রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৯

প্রধান সমস্যা জনসংখ্যা

প্রধান সমস্যা জনসংখ্যা

নিয়াজ মাহমুদ: দেশের এক নম্বর জাতীয় সমস্যা জনসংখ্যা। সম্পদের তুলনায় অধিক জনসংখ্যা বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে বড় বাধা, ২০১৫ সালের মধ্যে এনআরআর-ওয়ান অর্জন করা না গেলে ২০৫০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২২ কোটিতে দাঁড়াবে। পাশাপাশি ২০৭০ সালে তা ২৩ থেকে ২৫ কোটিতে গিয়ে স্থির হবে। তখন বছরে জন্ম ও মৃত্যুর সংখ্যা সমান হবে। আর যদি এনআরআর-ওয়ান অর্জন  বিলম্বিত হয় তাহলে তা থেকে সৃষ্ট গতিময়তার কারণে জনসংখা স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছতে আরও বিলম্ভ হবে। ফলে মৌলিক প্রয়োজন খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, পানি বিদ্যুৎ সরবরাহসহ সব রকম সেবা ও অবকাঠামোর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জনসংখ্যানীতি শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।

পাশাপাশি ইউএনএফপিএর বার্ষিক  প্রতিবেদনে (২০১৩) বলা  হয়েছে, প্রতি বছর  ৩০ লাখ শিশুর জন্ম হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতি বছর শিশুসহ প্রায়  ১০ লাখ  লোক মারা যাচ্ছে। মৃত্যুর পর প্রতি বছর ২০ লাখ  লোক জনসংখ্যার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এতে বলা হয়, এ অবস্থা আরও প্রায় ৪০ বছর চলবে। এরপর জন্ম ও মৃত্যুর সংখ্যা সমান হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলা হয় ফি বছর দেশে ১০  থেকে ১২ লাখ বিয়ে হয়। এর মধ্যে প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার কিশোরীর বিয়ে হয় বয়স ১৫ বছর হওয়ার আগেই। এতে আরও বলা হয়, কিশোর বয়সে মা হওয়া সারা পৃথিবীরই সমস্যা। এশিয়ার মধ্যে কিশোরী গর্ভধারণের হার বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব গণেশ চন্দ্র সরকার বলেন, অবশ্যই দেশের এক নম্বর জাতীয় সমস্যা জনসংখ্যা। তিনি দরিদ্রতাকে এ জন্য দায়ী করেন। পাশাপাশি বাল্যবিবাহের কারণে জনসংখ্যা  বাড়ছে বলে মত দেন।  গণেশ চন্দ্র সরকার বলেন, এজন্য বাল্যবিবাহ ঠেকাতে হবে। ‘দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভাল হয়’- এই স্লোগানকে জনপ্রিয় ও প্রতিষ্ঠিত করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করার কথা সরকার ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তরফে বলা হলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন নেই। নেই  জোরালো প্রচার-প্রচারণা।

ওদিকে, প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৭৩-১৯৭৮) জনসংখ্যা সমস্যাকে এক নম্বর জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে বঙ্গবন্ধু সরকার। এ প্রসঙ্গে ১৯৭৫ সালের ২৬শে মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত এক জনসভায় বলেছিলেন, ভাইয়েরা আমার, একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, প্রতি বছর আমাদের ৩০ লাখ লোক বাড়ে। আর আমাদের জায়গা হলো ৫৫ হাজার বর্গমাইল। যদি প্রতি বছর ৩০ লাখ লোক বাড়ে তাহলে ২৫-৩০ বছর পর কোন জমি থাকবে না চাষ করার জন্য। মানুষ মানুষের মাংস খাবে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৬ সালে জনসংখ্যানীতির একটি রূপরেখা করা হয়। ২০০৪ সালে জনসংখ্যা নীতি প্রণয়ন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে তা অনুমোদন করা হয়। প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলেও এ বিষয়ে বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়। পরে দেশের নীতিনির্ধারকরা আর এ বিষয়ে খুব একটা মাথা ঘামাননি।

এর ফলে জনসংখ্যা বাড়ছেই। ২০০৪  সালের জনসংখ্যা নীতিতে ২০১০ সালের মধ্যে প্রতিস্থাপনযোগ্য জনউর্বরতা এবং নিট প্রজনন হার  অর্জন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বর্তমান জনউর্বরতার হার বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, ওই সময়ের মধ্যে এনআরআর-ওয়ান অর্জন করা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি গ্রহীতামুখীসেবা, যুববান্ধব সেবা,  নারীর ক্ষমতায়ন ও সমতা, দরিদ্র ও বয়স্কবান্ধব সেবা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, পরিবেশ বান্ধব পরিকল্পনাসহ নানা প্রকার কর্মকৌশল পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন কর্মসূচিতে আশানুরূপ  সাফল্য আসেনি। কম বয়সে বিয়ে ও সন্তান ধারণ দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারে গতিময়তা সৃষ্টি না হওয়ায় কর্মসূচিতে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এনআরআর-ওয়ান অর্জন করা প্রয়োজন। ২০১৫ সালের মধ্যে এনআরআর-ওয়ান অর্জন করা গেলে ২০৫০ সালে বাংলাদেশের জনসংখা ২২ কোটিতে দাড়াবে এবং ২০৭০ সালে তা ২৩-২৫ কোটিতে গিয়ে স্থির হবে। আর যদি এনআরআর-ওয়ান অর্জন  বিলম্বিত হয় তাহলে কম বয়সী জনসংখ্যা কাঠামো থেকে সৃষ্ট গতিময়তার কারণে জনসংখা স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছতে আরও বিলম্ভ হবে। আর জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে দেশের সীমিত ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক জনসংখ্যার জন্য খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, জলবায়ু, পরিবেশ, যোগাযোগ অবকাঠামোসহ মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করা কষ্টসাধ্য হবে।

বাংলাদেশ পরিবার ও পরিকল্পনা সমিতি (এফপিএবি)র মহাসচিব নাসির আহমেদ বাবুল মানবজমিনকে বলেন, দেশের এক নম্বর  জাতীয় সমস্যা জনসংখ্যা। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আমাদের কোন অর্জনই কাজে আসবে না। তিনি চীনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, চীন এক সন্তাননীতি গ্রহণ করে এখন বিশ্বের ১ নম্বর দেশ হতে যাচ্ছে। আর আমরা! অনেক পিছিয়ে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৫ কোটি ৭০ লাখ। নগররাষ্ট্র বাদ দিলে বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে  ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে এক হাজার ১৫ জন মানুষ বাস করে। বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৩৭ ভাগ।

বিশেষজ্ঞরা  মনে করেন, সম্পদের তুলনায় অধিক জনসংখ্যা বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে বড় বাধা। অবস্থা: বয়স ১৮ বছর হওয়ার আগে বাংলাদেশে ৬৪ ভাগ নারীর  বিয়ে হয়। গ্রামে এই হার ৭১ এবং শহরে ৫৪ ভাগ। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ও বেসরকারি  প্রতিষ্ঠান প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের এক জাতীয় জরিপে এ তথ্য পাওয়া গেছে। ‘চাইল্ড ম্যারেজ ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে প্রকাশিত ওই জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে শিক্ষার সঙ্গে বাল্যবিবাহের সম্পর্ক আছে। ১৮ বছরের কম বয়সে বিয়ে হওয়া নারীদের ৮৬ ভাগ নিরক্ষর।  এই পরিস্থিতিতেও খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম  বলেছেন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ দুটি সন্তান গ্রহণ বাধ্যতামূলক করে আইন করার পরিকল্পনা সরকারের নেই। গত ২রা এপ্রিল জাতীয় সংসদে হাবিবুর রহমান মোল্লার উত্থাপিত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের শিক্ষক রবিউল হক মানবজমিনকে বলেন, সরকার হয়তো ভাবছে জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করবে। হয়তো সরকারেরর কাছে সেই পরিকল্পনা আছে।  কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এত সহজে তা সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের চেয়েও জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা। রবিউল হক বলেন, এ জন্য আমাদের অনেক লোক দেশের বাইরে পাঠাতে হবে। দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেশি হয়ে যাচ্ছে। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত ছাত্রছাত্রী প্রয়োজন। প্রয়োজন তাদের উন্নত প্রশিক্ষণ। যেন তারা বাইরের দুনিয়ায় দক্ষ জনবল হতে পারে।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026