রবিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২১, ০৭:৩০

হতে পারে এটাই আমার শেষ বক্তৃতা

হতে পারে এটাই আমার শেষ বক্তৃতা

এখানে শেয়ার বোতাম
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

 

 

 

 

 

 

 

 

জবানবন্দি অব্যাহত রাখার সুযোগ দিতে ট্রাইব্যুনালের প্রতি অনুরোধ রেখেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। বলেছেন, হতে পারে এটাই আমার জীবনের শেষ বক্তৃতা। ফাঁসি দেয়ার দিবেন, কোন সমস্যা নেই। কিন্তু আমাকে আমার কথা বলতে দিতে হবে।

পঞ্চম দিনের সাফাই সাক্ষ্যে আরও একবার বলেছেন, নিজের জীবনের জন্য লড়াই করছেন তিনি। স্মরণ করেছেন সেই পুরনো প্রবচন, যদি তুমি কাউকে হত্যা করতে না পারো তবে তাকে একটি খারাপ নাম দাও। জরুরি জমানায় রাজনীতিবিদদের ওপর পরিচালিত নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। সমালোচনা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধনীর। বলেছেন, ২০০৯ সালের সংশোধনীতে ১৬ কোটি মানুষকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে অভিযুক্ত করার যোগ্য করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ইচ্ছাকে চাপিয়ে আইনে এ সংশোধনী আনা হয়েছে। তার জবানবন্দির দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে গতকালও প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল ১-এ এই জবানবন্দি দেন বহুল আলোচিত এ সংসদ সদস্য।

এ সময় তিনি বলেন, রাজনৈতিক নিপীড়ন বাংলাদেশে নিয়মে পরিণত হয়েছে। এটা জনপ্রিয় ও নির্বাচিত রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে আরও বেশি সত্য। এক এগারোর হোতারা রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনেছিল যেন তাদের নির্বাচন এবং ক্ষমতার বাইরে রাখা যায়। এ পর্যায়ে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন আপত্তি জানিয়ে বলেন, এসব বক্তব্য এ চার্জের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। এসব বক্তব্যে এ মামলার কোন লাভ হবে না। জবাবে সালাউদ্দিন কাদের বলেন, কেন আমাকে অভিযুক্ত করা হলো তা তো আমাকে বলতেই হবে। আমার ৩৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনকে প্রশ্নের মুখোমুখি করা হয়েছে তা কি আমি বলবো না? তিনি বলেন, কেন আমাকে ৪২ বছর পর এখানে আনা হলো? আইনে কি ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেয়া যায়? আপিল বিভাগেও এরই মধ্যে এ প্রশ্ন উঠেছে। আপিল বিভাগ সাত জন এমিকাস কিউরি নিয়োগ দিয়েছেন।

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, ওয়ান  ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দেশ ত্যাগের জন্য চাপ দেয়া হয়েছিল। শেখ হাসিনাকে চাপ দেয়া হয়েছিল তিনি যেন দেশে না ফেরেন। খালেদা জিয়াকে তার বাসা ছেড়ে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (তৎকালীন নাম) যেতে চাপ দেয়া হয়েছিল। এ দু’টি প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছিল। এ দুই জন জাতীয় আইকনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। বর্তমানে অষ্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশী হাইকমিশনার লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত আদালতে তাদেরকে বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছিল। গণতন্ত্রকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে এ দুই জাতীয় আইকনসহ জনপ্রিয় রাজনীতিবিদদের পার্লামেন্টের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত আদালতের মুখোমুখি করা হয়েছিল। এ অপবিত্র কাজের সঙ্গী হয়েছিলেন ভাড়াটে শ্রেণীর কিছু লোক। মিডিয়ার একটি অংশ, সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের একটি অংশ এবং কিছু আইনজ্ঞ তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। যে আইনজ্ঞরা এক এগারোর শাসন সমর্থন করেছিলেন তাদের নেতৃত্বে ছিলেন দ্বিজাতি তত্ত্বের সুবিধাভোগী একজন সংবিধান বিশেষজ্ঞ।  এক এগারোর দস্যুরা যে উদ্দেশ্যে রাজনীতিবিদদের নিপীড়ন করেছিল সে একই উদ্দেশ্যে এখনও রাজনীতিবিদদের ওপর নিপীড়ন হচ্ছে। তিনি বলেন, ১৯৭৯ সাল থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রে আমি একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। এরপর সব নির্বাচনেই আমি অংশ নিয়েছি, যেসব নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগও অংশ নিয়েছিল। সমঝোতা অথবা একদলীয় কোন সরকারে আমি কখনওই অংশ নেইনি। আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীকে পরাজিত করে প্রতিটি সংসদেই আমি প্রতিনিধিত্ব করেছি। আমি আমার বিজয় ভাগ করে নিয়েছি প্রতিদ্বন্দ্বী ও সমালোচকদের সঙ্গে। তিনি বলেন, সংসদের তৈরী আইনের অধীনে আমাকে এখানে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭৩ সালের জুলাই মাসে এ আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ইচ্ছায় সামরিক বাহিনী, আধা সামরিক বাহিনী এবং সহযোগী বাহিনীর সদস্যদের বিচারের জন্য এ আইন করা হয়েছিল। প্রথম যে বিল সংসদে উত্থাপন করা হয়েছিল তাতে ‘ব্যক্তি’ কথাটি যুক্ত ছিল। কিন্তু পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনায় তা বিল থেকে বাদ দেয়া হয়।  ২০০৯ সালে চলতি সংসদের দ্বারা সংশোধিত আইনে ‘ব্যক্তি অথবা ব্যক্তিবর্গ’ কথা যুক্ত হয়। এর মাধ্যমে ১৬ কোটি মানুষকে এ আইনে বিচারের যোগ্য করা হয়েছে। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আইন তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংসদ সার্বভৌম। সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি হচ্ছে নারীকে পুরুষ অথবা পুরুষকে নারী বানানো ছাড়া সংসদ সব কাজই করতে পারে।

নবম সংসদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ইচ্ছাকে চাপিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধনীতে ‘ব্যক্তি অথবা ব্যক্তিবর্গ’ শব্দ আইনে যুক্ত করা হয়। তিনি বলেন, ২০১০ সালের ১৯শে ডিসেম্বর থেকে আমাকে আটক রাখা হয়েছে। অথচ কোন আটকাদেশ আমি এখনও পাইনি। এসময়ে সংসদ অধিবেশনে যোগ দিতে প্রেসিডেন্ট আমাকে সমন পাঠিয়েছেন। সংসদ যোগ দেয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করে আমি এ ট্রাইব্যুনালে আবেদন দায়ের করেছি। অথচ ট্রাইব্যুনাল তার বিচারিক ইচ্ছা অনুযায়ী আমার আবেদনগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জবানবন্দির এ পর্যায়ে আবারও প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়।

প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ বলেন, এরই মধ্যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ১০ সেশন জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি যেসব কথা বলছেন তা এ মামলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদেরকে আইনের মধ্যে থেকে এগোতে হবে। জবাবে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আপনারা ১০ সেশনের হিসাব করছেন। আর আমি হিসাব করছি আমার জীবনের। আমাকে আমার কথা বলতে দিতে হবে। বৃটিশ আমলে মাওলানা মোহাম্মদ আলী দুই মাস ২৪ দিন নিজের পক্ষে জবানবন্দি দিয়েছিলেন। আর স্বাধীন বাংলাদেশে আমাকে প্রতিদিন টাইম ম্যানেজমেন্ট শেখানো হচ্ছে। তিনি বলেন, শাহবাগ চত্বর ডাক দিলো আর আপনারা আইন সংশোধন করে ফেললেন? এখন তো দেখছেন আপিল বিভাগ সাত জন এমিকাস কিউরি নিয়োগ দিয়েছে। প্রসিকিউশন যেভাবে ভাবছে কাল সকালেই আমার ফাঁসি হয়ে যাবে, সব কিছু এত দ্রুত হবে না। তিনি ট্রাইব্যুনালকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এত তাড়াহুড়ার কি আছে? গোলাম আযম সাহেবের মামলায় শুনানি শেষের আড়াই মাস পরেও তো রায় হলো না।

পরে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, এ মামলায় প্রসিকিউশনের বলা হাজারো মিথ্যার মধ্যে একটাই সত্য আমি মরহুম একেএম ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলে। তিনি বলেন, ফর্মাল চার্জে প্রসিকিউশন আমার পিতাকে সামপ্রদায়িক ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তাকে বর্ণনা করা হয়েছে হিন্দু বিরোধী ব্যক্তি হিসেবে। তার অর্জনকে অস্বীকার করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র ছিলেন। সে সময়ে তিনি থাকতেন কারমাইকেল হোস্টেলে। সে সময় নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর শিষ্য হিসেবে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর ভারত ত্যাগ না করা পর্যন্ত তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নেতাজীর দেশ ত্যাগের পর ফজলুল কাদের চৌধুরী ছয় মাসের জন্য আল্লামা মাশরিকীর খেলাফত পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন। পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট এবং পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন সত্ত্বেও নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর সমাবেশে সভাপতিত্ব করা নিয়ে তিনি সবচেয়ে গর্বিত ছিলেন।

প্রসিকিউশন ওই ঐতিহাসিক সত্য অস্বীকার করেছে যে, ১৯৪০ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে কোন ধরনের সামপ্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি। তখন আমার পিতা চট্টগ্রামের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, কলকাতার জনপ্রিয় ছাত্র নেতা হিসেবে আমার পিতার রাজনৈতিক অনুসারীদের মধ্যে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নিজের আত্মজীবনীর বহুস্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সে কথা বলেছেন। এ মামলা চলাকালেই সে আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়েছে।

ট্রাইব্যুনাল আগামী দুই দিনের মধ্যে জবানবন্দি শেষ করতে বললে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমার পক্ষে সম্ভব না। আপনি চাইলে এখনই শেষ করে দিন। তিনি বলেন, ফাঁসি দেয়ার দিয়ে দেন। কিন্তু আমাকে কথা বলতে দিতে হবে। আমাকে হাত-পা বেঁধে সাঁতার কাটতে বললে তো হবে না। এসময় ট্রাইব্যুনাল বলেন, আপনি ছকে আসেন। তখন সালাউদ্দিন কাদের বলেন, আমি সুপার ছকের মধ্যে আছি। আমার পিতার কথা বলার পর আমার কথা বলবো, এরপর চার্জে আসবো। মোহাম্মদ আলীর মতো আমি অবশ্যই আড়াই মাস বক্তৃতা করবো না। পরে আজ পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করা হয়। ২৬শে জুনের মধ্যে জবানবন্দী শেষ করতে তাকে ট্রাইব্যুনাল নির্দেশ দেন। সালাউদ্দিন কাদেরের জবানবন্দি নিতে সহায়তা করেন ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম।

 


এখানে শেয়ার বোতাম
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  






পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০  
All rights reserved © 2021 shirshobindu.com