মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান খানকে গ্রেপ্তার করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। তাঁকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা। গতকাল বুধবার জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি এ আহ্বান জানানো হয়।
রাজধানীর গুলশান থেকে ১০ আগস্ট রাতে আদিলুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ১১ আগস্ট নিম্ন আদালত তাঁর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আবেদন করেন আদিলুর রহমান। ১২ আগস্ট আদিলুর রহমান খানের রিমান্ড আদেশ স্থগিত করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে বিলম্ব ছাড়াই তাঁকে কারাগারে পাঠাতে বিবাদীদের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে তদন্ত কর্মকর্তা তাঁকে কারাফটকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন। বিচারপতি বোরহান উদ্দিন ও বিচারপতি কাশিফা হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চ রুল জারির পাশাপাশি এ আদেশ দেন। হাইকোর্টের আদেশে জিজ্ঞাসাবাদ অসমাপ্ত রেখেই গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে আদালতের মাধ্যমে আদিলুরকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রেসনোটে বলা হয়েছে, অধিকারের প্রতিবেদন কাল্পনিক। এতে দেশে-বিদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকার তথা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। এ ধরনের মিথ্যা ও কাল্পনিক তথ্য ইন্টারনেটে বিশেষ উদ্দেশ্যে ছড়ানো হয়েছে, যা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন অনুযায়ী অপরাধযোগ্য। প্রেসনোটে বলা হয়েছে, অধিকারের নিজস্ব ওয়েবসাইটে ভিত্তিহীন প্রতিবেদন প্রকাশ করায় সংস্থাটির সম্পাদককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে ওয়েবসাইটের প্রতিবেদনটি দালিলিক সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হবে। আইন অনুযায়ী এ ধরনের অপরাধের শাস্তি ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা পর্যন্ত আর্থিক জরিমানা।
প্রেসনোটে বলা হয়, গত ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে অবস্থানরত হেফাজতের কর্মীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে ৬১ জন নিহত হয়েছে বলে অধিকারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। অথচ ওই দিন রাতের অভিযানে কোনো মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি। রাতে কেউ মারাও যায়নি। তবে দিনের বেলায় হেফাজত ও তাদের সহযোগী উচ্ছৃঙ্খল নেতা-কর্মীদের আক্রমণ ও পুলিশের প্রতিরোধের কারণে ১১ জন এবং পরে হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়।
ওএইচসিএইচআরের মুখপাত্র লিজ থ্রসেল জেনেভায় সাংবাদিকদের বলেন, আদিলুর রহমান খানের শারীরিক ও মানসিকভাবে অক্ষত থাকার নিশ্চিত করতে আমরা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই। মানবাধিকার রক্ষার কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওএইচসিএইচআরের মুখপাত্র বলেন, কোনো ধরনের পরোয়ানা ছাড়াই সাদা পোশাকের পুলিশ ১০ আগস্ট আদিলুরকে তাঁর বাড়ির সামনে থেকে গ্রেপ্তার করে। গত মে মাসে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে সরকারি বাহিনীর সহিংসতার বিষয়ে মিথ্যা তথ্য প্রকাশের অভিযোগে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৫৪ ধারা এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওই ঘটনায় হতাহতের বিষয়ে সরকারের দেওয়া তথ্য চ্যালেঞ্জ করে ৬১ জন নিহত হওয়ার দাবি করেছে অধিকার।
লিজ থ্রসেল উল্লেখ করেন, গ্রেপ্তারের পরদিন আদিলুরের জামিন নামঞ্জুর করে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। আদালতে হাজির করার আগে আদিলুরের সঙ্গে তাঁর আইনজীবীর সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অধিকার সম্পাদককে গ্রেপ্তার করায় দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠন, মানবাধিকারকর্মী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উদ্বেগ জানিয়েছেন। আদিলুরকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের উপমুখপাত্র মারি হারফ গতকাল এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি এ আহ্বান জানান।
Leave a Reply