মাসের পর মাস কেটে গেলেও বিমা কোম্পানিতে বন্ধ হয়নি গ্রাহকের টাকায় কেনা বিলাসী গাড়ির ব্যবহার। উল্টো ২১ মাস পরে নতুন মূল্য নির্ধারণ করে অব্যাহত রাখা হয়েছে বিলাসী গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ। সম্প্রতি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এক নির্দেশনায় এ সুযোগ করে দিয়েছে।
আইডিআরএ’র নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে বিমা কোম্পানির চেয়ারম্যান ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ৮৫ লাখ টাকার গাড়ি ব্যবহার করতে পারবেন। আগে এই বিমাব্যক্তিদের জন্য সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা দামের গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছিলো। আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান এম শেফাক আহমেদ গাড়ির নতুন মূল্য নির্ধারণের বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেন।
তিনি বলেন, আগে বিমা কোম্পানির চেয়ারম্যান ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার জন্য কোম্পানির টাকায় সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা দামের গাড়ি ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো। তবে অনেকে এ মূল্যসীমা বাড়ানোর দাবি করেন। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে কোম্পানির টাকায় ৮৫ লাখ টাকা দামের গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ দেওযা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কোম্পানির টাকায় চেয়ারম্যান ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার জন্য সর্বোচ্চ ৮৫ লাখ টাকা দিয়ে শুধু জিপ গাড়ি কেনা যাবে। তবে তারা প্রাইভেট কার ব্যবহার করলে গাড়ির মূল্য বাবদ সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকা ব্যয় করা যাবে।
গাড়ির নতুন মূল্য নির্ধারণ সংক্রান্ত নির্দেশনাটিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি বিমা কোম্পানিগুলোতে যানবাহন ক্রয়/ব্যবহারে পরিমিতি বোধের অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতে পলিসিহোল্ডার ও শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তাই বৃহত্তর স্বার্থে গাড়ি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নতুন নির্দেশনা জারি করা হলো। এর মাধ্যমে এ সংক্রান্ত আগের সব আদেশ বাতিল হবে বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালনা পর্ষদ থেকে শুধু চেয়ারম্যান কোম্পানি থেকে একটি মোটরযান সুবিধা পাবেন। পরিচালনা পর্ষাদের অন্য কোনো সদস্য মোটরযান সুবিধা পাবেন না।
চেয়ারম্যানের জন্য জিপ গাড়ি ৮৫ লাখ টাকা ও প্রাইভেট কার ৪৫ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ে বিমা কোম্পানির টাকায় কেনা যাবে না। মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা চেয়ারম্যানের মতো মোটরযান সুবিধা পাবেন। উভয়ের গাড়ি কমপক্ষে পাঁচ বছর ব্যবহারের পর প্রতিস্থাপন করা যাবে। এছাড়া প্রধান কার্যালয়ের পুলে সর্বোচ্চ চারটি মোটরযান রাখা যাবে। পুলের জন্য কেনা গাড়ির সর্বোচ্চ দাম হবে ২৫ লাখ টাকা। কোম্পানির টাকায় কেনা এসব গাড়ির সংখ্যার প্রবৃদ্ধি জনবল ও অফিস অথবা শাখা সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, শেয়ারহোল্ডারদের অবগতির জন্য বার্ষিক সাধারণ সভায় পরিচালকদের প্রতিবেদনে গাড়ির সংখ্যা ও মোট মূল্য উল্লেখ করতে হবে। এছাড়া কোম্পানির মোটরযান ব্যবহার ও পরিচালন ব্যয়ের তথ্য ষান্মাসিকভাবে পরিচালনা পর্ষদ সভায় উপস্থাপন করতে হবে। আইডিআরএ সূত্রে জানা গেছে, বিমা কোম্পানির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যবহৃত গাড়ির মূল্য নির্ধারণ সংক্রান্ত প্রথম নির্দেশনা দেওয়া হয় ২০১২ সালের ২৪ জুলাই।
এর আগে একই বছরের ৭ জুন এক নির্দেশনায় বিমা কোম্পানির চেয়ারম্যান, উদ্যোক্তা পরিচালক, স্পন্সর পরিচালক, উপদেষ্টা, কনসালট্যান্টের গাড়ির পাশাপাশি ঢাকাস্থ প্রধান কার্যালয় ও ঢাকার বাইরের অফিসে ব্যবহৃত গাড়ির বিস্তারিত তথ্য চায় আইডিআরএ। নির্দেশনা অনুসারে কোম্পানির পাঠানো তথ্যে দেখা যায়, ফারইস্ট ইসলামি লাইফের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ব্যবহার করেন টয়োটা প্রাডো, যার দাম এক কোটি ৫৬ লাখ টাকা। কোম্পানির পরিবহন পুলে গাড়ি রয়েছে ১৬৮টি।
ন্যাশনাল লাইফের চেয়ারম্যান আলহাজ মোরশেদ আলম ব্যবহার করেন ৮৬ লাখ টাকা দামের মিতসুবিশি পাজেরো। কোম্পানিটির রয়েছে ১৮৯টি গাড়ি। ঢাকা ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান মো. হাসানের গাড়ি টয়োটা ক্রাউন। এর দাম ৯৫ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। সান লাইফের চেয়ারম্যান জাহিদ মালিক ব্যবহার করেন ৪২ লাখ ৬৮ হাজার টাকা দামের গাড়ি। সন্ধানী লাইফের পরিবহন পুলে রয়েছে ১৫৯টি গাড়ি। আর রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সাধারণ বিমা করপোরেশনের মোট ৬০টি গাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে পরিবহন পুলে আছে ৪০টি। বিমা কোম্পানিতে বিলাসী গাড়ির ব্যবহার নিয়ে ২০১৩ সালের ২৬ নভেম্বর ‘‘গ্রাহকের টাকায় বিলাসী গাড়ি, নীরব কর্তৃপক্ষ’’ শীর্ষক শিরোনামে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।