আন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক: ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ছোড়া ছররা গুলিতে ১৫ বছর বয়সী ইনশা মালিক কেবল শারীরিকভাবে পঙ্গুত্ব বরণই করেনি, রাষ্ট্রীয় বর্বরতার মুখোশও বিশ্ব দরবারে উন্মোচন করেছেন। একই সঙ্গে উন্মোচন করেছেন ভারতীয় শাসনের পদ্ধতিগত নির্যাতনের দিকটিও।
কাশ্মীরের ভৌগোলিক অবস্থান নিজেদের দখলে রাখতে এবং গণবিদ্রোহ দমনের শেষ অবলম্বন হিসেবে ভারত সহিংসতার পাশাপাশি মৃত্যু ও ধ্বংসের পথ বেঁছে নিয়েছে। ইনশা মালিকের হৃদয়বিদারক কাহিনী সাক্ষ্য দেয়, কাশ্মীরের জনগণ দশকের পর দশক ধরে কি নির্মম নির্যাতন প্রত্যক্ষ করে আসছে।
ভারতের প্রতারণাপূর্ণ প্রতিশ্রুতিতে কাশ্মীরের ভঙ্গুর রাজনৈতিক ইতিহাস কলঙ্কিত হয়েছে বার বার। বর্তমান গণজাগরণ ভারতীয় শঠতা ও বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য জনগণের আরো একটি অবাধ্যতার নজির।
নির্বিচারে তথাকথিত অ-প্রাণঘাতী ছররা গুলির ব্যবহারের এ পর্যন্ত শতাধিক মানুষ তাদের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে। যা কাশ্মীরের ইতিহাসে লেখা থাকবে অবরুদ্ধ মানুষের ওপর নির্মম ও নিষ্ঠুরতম আক্রমণের কাহিনী হিসেবে। যেমন করে জার্মানিতে নাৎসিরা তাদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ইহুদীদের ওপর চালিয়েছিল।
ছররা গুলির আক্রমণে ইনশা তার চোখে গুরুতর জখম নিয়ে হাসপাতালের বেডে শুয়ে যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে এবং খুব সম্ভবত সে তার দৃষ্টিশক্তি আর ফিরে পাবে না। কিন্তু এ ঘটনা স্পষ্টভাবেই এ উপত্যকার মানুষের জন্য একটি অনুস্মারক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তার জীবনের বাকি অংশ নিশ্চিতভাবেই অন্ধকার হতে যাচ্ছে এবং তাকে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে কিন্তু তার দুঃখজনক ঘটনা মানবতার জন্য চিরস্থায়ী ক্ষতচিহ্ন হয়ে থাকবে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার ভূমিকা একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে থাকবে।
এমন এক কঠিন সময়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার নীরবতা সবচেয়ে বিরক্তিকর এবং সবাইকে হতবিহ্বল করেছে। দৃষ্টি হারানোর পর ডাক্তারদের এখন ভয় সে মানসিক সুস্থতাও হারাতে পারে। কারণ তার মাথায়ও মারাত্মক সংক্রমণের সৃষ্টি হয়েছে। ইনশার অবর্ণনীয় ও হৃদয়বিদারক এই কাহিনী মালালা ইউসুফজাইয়ের গল্পের প্রতিনিধিত্ব করবে না কারণ এটি তথাকথিত মানবাধিকার সংস্থার কর্তাব্যক্তিদের উদ্দেশ্যকে হাসিল করতে পারবে না।
চলমান বিক্ষোভে ইনশা রাস্তায় নামেনি, এমনকি তার গ্রামে চলমান প্রতিবাদেও তার কোনো ভূমিকা ছিল না। তবুও তাকে বুনো ভারতীয় বাহিনীর নৃশংসতার শিকার হতো হলো।
তার স্বজনদের মতে, ভারতীয় বাহিনী যখন তাদের বাড়ির ভিতরে ছররা গুলি ছুড়ে ইনশা তখন বাড়ির দোতলায় ছিল। তার এক স্বজন বলেন, ‘সে আর্তনাদ করতে থাকে এবং কিছু পরেই অজ্ঞান হয়ে যায়।’
কাশ্মীরের দক্ষিণে ছায়াঘেরা শোপিয়ান গ্রামে ইনশার বাস। গ্রামটিতে ২০০৯ সালে আয়েশা ও নিলুফার নামে দুই তরুনীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় আরো একবার উত্তাল হয়ে ওঠেছিল। ওই ঘটনার অপরাধীরা এখনো প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাজ্য সরকারের ঘটনা তদন্তের নির্দেশ কেবল লাঞ্ছিতদের অপমানিতই করেনি, তাদের ন্যায়বিচারের স্বপ্নকেও মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে।
ইনশার অন্ধকারাচ্ছন্ন গল্পের শিরোনাম বিশ্ববিবেককে আঘাত করেনি কারণ তথাকথিত গণতন্ত্রের রক্ষকেরা সম্পূর্ণ মিডিয়াকে তাদের হাতের পুতুলে পরিণত করেছে। তারা অবাধ তথ্য প্রবাহের বিরোধী। কাশ্মীরে তাদের যুদ্ধাপরাধ সম্পর্কে বিশ্ব যাতে কিছুই জানতে না পারে সেজন্য তাদের চেষ্টার কোনো কমতি নেই। গণমাধ্যম ও যোগাযোগের সব মাধ্যমকে শক্ত হাতে দমনের ফলশ্রুতিতে তার গল্প বিশ্বশক্তিগুলোর দরজায় পৌঁছাতে পারে নি।
পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকার অখ্যাত এক কিশোরী মাত্র কয়েক বছরেই বিশ্বের মনোযোগ এবং প্রিয়তম পাত্রে পরিণত হয়। তার নোবলে পুরস্কার নিয়েও বিশ্ব মনে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। বিশ্ব আজ তাকে নোবেল বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই বলে ডেকে থাকে। পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকায় তালেবান শাসনামলে মেয়েদের শিক্ষার জন্য তাদের বিধি-নিষেধকে অবজ্ঞা করে সে নারী শিক্ষারর ব্যাপারে সোচ্ছার ছিলেন।
নারীশিক্ষার উন্নতিতে প্রচারাভিযান চালানোয় তালেবান যোদ্ধারা তার মাথায় গুলি করে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীকালে পশ্চিমা মিডিয়া তাকে ব্যাপক আকারে কাভারেজ দেয়।
অপরপক্ষে, দুর্ভাগা ইনশার ভাগ্যে এখনো পর্যন্ত সঠিক কোনো চিকিৎসা জোটেনি। তিনি যেকোনো সময় তার দৃষ্টি হারাতে পারেন; শ্রীনগরের ডাক্তারদের এমন সতর্কতা সত্ত্বেও তার যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি। ভারতীরা তাদের জঘন্য অপরাধ ঢাকতে মায়াকান্না স্বরূপ তাকে দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট মেডিকেল সায়েন্সেস হাসপাতালে নিয়ে গিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করেছে।
মালালার মত ইনশারও বড় স্বপ্ন ছিল। তার মা বলেন, সে একজন ডাক্তার হতে চেয়েছিলেন এবং এজন্য কঠোর অধ্যয়ন করত। ‘সে বলত, আগামী বছর দশম শ্রেণিতে ওঠলে আমার আর খেলাধুলা করার মতো সময় থাকবে না। কঠোর মনোযোগ দিয়ে কেবল পড়াশুনা করতে হবে। আমাকে ডাক্তার হতেই হবে’ কিন্তু শান্তির শিকারীরা তার সব স্বপ্নকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিল। কাউন্টার কারেন্ট ডট অরগানাইজ অবলম্বনে মো. রাহল আমীন