শীর্ষবিন্দু নিউজ: অবৈধভাবে অর্থের লেনদেনের (মানি লন্ডারিং) অভিযোগে করা মামলায় খালাস পেলেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ ছেলে ও দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একই মামলায় তাঁর বন্ধু গিয়াস উদ্দিন আল মামুনকে সাত বছরের কারাদণ্ড ও ৪০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩-এর বিচারক মো. মোতাহার হোসেন আজ রোববার এ রায় ঘোষণা করেন। দুর্নীতি দমন কমিশন মামলা করার প্রায় চার বছর পর এ মামলার রায় এলো।
রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই আদালত এলাকা ঘিরে নেওয়া হয় কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা। নিরাপত্তার স্বার্থে সিসি ক্যামেরা ও আর্চওয়ে বসানো হয়। সবাইকে তল্লাশি করে আদালতের ভেতরে ঢোকানো হয়। সকাল ১০টার দিকে পুলিশ গিয়াস উদ্দিন আল মামুনকে আদালতে হাজির করে। দুপুর ১২টার দিকে বিচারক রায় ঘোষণা করেন। মামলা দায়ের থেকে শুরু করে পুরো বিচার প্রক্রিয়াতেই অনুপস্থিত ছিলেন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক। গত পাঁচ বছর ধরে তিনি যুক্তরাজ্যে রয়েছেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোও মুদ্রা পাচারের আরেকটি মামলায় কারাদণ্ডাদেশ নিয়ে বিদেশে অবস্থান করছেন। রায়ের সময় তারেকের ব্যবসায়িক অংশীদার মামুন কাঠগড়াতেই ছিলেন। রায়ের পর তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতে অস্বীকার করেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলেছেন, এই রায়ে তারেক ন্যায়বিচার পেলেও মামুন তা পাননি। অবশ্য ইতোমধ্যে প্রায় সাত বছর কারাগারে থাকা মামুন অচিরেই মুক্তি পাবেন বলে তারা আশা প্রকাশ করেছেন। তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া দিতে রাজি হননি দুদকের আইনজীবীরা। রায়ের পর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা এজলাস কক্ষেই উল্লাস শুরু করেন। পরে তারা নিচে নেমে আনন্দ মিছিল করেন এবং মিষ্টি বিতরণ করেন। বেলা ১২টার ঠিক আগে রায় পড়া শুরু করে প্রথামে মামুনের সাজার আদেশ ঘোষণা করেন বিচারক। এরপর তিনি তারেককে বেকসুর খালাস দিয়েই নিজের খাস কামরায় চলে যান।
এরপর তাঁরা আনন্দ মিছিল বের করেন। মহানগর দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে তাঁরা দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের বিরুদ্ধে দালাল, দালাল বলে স্লোগান দেন। বিএনপিপন্থী আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আদালত ন্যায়বিচার করেছেন। রাজনৈতিক উদ্দেশে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। আজ প্রমাণ হয়েছে, তিনি একটি পয়সাও কোথাও পাচার করেননি। আসামিপক্ষের আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, তারেক ন্যায়বিচার পয়েছেন, মামুন পাননি। তার জন্য আমরা উচ্চ আদালতে যাব।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, টঙ্গীতে প্রস্তাবিত ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ নির্মাণ কনস্ট্রাকশন নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে ২০ কোটি ৪১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ঘুষ নেন মামুন। সিঙ্গাপুরে লেনদেনের পর সেখানকার সিটি ব্যাংকে মামুনের হিসাবে জমা রাখা এই অর্থের মধ্যে ৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা তারেক খরচ করেন বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়। দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল মামলার শুনানিতে বলেন, তারেকের সঙ্গে বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে মামুন অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে বাংলাদেশের ব্যাংককে ফাঁকি দিয়ে অর্থ পাচার করে দেন। ২০০৩ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন পন্থায় ২০ কোটি ৪১ লাখ ২৫ হাজার ৮৪৩ টাকা সিঙ্গাপুরে পাচার করা হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।
ওই সময় ক্ষমতায় ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট। আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ, মা প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তখন হাওয়া ভবন খুলে লুটপাট চালিয়েছিল তারেক। মামলায় অভিযোগ করা হয়, বনানীর নির্মাণ কনস্ট্রাকশন কোম্পানির মালিক খাদিজা ইসলামের কাছ থেকে মামুন ওই অর্থ নিয়েছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তারেকের বিরুদ্ধে ১৬টি মামলা হলেও এই প্রথম কোনো মামলার নিষ্পত্তি হলো। জরুরি অবস্থা জারির পর ২০০৭ সালের ৭ মার্চ তারেককে গ্রেপ্তার করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিন নিয়ে পরের বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্য যান। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তখন থেকে সেখানেই রয়েছেন তারেক। সম্প্রতি সেখানে দলীয় কয়েকটি অনুষ্ঠানেও তাকে অংশ নিতে দেখা গেছে।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী আনিসুল হক রায় মানলেও সন্তুষ্ট নন বলে জানান। পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার পর আপিলের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। দুদকের প্রধান আইনজীবী আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেন, নিশ্চই আমরা এ রায়ে সন্তুষ্ট নই। পূর্ণাঙ্গ রায় না পড়ে কিছু বলব না। একই কথা বলেন দুদকের আরেক আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান। একজনকে বলতে শোনা যায়, এ রায় মানি না।
তারেক ও তার বন্ধু মামুনের বিরুদ্ধে ২০১১ সালের ৬ জুলাই এই মামলার বিচার শুরু হয়। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলাটি দায়ের হয়েছিল ২০০৯ সালের ২৬ অক্টোবর। গত বছরের জুলাই মাসে অভিযোগপত্র আদালতে দেয়া হয়। ২০০৯ সালের ২৬ অক্টোবর ক্যান্টনমেন্ট থানায় আসামিদের বিরুদ্ধে এ মামলা করে দুদক। ২০১০ সালের ৬ জুলাই তারেক রহমান ও মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ২০১১ সালের ৮ আগস্ট তারেক রহমানকে পলাতক দেখিয়ে অভিযোগ গঠন করা হয়। চলতি বছরের ২৪ অক্টোবর বাদি ও আসামি পক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষের পর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামি পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়, যা শেষ হয় বৃহস্পতিবার।
[youtube id=”HOV2aq5DBiA” width=”600″ height=”350″]