মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫৭

২০১৫তে ব্রিটেনের বুকে লাল সবুজের পতাকা যারা উড়াবেন

২০১৫তে ব্রিটেনের বুকে লাল সবুজের পতাকা যারা উড়াবেন

সৈয়দ শাহ সেলিম আহমেদ:  ২০১৫ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত হবে ব্রিটেনের পার্লামেন্ট নির্বাচন। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন ক্ষমতাসীন টোরি পার্টি নানা পরিকল্পনা আর পলিসির ঝুলি নিয়ে জনগণের দুয়ারে হানা দিচ্ছে, ঠিক একই ভাবে বিরোধী লেবার পার্টিও নিজেদের নানা পরিকল্পনার কথা জনগণকে জানান দিচ্ছেন, বসে নেই ক্ষমতার আরো এক অংশীদার লিবডেমও।
এই তিন দল এখন মরিয়া আগামীর নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসীনের জন্য, সেজন্য বিশ্বখ্যাত নির্বাচনী মাস্টার মাইন্ড এক্সেল রড, জিম ম্যাসিনা, লিনটন ক্রসবীর মতো এডভাইজরদের মোটা অংকের বিনিময়ে হায়ার করে ব্রিটেনে নিয়ে এসেছেন।ব্রিটেন হলো বহু বর্ণের মিশ্রণে এক সমাজ, যেখানে প্রতিটি দেশের নানান বর্ণ আর মিশ্রণের মানুষ একত্রিত হয়ে বাস করলেও রাজনৈতিক মতাদর্শে ভিন্ন ভিন্ন মত ও পথের সমর্থক। অন্যান্য সকল কমিউনিটির মতোই বাংলাদেশী কমিউনিটির অবস্থান অন্য যেকোন সময়ের তুলনায় এখন অনেক শক্ত এক ভিতের উপর দাঁড়িয়ে।
এখনকার বাঙালিদের এক বৃহৎ অংশই ব্রিটেনের মূলধারার রাজনীতি, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, আইন ও বিচার ব্যবস্থা, সংস্কৃতি, সমাজনীতির সাথে মিলে মিশে ব্রিটিশ রাজনীতি, অর্থনীতি ও সোসাইটিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছেন।যার প্রমাণ আমরা পাই, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাঙালিদের পদচারণায় ব্রিটিশ মূলধারার রাজনীতিতে অভিষিক্ত হওয়ার মধ্যদিয়ে যখন এক ঝলক আলোকবর্তিকা দেখা দেয়, তখনি ব্রিটিশ সোসাইটির সবচাইতে প্রভাবশালী দ্য টাইমস আর লন্ডন ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড তাদের সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করে বসে, অদূর ভবিষ্যতে ব্রিটেন হয়তো একজন কালোদের মধ্য হতে প্রধানমন্ত্রী পেয়েও যেতে পারে।

স্মরণ রাখা দরকার ২০১৫ সালে ব্রিটেনের পার্লামেন্ট নির্বাচন। কিন্তু এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে নির্বাচনী তোড়জোড়। প্রধান দুই পার্টি লেবার ও ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ এবং মধ্যপন্থী লিবডেম তাদের প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্ত করছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্টের প্রার্থী মনোনয়ন পেতে অনেক কাট-খড় পোড়াতে হয়। প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থীকে যেমন তৃনমূলের পার্টির সক্রিয় কর্মীর, ক্যাম্পেইনার, লিফলেট বিতরণ, ডোর টু ডোর ক্যাম্পেইন, টেলিফোন ক্যাম্পেইন ইত্যাদি নানান কর্মসূচীর সাথে বছরের পর বছর সক্রিয় থাকার প্রমাণ ও তথ্য, যাচাই,বাছাই, সরেজমিনে থাকার প্রমাণ থাকা চাই, তেমনি পার্টির ইলেক্টোরাল ভোটারদের ভোট ছাড়াও পার্টির সিলেকশন বোর্ডের কাছে নানান পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়।

একজন প্রার্থীর বহুমুখী প্রতিভার ও ক্যালিবারের যোগ্যতা যথাযথভাবে যাচাই এবং ব্রিটেনের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পলিটিক্স, ফরেন পলিসি, ইত্যাদি নিয়ে জ্ঞানের পরীক্ষায় যখন উত্তীর্ণ হন কেবলই তিনি মনোনয়নের চূড়ান্ত টিকেট লাভ করতে পারেন। এখানে প্রার্থী মনোনয়নের জন্য টাকার আর পেশী শক্তির কিংবা কোন ধরনের সুপারিশের অথবা পার্টির প্রধানের কাছের বা আস্থাভাজনের  কোন দাম বা কোন খেলার স্থান নেই।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আমাদের রোশনারা আলী অনেক আগেই নাম লিখিয়েছেন এবং বেশ সুনামের সাথেই তিনি কাজ করে চলেছেন। রোশনারার পথ ধরেই এবার ব্রিটেনের সাধারণ নির্বাচনে টিউলিপ সিদ্দিকী, ডঃ রূপা হক, মিনা রহমান, ব্যারিস্টার আনোয়ার বাবুল মিয়া, ফয়সল চৌধুরী এমবিই চূড়ান্তভাবে মনোনয়ন লাভ করেছেন।আমরা শুরুতেই দেখে নেই এই ৬ প্রার্থী সম্পর্কে মূলধারার দলগুলোর নিজস্ব তথ্য বিবরণীতে সংক্ষেপে কি বলা আছে, হুবহু সরকারি রেকর্ড থেকে আমার নিজের ভাষায় তা তুলে ধরলাম পাঠকদের সুবিধার্থে।

টিউলিপ সিদ্দিকী- লেবার পার্টির ৯শ সদস্যদের ভোটাভুটিতে ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে লন্ডনের হ্যাম্পষ্ট্যাড এন্ড কিলবার্ণ এলাকা থেকে বঙ্গবন্ধুর নাতনী, শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিকী মনোনয়ন লাভ করেন। ২০১০ সালে টিউলিপ প্রথম কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। বর্তমানে টিউলিপ সিদ্দিক ক্যামডেন বারার রিজেন্টস পার্ক ওয়ার্ডের কাউন্সিলার এবং তিনি  ক্যামডেন কাউন্সিলের কমিউনিটিজ এন্ড কালচারাল ক্যাবিনেট মেম্বার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

উচ্চ শিক্ষিতা  টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক দক্ষিণ- পশ্চিম লন্ডনের মেরটন কাউন্সিলের মিটচাম এলাকায় ১৯৮২ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহন করেন। তিনি বাংলাদেশ, ব্রুনেই, ভারত, সিঙ্গাপুর, স্পেনে বাল্যকাল কাটিয়েছেন। পশ্চিম লন্ডন থেকে ১৯৮৮ সালে তিনি উত্তর লন্ডনে চলে আসেন এবং এ-লেভেল সম্পন্ন করেন। টিউলিপ ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডন হতে ইংরেজি সাহিত্যের উপর আন্ডার গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রী এবং কিংস কলেজ অব লন্ডন হতে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন।২০১১ সালে তিনি পলিটিক্স, পলিসি এন্ড গভর্ণম্যান্টের উপর দ্বিতীয়বারের মতো মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন।

তিনি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ফিলিপ গ্লাউড এসোসিয়েশটস, সেভ দ্যা চিলড্রেন, বেথনাল গ্রিন এন্ড বো আসনের সাবেক লেবার এমপি ওনা কিং, টুটিং এলাকার লেবার এমপি ও সাবেক মন্ত্রী সাদেক খান, লেইটন ওয়ানস্টেড এলাকার সাবেক লেবার এমপি হেরী কোহেনের সঙ্গে কাজ করেছেন।

ডঃ রূপা হক- পুরো নাম রুপা আশা হক, পেশায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সোসিওলজির শিক্ষক। শিক্ষকতা করছেন লন্ডনের কিংস্টন ইউনিভার্সিটিতে একজন সিনিয়র লেকচারার হিসেবে। এর আগে তিনি ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করেছেন।পিএইচডি করেছেন কালচারাল স্টাডিজের উপর।রুপা নিয়মিত গার্ডিয়ান, দ্য স্টেটসম্যান, ট্রাইবুন, সহ নানা পত্রিকা ও জার্নালে কলাম লিখে থাকেন। তার বিখ্যাত বই বিয়ন্ড কালচার ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয়, যা ২০০৭ সালে ফিলিপস আব্রাহাম মেমোরিয়াল প্রাইজের জন্য শর্ট লিষ্টেড নির্বাচিত হয়।

রুপা হক ২০০৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে কনজারভেটিভের সেইফ সিট বাকিংহাম শায়ারের চিজহাম-আমেরশাম সিটে শেরিল গিলানের সাথে প্রতিদ্বন্ধিতা করে হেরে যান। ২০১০ সালে তিনি লন্ডন বারা অব ইলিং এর ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মেম্বার পদে প্রতিদ্বন্ধিতা করেন। আগামী ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে ইলিং সেন্ট্রাল ও একটন সংসদীয় আসন থেকে লেবার দলের পক্ষে পার্লামেন্টে প্রতিদ্বব্ধিতা করার জন্য পার্টির চূড়ান্ত মনোনয়ন লাভ করেছেন।রুপা হক সহ তারা তিন বোন। সকলেই কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তার বড় বোন নোরা হক একজন আর্কিট্যাক্ট। ছোট বোন কনি হক বিখ্যাত বিবিসি প্রোগ্রাম ব্লু পিটারের একজন জনপ্রিয় এংকর।

মিনা রহমান- একে খুব ছোট বেলা প্রায় ২১দিনের শিশু অবস্থায় বাবা মায়ের সাথে ব্রিটেনে আসেন। আদি জন্মস্থান সুনামগঞ্জের ছাতকের এক প্রত্যন্ত গ্রামে। ধীরে ধীরে ব্রিটেনের স্কুল জীবন শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নেন- প্রায় সংগ্রামী এক নারীর মতোই। একদিকে সংসার জীবন অন্যদিকে ছেলে মেয়েদের মানুষ করা, তার উপর নিজের লেখা পড়ার খরচ যোগানোর জন্য এনএইচএসের চাকুরী- এমন তেজোদীপ্ত স্বাবলম্বী এক বিদুষী বাঙালি রমণী, এভাবেই পড়া লেখার পাশা পাশি জড়িয়ে পড়েন কনজারভেটিভের রাজনীতির সাথে।

একমসময় ছিলেন কনজারভেটিভ দলের মুখপাত্রের মতো গুরুদায়িত্ব পালনের গৌরবের অধিকারী। বর্তমানে পূর্ব লন্ডনের একটি হাউজিং কোম্পানির ম্যানেজারের দায়িত্বে আছেন। লন্ডনের বার্কিং আসন থেকে আগামী ২০১৫ সালের নির্বাচনে তিনি কনজারভেটিভ দল থেকে প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। তিনি বিবাহিত ও ২ মেয়ে ও ২ ছেলের জননী। তার স্বামী সিলেটের বাসদ রাজনীতির অন্যতম পুরোধা গয়াছুর রহমান গয়াছ। মিনা রহমানের এই তথ্যে সহায়তা করেছেন তার মিডিয়া অফিসার মতিয়ার চৌধুরী।

ব্যারিস্টার আনোয়ার বাবুল মিয়া- লেবার দলের গত ৯ মার্চের বার্ষিক সভায় সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে ব্যারিস্টার আনোয়ার বাবুল মিয়াকে হ্যাটফিল্ড আসন থেকে আগামী ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে লড়ার জন্য মনোনয়ন দেয়া হয়।আনোয়ার বাবুল মিয়া পেশায় একজন আইনজীবী। গ্রেটার লন্ডনের গ্রেট জেমস ষ্ট্রীট চেম্বার্সের একজন নিয়মিত আইনজীবী। ইমিগ্র্যাশন ও মানবাধিকার আইনের উপর একজন বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে তিনি ব্রিটিশ বাংলাদেশী চেম্বার অব কমার্সের একজন ডিরেক্টর। এছাড়াও ব্রিটিশ বাংলাদেশী প্র্যাক্টিসিং ব্যারিস্টার এসোসিয়েশনেরও প্রেসিডেন্ট হিসেবে রয়েছেন। বিগত ২০১১ সালে ব্রিটিশ বাংলাদেশী হু`জ হো`র সেরা বাংলাদেশীদের তালিকায় ব্যারিস্টার আনোয়ার বাবুল অন্যদের সাথে নিজের আসন স্থান করে নিয়েছিলেন।

ফয়সল চৌধুরী এমবিই- এডিনবারার বাংলাদেশী উজ্জ্বল এক তরুণ ব্যবসায়ী ফয়সল চৌধুরী বর্তমানে এডিনবারা এবং লোথিয়ানা রেইস ইক্যুয়ালিটি কাউন্সিলের চেয়ারের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি পর পর তিনবার এই কাউন্সিলের চেয়ারের দায়িত্ব পেয়েছেন, ব্যক্তিগত ও পেশাগত কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ।ফয়সল চৌধুরী ২০০৪ সালে তার সামাজিক অর্থনৈতিক কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ কর্তৃক এমবিই খেতাব প্রাপ্ত হন।

এ ছাড়াও ব্রিটেনের প্রথম বাংলাদেশী কমিউনিটি চ্যানেল চ্যানেল এস কর্তৃক কমিউনিটি এওয়ার্ড পান ২০০৬ সালে।বাংলাদেশী রেস্টুরেটার ইন স্কটল্যান্ডেরও প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ সমিতি এডিনবারার চেয়ারম্যান, কাউন্সিল অব বাংলাদেশীজ ইন স্কটল্যান্ড এর সাধারণ সম্পাদক, যুক্তরাজ্য নবীগঞ্জ এডুকেশন ট্রাষ্টের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সাইক্লোন আপিল এবং ২০০৮ সাইক্লোন সিডর আপীলে তার ভুমিকা ছিল অগ্রগণ্য। ফয়সল চৌধুরীর নেতৃত্বে ২০০৯ সালে প্রথমবারের মত স্কটল্যান্ডে এডিনবারা কাউন্সিল কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপিত হয় এবং ঐদিন স্কটিশ পার্লামেন্টে এ নিয়ে একটি মোশন উত্থাপিত হয়।

রোশনারা আলী- মাত্র কিছুদিন আগে শ্যাডো মন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে যিনি সারা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিলেন, তিনি হলেন বর্তমান এমপি- আগামী ২০১৫ সালের নির্বাচনেও লেবার দল থেকে প্রতিদ্বন্ধিতাকারি রোশনারা আলী।রোশনারা একদিকে যেমন রাজনীতিবিদ, অন্যদিকে অনন্য এক সমাজকর্মী হিসেবেও নিজেকে সর্বদা নিবেদিত রেখেছেন।

লন্ডনের ইষ্ট এন্ডে বড় হওয়া রোশনারা স্কুল জীবন কেটেছে টাওয়ার হামল্যাটস এর মালব্যরী গার্লস হাই স্কুলে,পড়েছেন বিশ্বখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড থেকে দর্শন,রাষ্ট্রবিজ্ঞান,অর্থনীতি বিষয়ে, নিয়েছেন স্নাতকোত্তর ডিগ্রী।পুথিগথ বিদ্যাকে নিজের জীবনে ধারণ করে বাস্তবতার সমন্বয় করে নিজ বারা বেথনাল গ্রিন এবং বো এলাকার জনগণের সুখ-দুঃখের অংশীদার হতে, একইসাথে জনকল্যাণে দেশ ও জনগণের কল্যাণ সাধনের লক্ষ্যে জড়িয়ে পড়েন লেবার পার্টিতে।

সেখানে নিজের যোগ্যতা আর কর্ম অভিজ্ঞতার ফল স্বরূপ লেবার পার্টির টিকেট নিয়ে ২০১০ সালে সাধারণ নির্বাচনে বেথনাল গ্রিন-বো এলাকা থেকে বিপুল ভোটে প্রথম বাঙ্গালী এম,পি হিসেবে পার্লামেন্টে নিজের আসন পাকাপোক্ত করে নেন।সাংসদ হবার আগে, ২০০২ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত রোশনারা কৃতিত্বের সাথে কাজ করেন হোম অফিসে একজন টিম লিডার হিসেবে।সেখান থেকে তিনি যোগ দেন দ্য ইয়ং ফাউন্ডেশনে, এখানে তিনি একজন এসোসিয়েট ডাইরেক্টর হিসেবে যোগ দেন ২০০৫ সালে এবং ২০১০ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন।তারও আগে ১৯৯০ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি ইনষ্টিটিউট ফর দ্য পাবলিক পলিসি রিসার্চ এ একজন রিসার্চ ফেলো হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

উল্লেখ্য এটা অত্যন্ত সম্মান জনক পেশা- যে কোন একজন গ্রাজুয়েট/পোষ্ট গ্রাজুয়েট এর জন্য পাবলিক পলিসি রিসার্চ এ রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করা বিরাট এক সৌভাগ্য জনক কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। যেখানে নিজের কর্ম দক্ষতা ছাড়াও অনেক জ্ঞানী-গুনীজনের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ ছাড়াও রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের অনেক খুঁটিনাটি বিষয় যেমন অবগত হওয়া যায়, তেমনি অনেক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং যাচাই-বাছাই ছাড়াও এগুলো বিশ্লেষণ এবং ইমপ্লিমেন্টেশনের প্রায়োগীতা সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়।নীতি-নির্ধারণী বিষয়,আইন-কানুন প্রণয়ন,বাস্তবায়ন,জনপ্রশাসনে জনকল্যাণের লক্ষ্যে কর্ম-পরিকল্পনা মুলত হাতে খড়ি এখান থেকে তিনি শুরু করেন।

তৎকালীন লেবার দলীয় নীতি-নির্ধারণী,কর্মী-সমর্থক আর নির্বাচক মণ্ডলী রোশনারার কর্ম-দক্ষতা,আর রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় অভিভূত হয়ে তাকে বেথনাল-গ্রিন-বো এলাকায় পার্লামেন্ট নির্বাচনের জন্য যথার্থই উপযুক্ত মনে করেছিলেন, যার ফলশ্রুতি স্বরূপ আজকের ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এর তিনি প্রথম নির্বাচিত ব্রিটিশ বাংলাদেশী সদস্য।

মূলধারার রাজনীতির পলিসির আপেক্ষিকতা-
লেবার দল, কনজারভেটিভ দল,লিবারেল ডেমোক্রেটিক দল ছাড়াও আরো কয়েকটি রাজনৈতিক দল আছে ব্রিটেনে। যাদের ভূমিকাকে কোনভাবে হালকা করে দেখার উপায় নেই। তাদের মধ্যে নাইজেল ফারাজের ইউকিপ, গ্রিন পার্টি, কট্রর রেসিস্ট দল বিএনপি ইত্যাদি অন্যতম। মূলত প্রধান তিনটি দলের মধ্যেই সরকার গঠনের সম্ভাবনা এবং মূল প্রতিদ্বন্ধিতা হয়ে থাকে।ভোটের হিসেবে ব্রিটেনে কনজারভেটিভ এবং লেবার দল বহু ক্ষেত্রেই সমানে সমান এবং একে অন্যের প্রতিদ্বন্ধি। সেই হিসেবে দুদলেরই রয়েছে শক্ত ভোট ব্যাংক।

আর এই ভোট ব্যাংক ভাঙ্গা কিংবা এই ভোট ব্যাংকে সামান্য হানা দেয়া রীতিমতো যুদ্ধের ময়দানের দক্ষ সেনাপতির যুদ্ধ জয়ের কৌশলের মতোই- তারপরেও কথা থেকে যায়, দক্ষ সেনাপতি, দক্ষ কৌশল সত্যেও এই ভোট ব্যাংকের সামান্যতম হের ফের করা একেবারেই দুষ্কর।সেজন্যে ব্রিটেনের বিভিন্ন আসনে যুগের পর যুগ যেদল একবার দখল করেছে, সেই দল তাদের করায়ত্ব করে রেখেছে বা সব সময় সেই চেষ্টাই করে। সেকারণে সংসদীয় আসনের নির্বাচনে সাধারণতঃ বিজয়ী প্রার্থী বা সদস্যকে পার্টি মনোনয়ন দিয়ে থাকে।কোন দলই এতে কোন ব্যতিক্রম করে না।আর পরাজিত আসন পুনরুদ্ধারের জন্য দল চেষ্টা করে।

টাওয়ার হ্যামলেটস এরিয়া-
ব্রিটেনে সবচাইতে বেশী বাংলাদেশীদের বসবাস টাওয়ার হ্যামলেটস এরিয়াতে। বলা যায় ৮৫% ভোটারই বাংলাদেশী এই বারাতে।আর মজার ব্যাপার হলো এই বারা লেবারের নিশ্চিত সিট। এখানে লেবার দল যাকে মনোনয়ন দিবে, সেই পাশ করবে।বিগত ৭০ বছরের এই আসনের নির্বাচনী ইতিহাস তাই বলে, ব্যতিক্রম শুধু মাত্র জর্জ গ্যালওয়ে ছাড়া। কেননা ঐ সময় সাবেক সাংসদ ওনা কিং এর ভুলের কারণে উপসাগরীয় যুদ্ধের ইস্যুতে জর্জ গ্যালওয়ে নতুন হয়েও জয়ী হয়ে যান মূলত বাংলাদেশীদের ভোট ব্যাংকের কারণে।এই আসন থেকে লেবার দল ইতিপূর্বে যদি কোন বাংলাদেশীকে মনোনয়ন দিতেন তিনি এমপি হয়ে যেতেন। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য একজন রোশনারা রাজনীতির পাদপ্রদীপে আসার আগে আমাদের সেদিকে কোন দৃষ্টি গোচরীভূত হয়নি যদিও আমাদের অনেক নামে বেনামে হাজার খানেক সংগঠনের হাজারো নেতা এখানে রয়েছেন।

সম্প্রতি রোশনারা ইরাক গাজা ইস্যুতে পার্লামেন্ট ও রাজপথে যে ভূমিকা নিয়েছেন এতে তাকে করে তুলেছে আরো জনপ্রিয়। এমনিতেই বেথনালগ্রিন-বো আসনে তিনি জনপ্রিয় কারণ তার কাজের ও জন সম্পৃক্ততার জন্যে। আর ভোটের সর্বশেষ যে জরিপ তাতে রোশনারার পুনরায় এই আসন থেকে নির্বাচন প্রায় নিশ্চিত সেরকম আগাম ধারণা করা যায়।

লন্ডনের হ্যাম্পষ্ট্যাড এন্ড কিলবার্ণ আসন- এই আসনে এমপি আছেন লেবারের গ্লান্ডা জ্যাকসন। তিনি মূলতঃ মাত্র ৪২ ভোটের মেজরিটি নিয়ে জয়ী হন। জানুয়ারি ২০১৩তে পারিবারিকভাবে গ্লেন্ডা জ্যাকসন ঘোষণা দেন তিনি আর প্রতিদ্বন্ধিতা করবেন না। লেবারের সিট আর টিউলিপ সিদ্দিকী যেভাবে ক্যাম্পেইন শুরু করেছেন এবং এই আসনের লেবার নির্বাচনী টিম যেভাবে তাকে সহযোগিতা করছেন, বলা যায় ব্যতিক্রম কিছু না ঘটলে মার্জিন ভোটের ব্যবধান টিউলিপ সমন্বয় করে লেবার দলকে ফিরিয়ে দিতে পারবেন। সর্বশেষ একটি বেসরকারি সংগঠনের জরিপে এমনটাই আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

ইলিং সেন্ট্রাল ও একটন সংসদীয় আসন- এই আসনও মূলতঃ কনজারভেটিভ আসন।এখানকার বর্তমান এমপি কনজারভেটিভ পার্টির অ্যাঞ্জি ব্রে। ২০০৫ থেকে কনজারভেটিভ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এই আসন মূলত থ্রি-ওয়ে মার্জিন ভোটে কনজারভেটিভ এগিয়ে আছে। রূপা হক ও তার নির্বাচনী টিমের ক্যারিশম্যাটিক প্রচারণা এই আসনে ২০১৫ সালের নির্বাচনে মিলিব্যান্ডের নেতৃত্বে লেবার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার সম্ভাবনা ৬৫-৪৫%। সেদিক থেকে বলা যায় রূপা হক উতরে যেতে পারেন। কেননা রুপার রয়েছে সাধারণ এক নির্বাচনী পলিসি মেকিং টিম এবং প্রতিদিন যেভাবে তিনি ক্যাম্পেইন করে যাচ্ছেন, তাতে একটনের এই আসনে লেবারের জনপ্রিয়তা বেড়েই চলছে।

বার্কিং আসন- এই আসন মূলতঃ লেবারের উইনিং সীট। এখানে লেবারের মার্গারেট হোগস বর্তমান এমপি। তবে বাউন্ডারি পরিবর্তনের ফলে এই আসনে বর্তমানে ১৬ হাজার মুসলমান ভোটার রয়েছেন, যার মধ্যে ৭ হাজার বাংলাদেশী ভোটার আছেন। এই ভোট ব্যাংক যদি কোনভাবে একত্রিত হয়ে যায়, তবে ইতি পূর্বেকার সকল রেকর্ড ভেঙ্গে যাবে বলে অনেকেই মনে করছেন। মিনা রহমান ইতিমধ্যে কমিউনিটি ও ইয়ং ভোটারদের মনে রেখাপাত করতে সক্ষম হয়েছেন, যার প্রমাণ বার্কিং এর মাল্টি কালচারাল কমিউনিটি সেন্টার সরকারের সাথে দেওন দরবার করে বিক্রি ফিরিয়ে কমিউনিটির জন্যে বরাদ্ধ করতে ভূমিকা রেখেছেন। নির্বাচিত হওয়ার আগে তার এমন এচিভম্যান্ট কমিউনিটির জনগণের মধ্যে তাকে করে তুলেছে বিশেষ মার্যাদায়।

হ্যাটফিল্ড আসন- এই আসন মাঝখানের ১৯৯৭ ও ২০০১ সালের নির্বাচন বাদ দিলে বিগত সকল সময়েই কনজারভেটিভের করায়ত্বে ছিলো এবং এখনো আছে। এই আসনের বর্তমান এমপি  কনজারভেটিভ পার্টির চেয়ারম্যান মিঃ গ্র্যান্ট শার্প এবং তিনি আগামী নির্বাচনে এই আসন থেকে নির্বাচন করছেন। আনোয়ার বাবুল মিয়াকে একজন শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতার সাথে প্রতিদ্বন্ধিতা করতে হবে।

আর স্কটিশ লেবার পার্টির ক্ষেত্রে বলা যায়, স্কটল্যান্ডে লেবার পার্টি এখনো জনপ্রিয় এবং স্কটিশ লেবার দলের সদস্যদের নিয়েই লেবার দল আশা করছে ক্ষমতায় যেতে। জনমতও তাই বলছে। ফয়সল চৌধুরী যে দুটি আসন সম্ভাব্য আসনের যেকোন একটি সিলেক্ট কমিটিতে আবেদন করেছেন, যদি সেই দুটির একটিতে তাকে মনোনয়ন দেয়া হয় তাহলে বলা যায় স্কটল্যান্ডেও বাঙালির বিজয় পতাকা উড়বে।

বাংলাদেশী কমিউনিটি ও ব্রিটেন-
ব্রিটেনের অন্যান্য যেকোন কমিউনিটির চাইতে বাংলাদেশী কমিউনিটি মূলধারার রাজনীতিতে বেশ সক্রিয় এবং বলা যায়, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশীদের ন্যায় আর কোন কমিউনিটির এতো বেশী সংখ্যক ব্রিটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে মনোনয়ন পাননি।পাকিস্তানী ও আফ্রিকান কমিউনিটি যদিও অনেকটা এগিয়ে তথাপি হিসেবের অংকে এখনো তারা এক্ষেত্রে বাংলাদেশী কমিউনিটির পেছনে পড়ে আছে।অন্ধ দলীয় কোন্দল, গোষ্ঠীগত দ্বন্ধ আর একে অন্যকে টেনে হিঁচড়ে পেছনে না নামালে আমরা এক্ষেত্রে আরো অনেক এগিয়ে থাকতাম সন্দেহ নাই। বর্তমানে ব্রিটিশ বাংলাদেশী ছেলে মেয়েরা পার্লামেন্ট থেকে শুরু করে ব্রিটিশ ফরেন পলিসি, হোম অফিস, সিকিউরিটি এনালাইসিস, এমনকি প্রশাসন, আইন ও বিচার সকল ক্ষেত্রেই সমান দক্ষতার সাথে এগিয়ে যাচ্ছেন।

যে কথা না বললেই নয়-
রোশনারা ভালোবাসেন জনগণের সাথে থেকে জনকল্যাণমূলক কাজ করে যেতে, কাজ পাগল রোশনারা অত্যন্ত সহজ-সরল,সাধা-সিধে জীবন যাপন করেন। যেমন করেন মিনা রহমান, রূপা হক, আনোয়ার বাবুল মিয়া, ফয়সল চৌধুরী, তেমনি টিউলিপ সিদ্দিকীও। রোশনারার বিনয়ী স্বভাব সর্ব মহলে প্রশংসিত। বছর দুয়েক আগে, তার বাংলাদেশ সফর কালে বাংলাদেশের আরো দুজন নেত্রীর প্রতি সম্মান ও বিনয় প্রকাশের নিমিত্তে যেমন

তিনি বলেন, খালেদা-হাসিনা-উনারা আমার মুরুব্বী,আমার শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত,এতে হাসিনা-খালেদা যেমন সম্মানিত হন, একই সাথে রোশনারাও হোন সম্মানিত এবং রোশনারা যেমন আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করেন, আশার আলো দেখান, তেমনি দেখান একজন রূপা হক, মিনা রহমান, টিউলিপ সিদ্দিকী, ফয়সল চৌধুরী ও আনোয়ার বাবুল মিয়াও।কোন প্রকারের তর্ক কিংবা বিতর্কে না গিয়ে বলতে পারি, একজন রোশনারা যেমন বিনয়ী সাংসদ হয়ে শ্যাডো মন্ত্রী হয়ে যান, আমরা তখন অনেক উপরে উঠে যাই, যেমন উপরে উঠে চলি একজন নোবেল জয়ী ইউনুসের ভাষায়, “অনেক উপরে উঠে যাই,যেখান থেকে আমাদেরকে আর কেউ নামাতে পারবেনা। “আমাদের চারিপাশের অনেক অসংগতি আর অনেক সুখ-দুঃখের সাথে জড়িয়ে আছে এক রাশ আশা আর হতাশা, আশা-নিরাশার প্রতিনিয়ত দোলাচলে বাঙালির নিরন্তর সংগ্রামের একরাশ আশার এবং আগামী স্বপ্নের অমিত অযুত এক শক্তির ও দুর্দমনীয় এক আলোর নাম- এই ছয় বাংলাদেশী প্রার্থী। ,যেমন করে অন্য সকল প্রথিত যশ,খ্যাতিমান সব বাঙালির নাম শ্রদ্ধা,আবেগ আর ভালোবাসায় বুক উজাড় করে এক নিঃশ্বাসে নেয়া যায় ।

রোশনারা নিজ কর্মগুণ আর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, এবং বিচক্ষণতার সাথে এগিয়ে চলে বাঙ্গালীর শৌর্য-বীরত্ব গাথা ব্রিটিশ ইতিহাসে আরো উজ্জ্বল করে তুলবেন,নিয়ত এই আশাই করি।সাথে সাথে এই আশাও করি,একজন রোশনারার সাথে রূপা-মিনা-টিউলিপ-বাবুল-ফয়সল এক রশির মিলিত গ্রন্থিতে একত্রিত হয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট আলোকিত করে বাঙালির একজন শেরে বাংলা, একজন সোহরাওয়ার্দি, একজন মাওলানা ভাসানী, একজন শেখ মুজিবুর রহমান, একজন জিয়াউর রহমান হয়ে ব্রিটেনের ইউনিয়ন জ্যাকের সাথে লাল সবুজের গর্বিত পতাকাকে তুলে ধরবেন, বাঙালির শৌর্য বীর্যের অতলান্ত প্রদেশ থেকে তাদের সকলের জন্য এই আমাদের ঐকান্তিক কামনা। জয় হউক এই ছয় ব্রিটিশ বাংলাদেশীর, জয় হউক বাঙালির ।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026