রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:৩২

ব্রিটিশ-বাংলাদেশি পুরুষদের চেয়ে নারীদের সাফল্য উচ্চতায়

ব্রিটিশ-বাংলাদেশি পুরুষদের চেয়ে নারীদের সাফল্য উচ্চতায়

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের নারীরা গত তিন দশকে অভাবনীয় অগ্রযাত্রার স্বাক্ষর রেখেছেন। শিক্ষা, পেশা, রাজনীতি ও উদ্যোক্তাপনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই নারীরা শুধু নিজেদের সীমানা অতিক্রম করেননি, বরং পুরো জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বও করেছেন এক নতুন উচ্চতায়।

তবে এই উত্থানের বিপরীতে, একই সম্প্রদায়ের পুরুষরা বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাধার কারণে একটি ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন।

১৯৯০-এর দশক থেকে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি মেয়েরা তাদের শ্বেতাঙ্গ ও মুসলিম পুরুষ সহপাঠীদের ছাড়িয়ে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ধারাবাহিক সাফল্য দেখিয়ে আসছেন। ২০১৭ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২১ থেকে ২৪ বছর বয়সী ব্রিটিশ-মুসলিম নারীদের মধ্যে ২৫ শতাংশ ডিগ্রিধারী, যেখানে পুরুষদের হার ২২ শতাংশ।

এই অর্জন আসেনি অনুকূল পরিবেশে। ভাষাগত বাধা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, সাংস্কৃতিক চাপ—সব কিছু উপেক্ষা করে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি নারীরা প্রতিযোগিতার মাঠে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। তথাকথিত ‘উচ্চতর মানের’ বিশ্ববিদ্যালয়ে কম উপস্থিতি এবং তুলনামূলকভাবে বেশি ড্রপআউট হার সত্ত্বেও, তাদের সংকল্প প্রশ্নাতীত।

শুধু শিক্ষাতেই নয়, কর্মক্ষেত্রেও এই নারীরা দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন। আইন, চিকিৎসা, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যবসা, এমনকি রাজনীতিতেও দেখা যাচ্ছে তাদের শক্তিশালী উপস্থিতি।

২০২২ সালে পাকিস্তানি ও বাংলাদেশি নারীদের সম্মিলিত বেকারত্বের হার ৯ শতাংশ হলেও, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র প্রসারমান। বিশেষ করে উদ্যোক্তাপনায় বাংলাদেশি নারীরা চমকপ্রদ পারফরম্যান্স দেখাচ্ছেন। ২০০৭ সালের জরিপ অনুযায়ী, ২০ শতাংশ বাংলাদেশি নারী নিজেই ব্যবসার মালিক হতে চান—যা শ্বেতাঙ্গ নারীদের তুলনায় দ্বিগুণের কাছাকাছি।

যুক্তরাজ্য সরকারের ‘শি ট্রেডস’ প্রোগ্রামে বাংলাদেশি নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ ছিল এ প্রবণতার আরেকটি শক্তিশালী উদাহরণ।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এখন পর্যন্ত নির্বাচিত চারজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপি সবাই নারী—রুশনারা আলী, রূপা হক, টিউলিপ সিদ্দিক ও আপসানা বেগম।

পুরুষদের অনুপস্থিতি এই ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরেছে। যদিও স্কটল্যান্ডের রাজনীতিতে ফয়সল চৌধুরী সক্রিয় রয়েছেন। তবে তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য নন।

নারীদের এই রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা সমাজের বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রতি তাদের অঙ্গীকারের প্রতিচ্ছবি।

বিপরীতে, ব্রিটিশ-বাংলাদেশি পুরুষদের অনেকেই এখনও ‘ডেলিভারি’, রেস্টুরেন্ট ও অদক্ষ খাতেই সীমাবদ্ধ রয়েছেন। ২০০২-০৩ সালে ১৮ শতাংশ বাংলাদেশি পুরুষ ছিলেন বেকার, যেখানে শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের মধ্যে এই হার ছিল মাত্র ৫ শতাংশ।

এমনকি যারা কর্মরত, তারাও প্রায়শই ন্যূনতম মজুরির নিচে কাজ করেন, শ্রমবাজারে বর্ণবাদের শিকার হয়ে ভোগেন। অনেকেই সম্প্রদায়ভিত্তিক ব্যবসায় নিযুক্ত হলেও, শ্রমিক অধিকারের সুরক্ষার অভাব এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তাদের অবস্থানকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

আরও উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে। এনএইচএস-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ সালে মাত্র ৩ হাজার ৭৩১ জন বাংলাদেশি পুরুষ ‘টকিং থেরাপি’ পরিষেবায় রেফার হয়েছেন। যেখানে শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের সংখ্যা ১১ লাখেরও বেশি। রেফার হওয়ার পরেও বাংলাদেশি পুরুষদের চিকিৎসা বন্ধ করার হার সর্বোচ্চ।

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে পুরুষদের মধ্যে সামাজিক অনীহা এবং ‘দায়িত্ববান উপার্জনকারী’ হয়ে ওঠার চাপ অনেককেই নিঃসঙ্গ করে তোলে। ভাষাগত অসুবিধা, সাধারণ চিকিৎসকদের প্রতি অবিশ্বাস ও লোক-লজ্জার ভয় এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।

২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা ৬ লাখ ৪৪ হাজারের বেশি। নারী ও পুরুষের সংখ্যা প্রায় সমান হলেও, তাদের বাস্তবতা ভিন্ন। নারীদের অগ্রগতি যেমন প্রেরণাদায়ক, তেমনি পুরুষদের বিভিন্নমুখী সংগ্রাম উদ্বেগজনক।

সামগ্রিকভাবে, এই পরিস্থিতি একটি বাস্তব বার্তা দিচ্ছে যে—নারীদের কৃতিত্ব উদযাপনের পাশাপাশি, পুরুষদের প্রতিকূলতা চিহ্নিত করে তার টেকসই সমাধান প্রয়োজন। শ্রমবাজারে সমান সুযোগ, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং সমতাভিত্তিক ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সময়ের দাবি।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026