উৎপল রায়: তৃণমূল পর্যায়ে অন্তর্কোন্দলে পুড়ছে আওয়ামী লীগ। কোন্দল নিরসন ও দলকে গতিশীল করতে দফায় দফায় উদ্যোগ নেয়া হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব উদ্যোগ আলোর মুখ দেখছে না। সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ায় জেলায় জেলায় নেতারা জড়িয়ে পড়ছেন বিবাদে। ক্ষমতা, স্বার্থ এমনকি পদ-পদবি নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়াচ্ছেন নেতারা। সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, দলের নেতারা একে অন্যের সঙ্গে বিবাদে জড়ানোয় কর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে বিভক্তি ও অস্বস্তি।
সর্বশেষ উপজেলা নির্বাচন এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিভিন্ন এলাকায় এ সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। উপজেলা নির্বাচনে দলীয় কোন্দলের কারণে অনেক উপজেলায় দল সমর্থিত প্রার্থীদের হারতে হয়েছে বিরোধী পক্ষের প্রার্থীদের কাছে। তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় কার্যক্রম গতিশীল করতে এ পর্যন্ত কয়েক দফায় উদ্যোগ নেয়া হয় দলীয় ফোরামে। কেন্দ্রী কার্যনির্বাহী সংসদে এ নিয়ে সিদ্ধান্ত হয় বেশ কয়েকবার। সিদ্ধান্ত হয়, জেলা সম্মেলন শেষ করা এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের জেলা সফরের। কোন কোন সময় এ প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা বেশিদূর এগোয়নি।
গত ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর নতুন করে দল গোছানোর প্রক্রিয়ার কথা বলা হলেও এ পর্যন্ত দৃশ্যত কোন উদ্যোগ দেখা যায়নি। যদিও দলের নেতারা দাবি করছেন, সাংগঠনিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চলছে। আর বড় দল হিসেবে কিছুটা কোন্দল থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, আওয়ামী লীগ একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল। এই দলে কখনও কখনও সুযোগ সন্ধানী লোক এসে ভিড়ে। তারাই দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কাজ করে। এদের বিষয়ে হাইকমান্ড যথেষ্ট সতর্ক আছে। যখন যেখানে কোন ঘটনা ঘটে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়া হয়। তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিরসনে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় সম্মেলনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দ্রুতই তা বাস্তবায়ন করা হবে।
দলীয় সূত্র জানায়, অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে সম্প্রতি দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে মারামারি ও খোনাখুনির ঘটনাও ঘটছে অহরহ। যারা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে শক্ত সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নেয়ায় এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে বলেও মনে করছেন দলের নেতাকর্মীরা। তৃণমূল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণেই নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা, ফেনীর একরাম হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় দলীয় হাইকমান্ডও বিব্রত। শুধু আলোচিত ঘটনাই নয়। এ ধরনের ঘটনা ঘটছে অহরহ।
গত ১৪ই জুলাই ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনেই নির্মমভাবে নিহত হন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাইমুল ইসলাম রিয়াদ (২৩)। ২৩শে জুলাই চট্টগ্রাম মহানগরীর শেরশাহ চন্দ্রনগর ঢেবারপার এলাকায় যুবলীগের আলাউদ্দিন গ্রুপ ও আনোয়ার গ্রুপের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনায় মিরাজউদ্দিন নামে ১ জন নিহত হয়। আহত হয় অন্তত ১০ জন। ১৯শে জুলাই চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদার দর্শনায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানির জেনারেটর বহনের টেন্ডার নিয়ে দর্শনা পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মতিয়ার রহমান ও স্থনীয় এমপি আলী আজগর টগর গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে ১৫ জন আহত হয়। ২৬শে জুলাই চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে চোরাই মোটরসাইকেল নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে সংঘর্ষে লিপ্ত হন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা।
এতে মোহাম্মদ সুমন নামে এক যুবলীগ কর্মী গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয় ৬ ছাত্রলীগ কর্মীকে। ১৯শে জুলাই চট্টগ্রামের চন্দনাইশে গাছবাড়িয়া চৌধুরী মার্কেটে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে আহত হন ১০ জন। ১৪ই জুলাই আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ফেনীর ছাগলনাইয়ার ঘোপালে মুহুরিগঞ্জ বাজার থেকে আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিনকে ধরে নিয়ে কুপিয়ে ও গুলি করে আহত করে নিজ দলীয় নেতাকর্মীরা। ১৩ ও ১৪ই জুলাই ফরিদপুরের সালথায় আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের দফায় দফায় সংঘর্ষে অন্তত ৫০ জন আহত হয়। জানা গেছে, সালথার সোনাপুরে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সালথা উপজেলা যুবলীগের সভাপতি খায়রুজ্জমান বাবু ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য জাফর মোল্লার মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে দ্বন্দ্বের জের ধরে প্রতিনিয়ত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। ৩০শে জুলাই ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে বালুমহালকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের মধ্য রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ৫ জন গুরুতর আহত হয়। বিগত ১৯শে জুন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা এনামুল হক শামীমকে ধানমন্ডিতে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করে সন্ত্রাসীরা। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জের ধরেই এ ঘটনা ঘটেছে। ৯ই জুলাই ভোরে চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে লোহাগাড়া আওয়ামী লীগের দু’পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে বৃদ্ধ ও মহিলাসহ ২০ জন গুলিবিদ্ধ হন। গুলিবিদ্ধ ১৫ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
স্থানীয় আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে চলা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও পুরনো বিরোধকে কেন্দ্র করে বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ইউছুফ অ্যান্ড সন্স পেট্রল পাম্পের সামনে উভয় পক্ষের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের সময় দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের উপ-প্রচার সম্পাদক নুরুল আবছার চৌধুরীর লোকজন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন হিরুর বাড়িতে প্রবেশ করে পাঁচ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। ময়মনসিংহের গৌরিপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও একই জেলার মুমিনুন্নেসা সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ফরিদউদ্দিন আহমেদকে ২২শে জুন গৌরিপুর কলতাপাড়া এলাকায় মারধর ও দিগম্বর করে গৌরিপুরের সরকারি দলীয় এমপি ক্যাপ্টেন (অব.) মজিবুর রহমান ফকিরের অনুসারীরা। দীর্ঘদিন ধরে চলা স্থানীয় আওয়ামী লীগের কোন্দল ও দ্বন্দ্বের জেরে এ ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে স্থানীয় এমপি ক্যাপ্টেন (অব.) মজিবুর রহমান ফকির প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। ফরিদউদ্দিন আহমেদকে দিগম্বর করার ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়ে ময়মনসিংহ ও গৌরিপুর আওয়ামী লীগের একটি অংশ এবং প্রগতিশীল সমাজ। এতে তোলপাড় শুরু হয় সারা দেশে। গৌরিপুর উপজেলার গাজীপুর বাজারে ৫ই জুলাই রাতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক সামীউল আলম ও মোর্শেদুজ্জামান সেলিমের ওপর হামলা করে উপজেলা আওয়ামী লীগের একটি অংশ। হামলাকারীরা তাদের বহনকারী গাড়ি ভাঙচুর করে ও দুটি মোটরসাইকেল আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। হামলার জন্য স্থানীয় সাংসদ মজিবুর রহমান ফকিরকে অভিযুক্ত করে এদিন রাতেই গৌরিপুর থানায় অভিযোগ করেন সামীউল আলম।
২৮শে জুন চাঁদপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ৪ জন গুরুতর আহত হন। দীর্ঘদিন ধরে কমিটি গঠন নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে এ ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ওই দিন চাঁদপুর শহরের নতুন বাজার পুরান বাজার সেতুর কাছে স্বেচ্ছাসেবক লীগের বিদ্রোহী একটি গ্রুপ অপর গ্রুপের ওপর হামলা চালায়। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ৪ জন আহত হন। ১লা জুলাই সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন যানবাহনে চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সাভার পৌর যুবলীগ ও হকার্স লীগের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন। ওই দিন সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে পৌর হকার্স লীগ অফিসে দলীয় নেতাকর্মীরা আলোচনা করার সময় থানা যুবলীগের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা করলে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় উভয় পক্ষ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে এলাকায় ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। জানা গেছে, চাঁদাবাজি, টেন্ডার ও সরকারি প্রকল্পের বিভিন্ন বরাদ্দ নিয়ে সাভার আওয়ামী লীগের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো দলীয় কোন্দলে জড়িয়ে পড়ে একে অপরকে দেখে নেয়ার হুমকি দিচ্ছে। সমপ্রতি বগুড়ার কাহালুতে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের ডিও কেনা নিয়ে কাহালু উপজেলা আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় ককটেল বিস্ফোরণ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। গত ৩রা জুন মুন্সীগঞ্জ জেলা জজ আদালত পাড়ায় আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপে সংঘর্ষে অন্তত ১০ নেতাকর্মী আহত হন। ওই দিন গজারিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত গজারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান রেফায়েতউল্লা খান সমর্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে এ সংঘর্ষ বাধে। ৬ই জুলাই গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনায় ১০ জন আহত হন। ওই দিন কাশিয়ানী উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তুহিনের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে মিছিল বের করেন তার সমর্থকরা। এ সময় ছাত্রলীগের অন্য আরেকটি গ্রুপ তাদের ওপর হামলা করলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের গ্রুপিং ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। ফরিদপুরের সালথা উপজেলা যুবলীগ সভাপতি খায়রুজ্জামান বাবু ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য জাফর মোল্লার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা দ্বন্দ্বের জের ধরে ১৪ ও ১৫ই জুলাই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন গুরুতর আহত হন। টেন্ডার দাখিল নিয়ে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলা স্থানীয় সাংসদের ভাই টোকেন চৌধুরী ও ভাতিজা লোটন চৌধুরী গ্রুপের সঙ্গে দৌলতপুর উপেজলা আওয়ামী লীগের নেতা সরদার আতিয়ারের মধ্যে ১৪ই জুলাই সংঘর্ষে উভয় গ্রুপের ১০ জন আহত হন।