নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশ এবং এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশ থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) গৃহস্থালির কাজে যাওয়া অভিবাসী নারী কর্মীদের নিদারুণ যন্ত্রণায় দিন কাটাতে হচ্ছে। নিয়ত মারধর, নিপীড়ন ও ভয়াবহ শোষণ-বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন গৃহকর্মীরা।
বিনা বেতনে বা স্বল্প পারিশ্রমিকে অমানুষিক পরিশ্রম করতে বাধ্য করা হচ্ছে তাদের। বেতন না পাওয়া, বিশ্রামের সময় বা বিরতি না পাওয়া, নিয়োগকর্তার বাড়িতে আটকে থাকা, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং দিনে ২১ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করার গুরুতর অভিযোগ করেছেন বহু গৃহকর্মী। তাদের খেতে দেয়া হয় না। শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয় ও এমনকি যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) ৭৯ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে নির্যাতিত ও বঞ্চিত এসব শ্রমিকদের মানবেতর পরিস্থিতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। “‘আই অলরেডি বট ইউ’: অ্যাবিউজ অ্যান্ড এক্সপ্লয়টেশন অব ফিমেইল মাইগ্র্যান্ট ডমেস্টিক ওয়ার্কাস ইন দ্য ইউনাইটেড অ্যারাব এমিরেইটস” শিরোনামে এইচআরডব্লিউ’র ওয়েবসাইটে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। এইচআরডব্লিউ’র কাছে দেয়া সাক্ষাৎকারে অনেক গৃহকর্মী বলেছেন, পশুর সঙ্গে যে ব্যবহার করা হয়, তাদের সঙ্গে সেই একই আচরণ করেন নিয়োগকর্তারা।
তাদের নোংরা ও অস্পৃশ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাদের জোরপূর্বক কাজে বাধ্য করা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের পাচার পর্যন্ত করা হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় (আইএলও) প্রভাবশালী ভূমিকা রাখতে চলেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। তার আগে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করলো এইচআরডব্লিউ। গৃহস্থালিতে কাজের জন্য বহু নারী শ্রমিক দেশটিতে পাড়ি জমায়। তাদের বেশির ভাগই ফিলিপাইনের নাগরিক। কিন্তু, নারী শ্রমিকদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা বা নিরাপত্তা নিশ্চিতেও ব্যর্থ সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ।
রিক্রুটিং এজেন্সির কর্মকর্তা, কর্মচারী ও নিয়োগদাতাদের কাছে নানাভাবে হয়রানি, নির্যাতন, শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হতে হয় তাদের। এ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ‘কাফালা’ নামে পরিচিত ইউএই’র ভিসা স্পন্সরশিপ ব্যবস্থা ও দেশটির শ্রম আইনে শ্রমিকদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে যে ঘাটতি ও ফাঁক রয়েছে, তা কিভাবে গৃহস্থালির কাজ নিয়ে যাওয়া অভিবাসীদের হয়রানি ও নির্যাতনের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে গৃহকর্মী হিসেবে যারা দেশটিতে যান, চুক্তির মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ও নিয়োগদাতাদের অনুমতি ব্যতিরেকে তারা নতুন কোন কাজে বা চাকরিতে যোগদান করতে পারেন না।
যে দেশগুলো বিদেশে শ্রমিক পাঠায়, তারাও প্রতারণামূলক নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে নিজ দেশের শ্রমিকদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়া ও বিদেশে শোষণের শিকার নাগরিকদের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়ার বিষয়গুলো নিশ্চিত করে না। প্রতিবেদনটি তৈরিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত ৯৯ অভিবাসী গৃহকর্মীর সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। নিয়োগকারী সংস্থা, আইনজীবী ও অন্যদের সাক্ষাৎকারও নেয়া হয়। এইচআরডব্লিউ’র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের নারী অধিকার বিষয়ক গবেষক রোথনা বেগম বলেন, শ্রম আইনে গৃহকর্মীদের নিরাপত্তার কোন বিধান না থাকায় নিয়োগকারীরা এই নারীদের দিয়ে অতিরিক্ত কাজ করিয়ে নিতে, স্বল্প পারিশ্রমিক দিতে ও শোষণ করতে পারেন এবং তা অনেকেই করেন। জানুয়ারি, এপ্রিল ও আগস্ট মাসে তথ্য সংগ্রহ, বৈঠকে বসা ও অনুসন্ধানে প্রাপ্ত ফলাফল পেশের জন্য ইউএই’র ১৫টি মন্ত্রণালয় ও কমিটির কাছে চিঠি পাঠিয়েছে এইচআরডব্লিউ।
কিন্তু, তাদের কাছ থেকে এ ব্যাপারে কোন উত্তর পাওয়া যায়নি। গত সেপ্টেম্বরে সংক্ষিপ্ত এক বৈঠক হয় ইউএই সরকার ও এইচআরডব্লিউ’র প্রতিনিধিবর্গের মধ্যে। কিন্তু, সেখানে গৃহকর্মী ইস্যু নিয়ে কোন আলোচনা হয়নি। এক নারী গৃহকর্মী বলছিলেন, কাজ শুরুর দুই সপ্তাহ পর থেকেই আমার গৃহকর্ত্রী আমাকে মারধর শুরু করেন। তিনি আমার বুকে ঘুষি মারেন। তিনি আমার ঘাড়ে তার নখ বসিয়ে দেন এবং আমার মুখম-লে চড় মারেন। আমার ঘাড়ে কালশিরে দাগ পড়ে যায়। কখনও কখনও আমার চুলের মুঠি ধরে তিনি আমাকে টানতেন।
এভাবেই তিনি সেখানে দিনের পর দিন কাজ করে যান। কিন্তু, কখনও তাকে পারিশ্রমিক দেয়া হয়নি। বাংলাদেশ, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ইথিওপিয়ার কমপক্ষে ১ লাখ ৪৬ হাজার অভিবাসী গৃহকর্মী সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন বাসা-বাড়ি বা গৃহস্থালিতে কাজ করছেন। সম্প্রতি কয়েকটি দেশ ইউএই’তে গৃহকর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ফিলিপাইন কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কঠোর নীতি অনুসরণ করে।
ইউএই’তে কর্মী নিয়োগের আগে নূন্যতম বেতন ও কর্মপরিবেশ বিবেচনায় রেখেই গৃহকর্মীদের ইউএইতে পাঠায় ফিলিপাইন। নিয়োগ সংস্থাগুলোর কাছে সহযোগিতা চাইতে গেলে উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয়েছে তাদের। কেউ কেউ বললেন তাদের আগের বাড়িতেই কাজ করতে যেতে বাধ্য করা হয়েছে বা নতুন কোন বাড়িতে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক কাজে পাঠানো হয়েছে, সংস্থাগুলোর ভবনে আটকে রাখা হয়েছে কোন কোন কর্মীকে।
তাদের খেতে দেয়া হয়নি এবং সাহায্য চাইলেই তাদের মারধর করা হয়েছে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া ও নিয়োগদাতার অনুমতি ছাড়া বাড়ি ছেড়ে বের হওয়ায়, ফেরারি হিসেবে গৃহকর্মীর বিরুদ্ধে পাল্টা-অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা কখনও কখনও তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেছে, কখনও কখনও তাদের আগের বাড়িতে কাজে ফিরে যেতে উৎসাহিত করেছে।