রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৯

তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী নয় রোহিঙ্গারা

তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী নয় রোহিঙ্গারা

সাজিদুল হক: বাংলাদেশে বসবাসরত মিয়ানমারের নাগরিকদের তালিকা করার সরকারি উদ্যোগে অংশ নিতে চায় না কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। তালিকা হলে তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হতে পারে বলে উদ্বেগ অবৈধভাবে বাংলাদেশে বসবাসরত এসব মানুষের। এ কারণে অনেকেই কক্সবাজার ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। আবার মিয়ানমারে গিয়ে আদম শুমারিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার চেষ্টাও করছেন অনেকে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, তালিকা করে রোহিঙ্গাদের প্রকৃত সংখ্যা জানার পরই তাদের বিষয়ে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে। গত ৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে অবস্থানরত মিয়ানমার শরণার্থী এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারী মিয়ানমার নাগরিকদের বিষয়ে জাতীয় কৌশলপত্র অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। ওই কৌশলপত্র অনুযায়ী অনুপ্রবেশকারী মিয়ানমারের শরণার্থীদের জরিপ করে তালিকা করা হবে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো রোহিঙ্গা গণনার প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে।

টেকনাফের শামলাপুরে অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসরত মো. রহিমুল্লাহ বলেন, রেজিস্টার্ড ক্যাম্পের মানুষরা কিছু সুবিধা পায়। আমরা সেটাও পাই না। শুনছি সরকার আমাদের তালিকা করবে। তালিকা করে যদি আমাদের আবার মিয়ানমারে পাঠায় তাহলে আমরা মারা পড়বো। ৩০ বছর বয়সী রহিমুল্লাহ জানান, মাত্র ১৮ বছর বয়সে বাংলাদেশে পাড়ি জমান। মিয়ানমারের নাগরিকদের তালিকায় তার নাম নেই। বাংলাদেশের তালিকা তৈরীর পর কি হবে সেটা নিয়ে আশঙ্কায় আছি।

একই কথা কক্সবাজার শহরের রিক্সাচালক জাফর উল্লাহর (৪৫)। ১৯৯৫ সালে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসেন তিনি। তালিকা করে সরকার আমাদের বের করে দিতে পারে। এ জন্য আমাদের অনেকে কক্সবাজার থেকে অন্য জেলায় চলে যাচ্ছে, বলেন জাফর। শামলাপুরে বসবাসকারী ষাটোর্ধ্ব আব্দুস শুক্কুর, কিশোর করিম আলীসহ (যার জন্ম বাংলাদেশে) আরো অনেকে একই কথা বলেন।

আব্দুস শুক্কুর বলেন, এখানে আমরা যারা থাকি, তাদের বেশিরভাগই জেলের কাজ করি। কোন রকমে কিছু আয় করি। নিজ দেশে থাকতে পারি নাই বলেই কক্সবাজার চলে এসেছি। এখন শুনছি সরকার আমাদের তালিকা করবে। তালিকা করে কি আমাদের কার্ড (নিবন্ধিত ক্যাম্পের রেশন কার্ড) দেবে? নাকি বার্মায় ফেরত পাঠাবে, এটা নিয়ে চিন্তায় আছি। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের (আরআরআরসি) তথ্য অনুযায়ী, কুতুপালং ও নয়াপাড়া শরণার্থী শিবিরে নিবন্ধিত ৩০ হাজারসহ দুই লাখের বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে।

এর বাইরে আরো প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছেন বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়ে থাকে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার ও ইউএনএইচসিআর শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা গণনার কাজ শুরু করেছে। গণনার পর এই সংখ্যা ৩৩ হাজারের মতো হতে পারে। সম্প্রতি মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত আদমশুমারিতেও রোহিঙ্গা মুসলিমদের রোহিঙ্গা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়নি।

রোহিঙ্গা গণনা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক বলেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদিত কৌশলপত্রের আলোকে পরিসংখ্যান বিভাগ রোহিঙ্গা গণনার জন্য প্রশ্নপত্র তৈরির কাজ শুরু করেছে। গণনার পর কী ধরণের পদক্ষেপ নেয়া হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত তাদের প্রকৃত সংখ্যা জানি না। প্রকৃত সংখ্যা জানার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

রোহিঙ্গা গণনা সম্পর্কে ইউএনএইচসিআর’র আবাসিক প্রতিনিধি স্টিনা লুংডেল এক লিখিত বক্তব্যে বলেন, অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের তালিকাকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এতে করে বাংলাদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পাবে সরকার। এই সনাক্তকরণ কার্যক্রম ভবিষ্যতের জন্য একটি টেকসই সমাধানেরও ভিত্তি স্থাপন করবে, যার প্রথমটি হলো অনুকূল পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন। যে কোনো মানবিক সহায়তা কর্মসূচি পরিকল্পনার জন্য রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ অত্যাবশ্যক। রোহিঙ্গা সংক্রান্ত কৌশলপত্র নিয়ে কিছু বিষয় নিশ্চিত করতে ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।

রাজনৈতিক ও জাতিগত সংঘাতের মুখে গত দুই দশক ধরে মিয়ানমারের ইসলাম ধর্মাবলম্বী রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢোকা শুরু হয়, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। অবৈধভাবে বসবাসরত রোহিঙ্গারা জনসংখ্যার ওপর চাপ তৈরির পাশাপাশি নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026