ক্ষমতায় এসেই চমক দেখালেন ব্রিটিশ নতুন প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার। তিনি শুক্রবার প্রথম দিনেই গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজন সচিবকে নিয়োগ দিয়েছেন। এর মধ্যে এবারই প্রথম একজন মুসলিম নারী স্থান পেয়েছেন। তিনি ব্যারিস্টার শাবানা মাহমুদ। তাকে আইন ও বিচার বিষয়ক সচিব হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন স্টারমার।
এর আগে ব্রিটিশ মন্ত্রিপরিষদে কোনো মুসলিম নারী ঠাঁই পাননি। তার এই দায়িত্বে এর আগে একজনমাত্র নারী দায়িত্বে এসেছিলেন। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস। শাবানা মাহমুদের জন্ম ১৯৮০ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে। তার পিতা মাহমুদ আহমেদ এবং মাতা জুবাইদা আহমেদ।
আজাদ কাশ্মীরের মিরপুর এলাকার বাসিন্দা ছিলেন তারা। অর্থাৎ শাবানা মাহমুদ পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ-কাশ্মীর বংশোদ্ভূত। তার পিতা মাহমুদ আহমেদ একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। তিনি সৌদি আরবের তায়েফে দায়িত্ব পালনের সময় পরিবারের সঙ্গে সেখানে ১৯৮১ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত বসবাস করেন শাবানা। এরপরে তিনি বড় হন বার্মিংহামে।
তিনি ইংরেজির পাশাপাশি অনর্গল উর্দু এবং মিরপুরি ভাষায় কথা বলতে পারেন। তার মা একটি মুদি দোকানে কাজ করতেন। একপর্যায়ে তার পিতা মাহমুদ স্থানীয় লেবার পার্টির চেয়ারম্যান হন। টিনেজার অবস্থায় স্থানীয় নির্বাচনে পিতা মাহমুদকে প্রচারণায় সহায়তা করতে থাকেন শাবানা।
২০২৪ সালে তিনি নিক রবিনসনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, যদিও সবসময় তার জীবনের আকাঙ্ক্ষা ছিল রাজনীতি নিয়ে, তবু তিনি তরুণ বয়সে একজন ব্যারিস্টার হতে চেয়েছেন। ২০১০ সালে তিনি প্রথমবার একজন মুসলিম নারী হিসেবে হাউস অব কমন্সে যান।
একই বছর আরও দু’জন নারী পার্লামেন্ট সদস্য হন। তারা হলেন বাংলাদেশি রুশনারা আলী ও পাকিস্তানি ইয়াসমিন কুরেশি। এরপর এবারে লেবার পার্টির ভূমিধস জয়ের পর শাবানা মাহমুদকে প্রধানমন্ত্রী স্টারমার বানিয়েছেন ব্রিটেনের প্রথম মুসলিম নারী বিচার সচিব। শুধু তা-ই নয়, তিনি দেশটির ইতিহাসে দ্বিতীয় নারী ‘লর্ড অব চ্যান্সেলর’ পদে অধিষ্ঠিত হলেন।
দায়িত্ব নেয়ার পর মুহূর্ত থেকে কাজ শুরু করেছেন ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার। শুক্রবার ব্যস্ত দিন কাটিয়েছেন তিনি। এদিনই গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন মন্ত্রীকে নিয়োগ দিয়েছেন। তার মধ্যে ব্রিটেনের ইতিহাসে প্রথমবার চ্যান্সেলর নিয়োগ করেছেন একজন নারীকে।
তিনি হলেন- র্যাচেল রিভস। পাশাপাশি পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে নিয়োগ করেছেন ডেভিড ল্যামিকে। ১৪ বছর পর ক্ষমতা থেকে কনজারভেটিভদের উৎখাত করে মধ্য-বাম ধারার লেবার পার্টির সরকার পথচলা শুরু করেছে। নতুন চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভস সাবেক শিশু দাবা চ্যাম্পিয়ন এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের একজন অর্থনীতিবিদ। তিনি দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করাকে প্রথম কাজ বলে উল্লেখ করেছেন।
এক্সে লিখেছেন, আমাকে চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ দেয়াটা আমার জীবনের জন্য সম্মানের। যেসব মেয়ে ও নারী এই লেখা পড়ছেন তাদের সবার জন্য আজকের এই দিনটি দেখিয়ে দিয়েছে- আপনার উচ্চাকাঙ্ক্ষার কোনো সীমা থাকা উচিত নয়।
ওদিকে নতুন পররাষ্ট্র সচিব ডেভিড ল্যামি গায়েনার একজন অভিবাসী। তিনি বড় হয়েছেন লন্ডনের উত্তরে টুটেনহ্যামে। সেখান থেকে ২০০০ সাল থেকে তিনি পার্লামেন্টের প্রতিনিধিত্ব করছেন। লেমির বয়স যখন মাত্র ২৭ বছর তখন তিনি এমপি নির্বাচিত হয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সবচেয়ে কম বয়সী এমপি হন। অল্প সময়ের মধ্যে তিনি মন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, গর্ডন ব্রাউনের সরকারে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধে অবিলম্বে একটি যুদ্ধবিরতিতে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং জিম্মিদের মুক্তি দাবি করেছেন।
পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে তার নাম ঘোষণা দেয়ার পরই এ মন্তব্য করেন তিনি। বর্তমানে তার বয়স ৫১ বছর। এই দুটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বিরতিহীন কূটনৈতিক উদ্যোগে কাজ করে যাওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন লেমি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তিনি বলেন, আমরা সবাই দেখছি ইসরাইল এবং গাজা থেকে কি দৃশ্য বেরিয়ে আসছে। এ নিয়ে যে ক্ষোভ সে বিষয়ে আমাদের স্বীকার করতে হবে। কিন্তু এখন প্রয়োজন অক্লান্তভাবে কাজ করা।
ওদিকে উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নাম ঘোষণা করা হয়েছে অ্যানজেলা রেনারকে। তিনি গৃহায়ন, সম্প্রদায়ের মধ্যে বিশ্বাসসহ বিভিন্ন বিষয়ে দেখাশোনা করবেন। ৪৪ বছর বয়সী এই নারী মাঝে মধ্যে নিজের ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে কথা বলেন।
তিনি বলেন, সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত এক সরকারি বাড়িতে তিনি বড় হয়েছেন। একজন ইয়াং মা হিসেবে অল্প বয়সেই তাকে স্কুল ছাড়তে হয়েছে। তিনি ট্রেড ইউনিয়ন কর্মকর্তা হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন। তারপর এমপি হন।
লেবার দলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের মন্ত্রিপরিষদের সাবেক সচিব ইভেট কুপারকে নিয়োগ করা হয়েছে স্বরাষ্ট্র সচিব। তিনি গর্ডন ব্রাউনের মন্ত্রিপরিষদে ২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। সংস্কৃতি বিষয়ক সচিব হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে লিসা নন্দিকে।
ডচি অব ল্যাঙ্কাস্টারের চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে প্যাট ম্যাকফাডেনকে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পেয়েছেন জন হিলি। স্বাস্থ্য সচিব করা হয়েছে ওয়েস স্ট্রিটিংকে। শিক্ষা সচিব বানানো হয়েছে ব্রিজেত ফিলিপসনকে। জ্বালানি সচিব করা হয়েছে এড মিলিব্যান্ডকে। আর হাউস অব কমন্সের নেতা বানানো হয়েছে লুসি পাওয়েলকে।
Leave a Reply