আগামী ২৫শে ডিসেম্বর দেশে ফিরছেন বলে জানিয়েছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার যুক্তরাজ্য বিএনপি আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তারেক রহমান এ কথা জানান। যুক্তরাজ্যের লন্ডনের দ্য সিটি প্যাভিলিয়ন হলে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
সভায় বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র হয়েছে। আমরা দেখেছি, স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে যখন নতুন দেশটি আমরা পেলাম। তখন মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিল। এই দেশে গণতন্ত্রের চর্চা হবে, গণতন্ত্রের চর্চার মাধ্যমে ধীরে ধীরে দেশ ও জাতি এগিয়ে যাবে। হঠাৎ করে দেখেছি বাকশাল চলে আসলো।
তিনি বলেন, গণতন্ত্রে মানুষের অধিকার, ভোটের অধিকার সবকিছুর টুঁটিকে চেপে ধরা হলো। পরবর্তীতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলেন জনগণের কাছ থেকে। আমরা দেখেছি আবার বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু হলো দেশে ধীরে ধীরে। মানুষ কথা বলার অধিকার ফিরে পেলো, সংবাদপত্রগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে লাগলো। সংবাদপত্রগুলোও গঠনমূলক সমালোচনা শুরু করতে লাগলো সরকারের। জনগণের প্রত্যাশা প্রতিফলিত হতে লাগলো সংবাদপত্রে, বিভিন্ন আলোচনা অনুষ্ঠান ও সেমিনারে।
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় দেখলাম দুর্ভিক্ষ অবস্থা থেকে কাটিয়ে, দেশ একটি উৎপাদনমুখী রাজনীতি শুরু করলো। তিনি বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় খাদ্য উৎপাদন শুধু দ্বিগুণই হলো না। আমরা দেশ থেকে খাদ্য রপ্তানিও করেছিলাম, হতে পারে অল্প ছিল।
কিন্তু করেছিল বাংলাদেশের মতো একটি দেশ উদ্বৃত্ত চাল। আমরা দেখেছি কীভাবে সেসময় গড়ে উঠেছিল মিল-কলকারখানা। যেখানে উৎপাদিত হতে লাগলো বিভিন্ন দ্রব্য, যেখানে আস্তে আস্তে মানুষের কর্মসংস্থান ব্যবস্থা হতে লাগলো। তার ফলে মানুষের অর্থনৈতিক যে মেরুদণ্ড, সেই মেরুদণ্ড মজবুত হতে লাগলো। কিন্তু কী দেখলাম আমরা ১৯৮১ সালে?
ষড়যন্ত্র বাংলাদেশের বিরুদ্ধে থেমে ছিল না। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হলো। হত্যা করার মাধ্যমে দেশের গণতন্ত্রের গতি, গণতন্ত্রের চর্চা, মানুষের অর্থনীতির ভাগ্য উন্নয়নের যে চাকা, সেটিকে স্তব্ধ করে দেয়া হলো। তার পরের যুগ আপনারা দেখেছেন সামরিক শাসনের পরে স্বৈরাচারী এক সরকার ছিল দেশে। গণতন্ত্রের নামে প্রহসন আমরা দেখেছি।
তারেক রহমান বলেন, ১৯৯১ সালে আবারো জনগণ-জনতার আন্দোলনের মুখে সেই স্বৈরাচারের পতন হলো। পরবর্তীতে নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সাধারণ মানুষের সমর্থনের সরকার গঠন করলো। আমরা দেখেছি- দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সরকার বাংলাদেশের মানুষের দ্বারা নির্বাচিত হওয়ার পরে কীভাবে আবার ধীরে ধীরে দেশকে গড়ে তুলতে সক্ষম হলো। দেখেছি সেই সময় কীভাবে দেশে আবারো শিল্প-কলকারখানা স্থাপিত হলো।
১৯৯৬-এর সেই ষড়যন্ত্রমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে এই যে পলাতক স্বৈরাচার যারা গত এক বছর আগে দেশ থেকে পালিয়ে গেছে জনগণের আন্দোলনের মুখে- তারা যখন ’৯৬ সালে আসলো তখন সংসদে একদিন তাদেরই তৎকালীন যে শিল্পমন্ত্রী, তার নিজের বক্তব্য ছিল যে, ’৯১-’৯৬ সাল পর্যন্ত দেশনেত্রী খালেদা জিয়া যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন তখন দেশে ৮৪ হাজার শিল্প-কলকারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
এই সংখ্যাটা দিয়েই বোঝা যায়, দেশে সে সময় উন্নয়নের গতিধারা চালু হয়েছিল। ঠিক একইভাবে যেমন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়, দু’টি সেক্টর যেটি নিয়ে ’৭৫-এর পরে প্রতিটা সরকার গৌরব বোধ করেছে- এক, বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্প। দুই, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। এটিও কিন্তু বিএনপি সরকারের করে যাওয়া, জিয়াউর রহমানের করে যাওয়া।
তিনি বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময় আমরা কী দেখলাম? যেমন দেখলাম ৮৪ হাজার শিল্প কল-কারখানা স্থাপিত হলো। দেশের গ্রামগঞ্জের রাস্তাঘাটগুলো আস্তে আস্তে পাকা হওয়া শুরু হলো। স্কুল-কলেজগুলোতে লেখাপড়া শুরু হলো। গ্রামের শিশু, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন নতুন স্কুল-কলেজ স্থাপিত হওয়া শুরু করলো একইভাবে আমরা দেখলাম একটি বিশাল সংস্কার, বাংলাদেশের জনসংখ্যার… মোটামুটি সকল সময়ে।
’৯১ সালে খুব সম্ভবত জনসংখ্যা ছিল ১২/১৩ কোটির মতো। তখনো জনসংখ্যার অর্ধেক ছিল নারী। এই অর্ধেক জনসংখ্যাকে যদি আমরা আমাদের পুরো অর্থনৈতিক- শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে না আনি কোনোভাবেই দেশকে গড়ে তোলা সম্ভব না। এবং আমরা তাই দেখলাম- দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মেয়েদের স্কুল-কলেজে বিনা বেতনে শিক্ষাব্যবস্থা চালু করলেন।
তারেক রহমান আরও বলেন, আমরা বিগত ১৬ বছর- ২০০৮ থেকে এবং বিশেষ করে ’১৪ সালের পর থেকে ৪ঠা আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, দলের লাখ লাখ নেতাকর্মী রাজপথে ছিলাম। কেন ছিলাম? আমরা রাজপথে ছিলাম এ দেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, কথা বলার অধিকার, ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। আমরা যে শুধু একা ছিলাম তা নয়।
আমাদের সঙ্গে আরও কিছু রাজনৈতিক দল ছিল। কে ছোট, কে বড়- সেটি কথা না। মূল কথাটি হচ্ছে, অত্যাচার, নির্যাতন ও অবৈধ ক্ষমতা দখলদারের বিরুদ্ধে বিএনপি সহ অনেকগুলো রাজনৈতিক দল সে সময় রাজপথে ছিলাম। রাজপথে থাকতে গিয়ে আমাদের হাজারের মতো নেতাকর্মী গুমের শিকার হয়েছেন। আরও হাজারেরও বেশি নেতাকর্মী খুনের শিকার হয়েছেন। আমাদের ষাট লাখের মতো নেতাকর্মী বিভিন্ন নির্যাতন, অত্যাচার ও হামলার শিকার হয়েছেন।
আপনাদের মধ্যেও হয়তো এখানে বহু মানুষ আছেন যারা নির্যাতনের কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। শুধু যুক্তরাজ্য নয়, ইউরোপের বহু দেশে আছে, মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, আমেরিকার বহু দেশে আমাদের বহু নেতাকর্মী আছেন যারা হয়তো বাধ্য হয়ে চলে গিয়েছিল দেশ ছেড়ে। যুগেরও বেশি সময় ধরে বিএনপি আন্দোলন করেছে। আমরা ৫ই আগস্ট যেই স্বৈরাচারকে বাংলাদেশ থেকে বিদায় করেছি, ঝেটিয়ে বের করে দেয়া হয়েছে দেশ থেকে।
জনগণের ভয়ে যে পালিয়ে গেছে দেশ থেকে- এটির অর্জন কোনো রাজনৈতিক দলের নয়। এর অর্জন সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের। যদি আগস্টের দিনগুলো, জুলাইয়ের শেষদিনগুলো দেখেন, শুধু কি রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, কর্মীরা মাঠে ছিল? নো। সেদিন আমরা দেখেছি- একজন রিকশাচালক মাঠে, সিএনজিচালক মাঠে।
আমরা দেখেছি ক্ষুদে ব্যবসায়ী, স্কুলশিক্ষক মাঠে। ডাক্তার ও নার্স মাঠে। আমরা দেখেছি বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি, স্কুলশিক্ষক, ছাত্রছাত্রীরা মাঠে। গৃহিণীরা পর্যন্ত রাজপথে। শিশুরা রাজপথে। প্রতিটি মানুষের ত্যাগ, প্রত্যেকের অবদান, সাহসিকতার ফলেই আন্দোলন সেদিন সফল হয়েছিল।
বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ষড়যন্ত্র চলছে। ষড়যন্ত্রকারীরা কিন্তু তাদের…সেই একাত্তরে যারা ষড়যন্ত্র করেছিল, পঁচাত্তরে যারা করেছিল- ৭ই নভেম্বর পরাজিত হয়েছিল, ’৮১, ’৯৬ সালে যারা করেছিল- পরবর্তীতে যারা ষড়যন্ত্র করেছিল তাদের ষড়যন্ত্র কিন্তু থেমে নেই। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল একটি দায়িত্বশীল দল হিসেবে আমাদের এবং প্রত্যেক পর্যায়ের নেতাকর্মীর পবিত্র দায়িত্ব হচ্ছে- বাংলাদেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সচেতন করার মাধ্যমে সজাগ- সতর্ক থাকা এবং জনগণকে সজাগ এবং সতর্ক রাখা ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে।
তিনি বলেন, স্বৈরাচারকে আমরা বিদায় করেছি। ১৬ বছর ধরে এবং এর আগের বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের মানুষ- সে রাজনৈতিক দলের নেতা বা কর্মীই হোক অথবা একজন সাধারণ মানুষ যে তার দেশকে ভালোবাসে- এমন বহু মানুষ অকাতরে জীবন বিলিয়েছে। শুধুমাত্র দেশকে একটি সঠিক জায়গায় নিয়ে আসার জন্য। শুধুমাত্র দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে প্রতিষ্ঠার জন্য।
তিনি আরও বলেন, আজ একটি সময় এসেছে। আগামী দুই মাস পর এদেশে একটি নির্বাচন, বহুল প্রত্যাশিত নির্বাচন। যে নির্বাচনে মানুষ নিজে ঘর থেকে বেরিয়ে, নিরাপদে যাবে, স্বাচ্ছন্দ্যে ভোট দেবে তার ইচ্ছামতো। এমন প্রত্যাশার দিন সামনে অপেক্ষা করছে।
তিনি বলেন, একই সঙ্গে আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে দেশের মানুষের সামনে পরিকল্পনা দেয়া। আমাদের মধ্যে অনেকেই বক্তব্যে বলেন, আমরা এই স্বপ্ন দেখছি, সেই স্বপ্ন দেখছি, আমি কোনো স্বপ্নের মধ্যে নেই, আমি আছি পরিকল্পনার মধ্যে। আমরা পরিকল্পনা করবো, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবো। স্বপ্ন দেখতে দেখতে দেশ থেকে ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে গেছে। স্বপ্ন দেখতে দেখতে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, কৃষি ব্যবস্থা, রাস্তাঘাট, আইন-আদালত, আইনশৃঙ্খলা সবকিছু ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বক্তব্যের আগে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ’২৪-এর শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা এবং বিএনপি’র চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনায় বিশেষ দোয়া করা হয়।
যুক্তরাজ্য বিএনপি’র নবগঠিত আংশিক কমিটির আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এবং সদস্যসচিব খসরুজ্জামান খসরু অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাজ্য বিএনপি’র সদ্য সাবেক সভাপতি এম এ মালেক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক কয়সর এম আহমদসহ নেতাকর্মীরা।
Leave a Reply