প্রায় ২২ ঘণ্টা ঢাকায় কাটিয়ে গেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। গতকাল দুপুরের আগেই কলম্বোর উদ্দেশে ঢাকা ছেড়ে গেছেন তিনি। ওই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, সংসদের বিরোধী দলের নেতা ও রাজপথের বিরোধী জোটের নেত্রীসহ সরকার ও বিরোধী দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় হয়েছে তার।
সেখানে তাদের কথা শুনেছেন, বাংলাদেশকে ঘিরে জাপান সরকারের ভাবনার কথাও জানিয়েছেন। এখানে টোকিও’র বিনিয়োগকারীরা আরও বিনিয়োগ করতে চায় জানিয়ে দেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের তাগিদ দিয়ে গেছেন ১৪ বছর পর ঢাকা সফরে আসা জাপানি প্রধানমন্ত্রী। ঢাকা ছাড়ার আগে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট পরিদর্শন করেন আবে। মাত্র ২০ মিনিট সেখানে অবস্থান করলেও ওই সময়টি তিনি উপভোগ করেছেন বেশ।
বিশেষ করে তার জন্য তৈরী শোলা শিল্পের কারিগ মালাটি পাওয়ার পর রীতিমতো উচ্ছ্বসিত ছিলেন। গাড়িতে ওঠা পর্যন্ত মালাটি তার গলায় শোভা পায়। অবশ্য চারুকলার শিক্ষার্থী ও উদীয়মান শিল্পীদের সঙ্গেও ভাল সময় কাটিয়েছেন তিনি। নিজে ফটোগ্রাফার ডেকে ছবিও তুলে নিয়ে গেছেন। ঢাকা সফর শেষ করে শ্রীলঙ্কা সফরের আনুষ্ঠানিকতা গতকালই শুরু করে দিয়েছেন শিনজো আবে। এক ট্রিপে দুই দেশ সফরের টার্গেট নিয়েই টোকিও ছেড়েছিলেন দু’দিন আগে। ঢাকার পর কলম্বো- সাজানো শিডিউল মতেই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করছেন।
গত মে মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টোকিও সফর করেছিলেন। তার আমন্ত্রণে ওই সফরের ফিরতি সফর হিসেবে এখানে এসেছিলেন তিনি। ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে টোকিওকে বেছে নিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেসহ দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। দেশের বেশ ক’টি মেগা প্রকল্পে জাপানি সহায়তার প্রতিশ্রুতিও আদায় করেছিলেন। সেদিন বাংলাদেশের তরফে বলা হয়েছিল ‘আবে ঢাকায় এলে সুখবর পাবেন।’ বাংলাদেশ তার কথা রেখেছে।
জাপানের সমর্থনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য পদে বাংলাদেশের তার মনোনয়ন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন। কেবল তাই নয়, বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট (বিগ বি)সহ জাপান যা চেয়েছে তার সবটুকুতে হ্যাঁ বলে তাদের প্রত্যাশার ষোলকলা পূর্ণ করার চেষ্টা করেছে বাংলাদেশের নেতৃত্ব। বিনিময়ে প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের জনগণের প্রতি জাপানের গভীর কৃতজ্ঞতা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে গেছেন সফর করে যাওয়া দেশটির প্রধানমন্ত্রী।
আগামী দিনে দু’দেশের সম্পর্ক কমিপ্রহেনসিভ পার্টনারশিপ বা সমন্বিত অংশীদারিত্বে পৌঁছার আকাঙক্ষাও প্রকাশ করে গেছেন- এমনটাই দাবি হাই প্রোফাইল ওই সফর বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত পেশাদার কূটনীতিকদের। সফরে বাংলাদেশের বিনিয়োগ ও লাভ-লোকসানের হিসাব কষা শুরু করেছেন তারা। অবশ্য এটি স্বপ্রণোদিত হয়ে নয়, গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেন এমন লোকজনের ফোনকলের কারণে একটু তাড়াতাড়ি হিসাব-কিতাব শুরু হয়ে গেছে বলে দাবি এক কর্মকর্তার।
গতকাল সন্ধ্যায় মানবজমিনের সঙ্গে আলাপে ওই কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ আপাতত কিছু ছাড় দিয়েছে, তবে এটি বন্ধুত্বের জন্য। এটি বিনিয়োগও হতে পারে। জাপান আগেই উন্নয়ন সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছিল। সেটি এবার পুনর্ব্যক্ত করেছে। চীন কিংবা অন্য প্রভাবশালীদের বিরাগভাজন না হয়ে বাংলাদেশ কিভাবে জাপানের ওই উন্নয়ন সহায়তা কাজে লাগাতে পারে সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন ওই কর্মকর্তা। ঢাকায় অবস্থানরত জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেনও তাই মনে করেন। তার মতে বল এখন পুরোপুরি বাংলাদেশের কোর্টে। স্মার্টভাবে পাস করতে পারলে সুফল পাওয়া যাবে।
বন্ধুত্ব এগিয়ে নেয়ার বার্তা দিয়ে গেলেন আবে: জাপানের সঙ্গে বন্ধুত্ব বাংলাদেশের জন্মের সময় থেকে। সেটি এগিয়ে নেয়ার বার্তা দিয়ে গতকাল পৌনে ১১টার দিকে দুই দিনের সফর শেষ করে ঢাকা ছাড়েন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে বিদায় জানান। এ সময় জাপানের রাষ্ট্রদূত সিরো সাদোশিমা বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন। একটি বিশেষ বিমানে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফর সঙ্গীরা বিমানবন্দর ছেড়ে যান। শনিবার দুপুরে সস্ত্রীক ঢাকায় আসেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। তার সঙ্গে ১৬৮ জনের একটি প্রতিনিধি দল ছিল।
ঢাবির চারুকলা অনুষদে কিছুক্ষণ: ঢাকা ছাড়ার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে ঢুঁ দিয়ে গেলেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় সস্ত্রীক বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছানোর পর লাল গালিচায় হেঁটে চারুকলা অনুষদে প্রবেশ করেন। তাকে স্বাগত জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। জাপানি প্রধানমন্ত্রী চারুকলার দুটি গ্যালারিতে প্রদর্শিত বিভিন্ন শিল্পকর্ম ঘুরে দেখেন। এর মধ্যে একটিতে ছিল জাপানের বৃত্তিপ্রাপ্ত বাংলাদেশী শিল্পীদের চিত্রকর্ম; অন্যটিতে চারুকলার জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের শিল্পকর্ম। এসব শিল্পকর্মে বাংলাদেশের বিভিন্ন লোকজ ঐতিহ্য তুলে ধরা হয় বলে জানান উপাচার্য আরেফিন সিদ্দিক।
তিনি বলেন, বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে নয়, শিল্প-সংস্কৃতিতে আগ্রহ থেকেই চারুকলা অনুষদে জাপানি প্রধানমন্ত্রীর এই আগমন। ‘জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিল্পকলা অনেক পছন্দ করেন। তার বিশেষ আগ্রহের কারণেই এই পরিদর্শনের আয়োজন করা হয়েছে।‘ মাত্র ২০ মিনিটের এই পরিদর্শনের এক ফাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে সম্মানসূচক ক্রেস্ট এবং চারুকলা অনুষদের পক্ষ থেকে একটি চিত্রকর্ম উপহার দেয়া হয়। অন্যদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য সহিদ আখতার হুসাইন (প্রশাসন) ও নাসরিন আহমেদ (শিক্ষা), কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক কামাল উদ্দিন, চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আবুল বারক আলভী এ সময় উপস্থিত ছিলেন।