে। বিশেষ করে যখন প্রাপ্ত বয়স্করা তাদের নিজেদের বাবা-মায়েদের সঙ্গে তাদের কী ধরনের কথপোকথন হয়েছে সে ব্যাপারে বিচার-বিবেচনা করতে বসবেন।
কিন্তু এমনকি বাবা-মায়েরা যদি এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে সঠিক শব্দটি বা সঠিক মুহূর্তটিও খুঁজে না পান তা সত্ত্বেও তাদের উচিত নিজেদের বাচ্চাদের সঙ্গেই বিষয়টি নিয়ে কথা বলা শুরু করা। অন্তত অন্য কারো সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার আগে তা-ই করা দরকার।
ঘরে যৌনতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করাটা কেন জরুরি?
ফ্যামিলি লাইভস হাফিংটন পোস্ট যুক্তরাজ্যকে ব্যাখ্যা করে বলে, যৌনতা নিয়ে গণমাধ্যমগুলো গোলমেলে বার্তায় পূর্ণ থাকে। আর এ কারণে মনে হতে পারে যে, অন্যরা বুঝি সব সময়ই শুধু যৌনকর্ম করে বেড়াচ্ছে। এ রকম সময়ে বাবা-মায়েদের উচিত তাদের সন্তানদের সহায়তায় এগিয়ে আসা।
এমনকি যদি আপনি বিষয়টি নিয়ে সত্যিকার অর্থেই হতবুদ্ধিকর অবস্থায় পড়ে যান অথবা অন্যদের হাসির খোরাকে পরিণত হওয়ার ভয়ে থাকেন তা সত্ত্বেও আপনি আপনার বাচ্চার যৌনশিক্ষার বিষয়টি শুধু বিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা ইন্টারনেট বা ওয়েবের ওপর ছেড়ে দিতে পারেন না।
প্রথমবার কীভাবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করা যায়?
কারো সঙ্গে এক এক করে আলোচনা না করে বরং আপনি আপনার সন্তানদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে একটি উন্মুক্ত সংলাপ শুরু করতে পারেন। যাতে তাদের মধ্যে এই প্রত্যয় জন্মায় যে, ভবিষ্যতে তারা আপনার কাছে পুনরায় আরো নতুন নতুন প্রশ্ন নিয়ে আসতে পারবে।
মামসনেট এর সিইও জাস্টিন রবার্ট হাফিংটন পোস্ট যুক্তরাজ্যকে বলেন, মামসনেট এর মায়েরা এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন যে, যখনই সুযোগ হবে তখনই বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে হবে। অযথা বড় পরিসরে আলোচনা করে কাজ হয়ে গেছে না ভেবে বরং সুযোগ পেলেই বিষয়টি নিয়ে কথা বলাই সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি।
কোন বয়সে সন্তানদের সঙ্গে যৌনতা নিয়ে আলোচনা করতে হবে?
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) বলেছে, আপনার সন্তান যদি যৌনতা নিয়ে কথা বলার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে বুঝতে হবে তারা সত্য উত্তরটাই জানতে চায়। যখন থেকে তারা বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা শুরু করবে ধরে নিতে হবে তখন থেকেই বিষয়টি নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা শুরু করার সময় হয়ে এসেছে। আপনাকে শুধু কীভাবে আলোচনাটি শুরু করবেন সে উপায়টি নির্ধারণ করতে হবে।
অনেক বাবা-মা হয়তো বাচ্চারা আরেকটু বড় হোক বলে বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা কথা বলা এড়িয়ে যেতে পারেন। বিশেষ করে তাদের নিজেদের বাবা-মায়েরা যদি বিষয়টি নিয়ে তাদের সঙ্গে অতীতে আলোচনা না করে থাকেন। কিন্তু এনএসপিসিসি বলেছে, পৃথিবীটা এখন অনেক বদলে গেছে।
এনএসপিসিসির এক মুখপাত্র ব্যাখ্যা করে বলেছেন, দুনিয়াটা গত কয়েকবছরেই বেশ তাৎপর্যপূর্ণভাবে বদলে গেছে। যার ফলে এখনকার প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক কম বয়সেই যৌনতার বিষয়ে জানছে এবং সতর্ক হচ্ছে। আর এর জন্য অংশত দায়ী ইন্টারনেট প্রযুক্তি। কারণ অনেকেই এখন সহজেই ইন্টারনেটে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে।
বাবা-মায়েরা সন্তানদের কোন বয়সে তাদের সঙ্গে যৌনতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলা শুরু করবেন তার বিশেষ ধরাবাঁধা নির্দিষ্ট কোনো বয়সসীমা নেই। কিন্তু এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করার সময় তাদের মধ্যে এই বোধ জাগ্রত করতে হবে যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য তাদের যথেষ্ট বয়স হয়েছে। আর তারা চাইলে যে কোনো প্রশ্ন করতে পারবে এবং ভবিষ্যতেও বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য তারা যে কোনো সময়ই পুনরায় প্রশ্ন করতে আসতে পারবে।
যৌনতার বিষয়ে কথা বলার জন্য কি বাচ্চাদের কিশোর বয়সে পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে?
রবার্টস বলেন, ১০ থেকে ১১ বছর বয়সের মধ্যেই বাচ্চাদেরকে অন্তত যৌনতার প্রাথমিক ধারণাগুলো দিতে হবে।
মামসনেট এর ইউজারদের অনেকেই, বাচ্চাদেরকে অল্প বয়সেই যৌনতা সম্পর্কে মৌলিক ধারণাগুলো সম্পর্কে জানানোর ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন। আর অত অল্প বয়সে তারা আপনার বিব্রতকর অবস্থাটিও টের পাবে না।
যৌনতা সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে কী ধরনের ভাষা ব্যবহার করা উচিত?
এনএইচএস এর অফিসিয়াল পরামর্শে বলা হয়, “বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি বিস্তারিত আলোচনা না করাই ভালো। কোনো প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত এবং সরল উত্তর দেওয়াটাই ভালো।
উদাহরণত, আপনার তিন বছর বয়সী মেয়েটি যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করে তারও কেন তার ভাইয়ের মতো পুরুষাঙ্গ নেই। এর উত্তরে আপনি তাকে বলতে পারেন প্রাকৃতিকভাবেই ছেলেদের জননাঙ্গ তাদের শরীরের বাইরের দিকে থাকে আর মেয়েদের জননাঙ্গ তাদের শরীরের ভেতরদিকে থাকে। এতেই হয়তো তার কৌতুহল মিটবে।”
আর বাচ্চারা ঠিক কী জানতে চাইছে তা বুঝতে চেষ্টা করুন। উদারহণত, তারা যদি এমন প্রশ্ন করে যে, বাচ্চারা কোথা থেকে আসে? তাহলে প্রশ্নটিকে প্রয়োজনের তুলনায় খুব বেশি জটিল করে তুলবেন না।
আপনি এর উত্তরে বলতে পারেন: শিশুরা নারীদের পেটের ভেতর জন্মায়। আর তারা যখন পরিপূর্ণভাবে তৈরি হয় তখনই তারা দুনিয়াতে পদার্পণ করে। এতেই তার প্রশ্নের যথেষ্ট উত্তর দেওয়া হয়ে যাবে।
গর্ভনিরোধ এবং যৌনতা সম্পর্কে কীভাবে আলোচনা করা যায়?
যৌনজীবন শুরু করার বহু আগেই শিশুদের গর্ভনিরোধ সম্পর্কে জানা দরকার। ফ্যামিলি লাইভস এর এক মুখপাত্র বলেছেন, “শিশুরা কিশোর বয়সে পৌঁছানোর আগেই সম্ভব হলে তাদেরকে গর্ভনিরোধ সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা দিতে হবে।”
“ছেলে-মেয়ে উভয়কেই বুঝতে হবে যৌন মিলন শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলে দুজনকেই সমানভাবে দায়-দায়িত্ব নিতে হবে। আর গর্ভধারণ এবং যৌনবাহিত রোগ থেকেও নিজেদের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।”
মামসনেটের রবার্টস হাফিংটন পোস্ট যুক্তরাজ্যকে বলেছেন, “পর্ন ছবি দেখে শিশুরা সম্মতি, হুমকি, এসটিডি এবং যৌনতা সম্পর্কিত ছবি পরস্পরের সঙ্গে শেয়ার করার ব্যাপারেও কঠিন সব ধারণার মুখোমুখি হয়। এ ক্ষেত্রে তাদেরকে নিরাপদ এবং সঠিক ধারণা দেওয়ার ব্যাপারে বাবা-মায়েরা গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা দিতে পারেন।”
যৌনতার বিষয়ে কথপোকথন শুরু করার আগে কি অন্য আর কোনো কিছু বিবেচনায় রাখতে হবে?
ফ্যামিলি লাইভস এর এক মুখপাত্র বলেছেন, যৌনতা নিয়ে আলোচনার সময় বাবা-মাকে সবসময়ই মুক্ত মন নিয়ে কথা বলতে হবে। কারণ নয়তো আপনার কিশোর বয়সী সন্তানটি তাদের যৌনতা এবং অনুভুতি নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়বে। তারা হয়তো এই উদ্বেগে আক্রান্ত হতে পারে যে, তাদের প্রতি কেউ আগ্রহী হবে না। অথবা তাদের নিজেদের মাঝেও যৌনতা নিয়ে সত্যিকার অর্থেই কোনো আগ্রহ নেই।
তারা হয়ত নিজেদেরকে উভকামী বা সমকামী হিসেবেই জানতে বা ভাবতে পারে। আপনি হয়ত তাদের এমন কোনো কথা শুনে বিস্মিত, রাগান্বিত বা মর্মাহতও হতে পারেন। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন ছোট হলেও তাদেরও আত্মসম্মানবোধ আছে এবং যৌনতা সম্পর্কে আপনার নিজের ধারণা যাই হোক না কেন তাদের প্রতি আপনার সমর্থনের দরকার আছে।