শীর্ষবিন্দু নিউজ: র্যাবের অভিযানে অবৈধ ক্যাসিনো বাণিজ্য, টেন্ডারবাজিসহ দুর্নীতিবিরোধী সকল অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনে (মানিলন্ডারিং) র্যাবের দায়ের করা সবকটি মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। এর মধ্যে একটির অভিযোগপত্রও দাখিল হয়েছে আদালতে। বাকিগুলো এপ্রিলের মধ্যেই দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
এসব মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে হলেও ক্যাসিনোকাণ্ডে নতুন করে মোটা দাগের সুবিধাভোগীদের আর কারও নাম আসছে না। গ্রেফতার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদেরই ক্যাসিনোর সুবিধাভোগী হিসেবে নাম আসছে। রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালীদের কারও নাম আসছে না। অভিযোগ রয়েছে, সুবিধাভোগীদের অনেককেই রাখা হয়েছে সন্দেহের ঊর্ধ্বে। তাই মামলায় ক্যাসিনো থেকে সুবিধা নেওয়া অনেকেই থেকে যাচ্ছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
এ বিষয়ে সিআইডির কর্মকর্তারা বলছেন, কেউ ক্যাসিনোর টাকা নগদ নিলে তাদের মামলায় জড়ানো কঠিন। এর কোনও প্রমাণ নেই। আসামিরা যে-কারও নাম বলতে পারে, তবে তার সপক্ষে প্রমাণ থাকতে হবে। মানিলন্ডারিং মামলায় কাউকে জড়াতে হলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রমাণ থাকতে হয়। তা না হলে মামলা দাঁড় করানো যায় না।
তবে আইনজীবীরা বলছেন, ক্যাসিনোর সুবিধা যারা নিয়েছে সবাইকেই আইনের আওতায় আনা সম্ভব। এক্ষেত্রে আসামির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহে থাকা ব্যক্তিদের সম্পত্তির হিসাব-নিকাশ করলেই সুবিধাভোগীরা বের হয়ে আসবে। কারণ ক্যাসিনোর টাকা কেউ বৈধ আয় হিসেবে দ্রুত দেখাতে পারবে না। তবে এটি প্রমাণে তদন্ত সংস্থার সদিচ্ছা থাকতে হবে।
গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় প্রথম ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) হাতে গ্রেফতার হন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। তারপর একের পর এক ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান চালাতে থাকে র্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সংস্থা।
র্যাব ঢাকাতে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান পরিচালনা করার পর বাহিনীটির সদস্যরা বাদী হয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মাদক, অস্ত্র ও মানিলন্ডারিং আইনে মামলা করেছেন। মাদক ও অস্ত্র আইনে দায়ের করা মামলার তদন্তও করছে র্যাব। আইনগতভাবে মানিলন্ডারিং মামলার তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে সিআইডি।
গত বছরের ৬ অক্টোবর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের তৎকালীন সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে গ্রেফতার করে র্যাব। তার বিরুদ্ধে র্যাব বাদী হয়ে অস্ত্র ও মাদক আইনে মামলা করে। এছাড়াও হরিণের চামড়া রাখায় তাকে ভ্রাম্যমাণ আদালত ছয়মাসের কারাদণ্ড দেন। তাকে গ্রেফতারের সাড়ে পাঁচ মাস পরও তার বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং আইনে মামলা দায়ের করতে পারেনি সিআইডি। এখনও তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে। তার অবৈধ সম্পদের হিসাবের সব তথ্য এখনও পায়নি সিআইডি। তার বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে বলে জানিয়েছেন সিআইডির কর্মকর্তারা।
ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের আরেক চরিত্র জিকে শামীম। পুরো নাম গোলাম কিবরিয়া শামীম। বিভিন্ন দফতরকে ম্যানেজ করে সরকারি কাজ বাগিয়ে নেওয়ার গুরু। গত ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিকেতনের নিজ কার্যালয় থেকে বিদেশি মদ, অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ নগদ টাকাসহ র্যাবের হাতে গ্রেফতার হয় শামীম।
এ ঘটনায় র্যাব বাদী হয়ে গুলশান থানায় তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, অর্থপাচার ও মাদক আইনে মামলা করে। সিআইডি তার অর্থপাচারের মামলার তদন্ত করছে। তার বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে তিন হাজার কোটি টাকার উপরে লেনদেনের হিসাব পেয়েছে তদন্ত সংস্থাটি।
তবে তার বিদেশে কোনও সম্পত্তি নেই বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। তার ১৯৪টি অ্যাকাউন্টে ৩২৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা পেয়েছে সিআইডি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় এসব অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে রাখা হয়েছে।
এছাড়াও তার ১৬৫ কোটি ২৯ লাখ ৬৫ হাজার টাকা এফডিআর করা রয়েছে। তার কাছে নগদ এক কোটি ৮১ লাখ ২৮ হাজার টাকা পাওয়া গিয়েছিল। এছাড়াও বিভিন্ন দেশের মুদ্রা ছিল তার কাছে। সিআইডি তদন্তে ঢাকার সবুজবাগ, বাসাবো, নিকেতন, মোহাম্মদপুর, খিলক্ষেতসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৫৮ কাঠা জমি পেয়েছে।
জিকে শামীমের বিরুদ্ধে অর্থপাচার আইনে দায়ের করা মামলা প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে এই মামলার অভিযোগপত্রেও পরিবার, স্বজন ও তার কর্মচারীদের নাম থাকছে। কোনও রাজনৈতিক নেতার সংশ্লিষ্টতা পাচ্ছে না সিআইডি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার ফারুক হোসেন বলেন, আমাদের তদন্ত শেষ। এই মাসেই (মার্চ) তার বিরুদ্ধে র্যাবের দায়ের করা অর্থপাচার মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। বিদেশে অর্থপাচার ও সম্পদের তথ্য আমরা পাইনি। তবে তার অ্যাকাউন্টে মোটা অংকের টাকার লেনদেন হয়েছে।
ক্যাসিনো পরিচালনার অভিযোগে গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর র্যাবের হাতে গ্রেফতার হন ঢাকা মহানগর যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ওরফে ক্যাসিনো খালেদ। তার বিরুদ্ধে র্যাবের দায়ের করা অর্থপাচার মামলার অভিযোগপত্র দিয়েছে সিআইডি। অভিযোগপত্রে খালেদের সঙ্গে আসামি হয়েছে তার ভাই ও কর্মচারীসহ ছয়জন। ক্যাসিনো থেকে অবৈধ আয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন মালয়েশিয়া সেকেন্ডহোম এবং সিঙ্গাপুরে ব্যবসা। ক্যাসিনো থেকে খালেদের আয়ের ভাগ অনেক রাজনৈতিক নেতা পেতেন বলে অভিযোগ থাকলেও অর্থপাচার মামলায় তাদের নাম আসেনি।
সম্রাটের ক্যাসিনোর দেখাশোনা করতেন ওয়ার্ড কাউন্সিলর মমিনুল হক ওরফে সাঈদ। তারা এক বছর আগে পল্টনের প্রীতম-জামান টাওয়ারে ক্যাসিনো চালু করেছিলেন। অভিযান শুরু হওয়ার পর মমিনুল সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমান। এখন সেখানেই রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করছে সিআইডি। অনুসন্ধান শেষে অর্থপাচার আইনে মামলা হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর কলাবাগান স্পোর্টিং ক্লাব সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজকে গ্রেফতার করে র্যাব। তার বিরুদ্ধে অর্থপাচারের কোনও মামলা হয়নি। অনুসন্ধান চলছে।
ক্যাসিনো অভিযানের পর কয়েকমাস পালিয়ে থাকার পর সিআইডির হাতে গ্রেফতার হন গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি (বরখাস্ত) এনামুল হক ভূঁইয়া ও সাধারণ সম্পাদক (বরখাস্ত) রুপন ভূঁইয়া। এর আগে র্যাব তাদের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে সিন্ধুকভর্তি অবৈধ টাকা পায়।
এই ঘটনায় র্যাব অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনে মামলা করে। তাদের বিরুদ্ধে বর্তমানে চারটি অর্থপাচারের মামলা চলছে। র্যাবের দায়ের করা চারটি মামলার অভিযোগপত্র শিগগিরই জমা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থাটি। ক্যাসিনোর টাকার ভাগ তারা অনেককেই দিয়েছেন। তবে সেইসব ব্যক্তিরা অর্থপাচার মামলায় আসামি হচ্ছে না।
দেশ ছেড়ে পালানোর সময় র্যাবের হাতে ধরা পড়েছেন হাবিবুর রহমান মিজান। মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের এই নেতা স্থানীয়দের কাছে ‘পাগলা মিজান’ নামে পরিচিত। তিনি মোহাম্মদপুরবাসীর ত্রাস। র্যাবের একটি বিশেষ টিম মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে গুহ রোডের হামিদা আবাসিক গেস্ট হাউজের সামনে থেকে পাগলা মিজানকে আটক করে।
র্যাব জানিয়েছে, তিনি ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তার বিরুদ্ধে র্যাবের দায়ের করা মামলা তদন্ত করছে সিআইডি। তার বিদেশে সম্পত্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে অনুসন্ধান শেষ না হলে এ বিষয়ে এখনই মন্তব্য করতে রাজি নয় সিআইডি। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি রেজানুল হায়দার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা তার সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান করছি। তবে এবিষয়ে আরও সময় লাগবে।’
বিসিবির পরিচালক লোকমান ভূঁইয়াকে গত ২৫ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের মনিপুরী পাড়ার নিজ বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। অর্থপাচার মামলার তদন্তে ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় তার দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পেয়েছে সিআইডি। তার ৪২টি অ্যাকাউন্টে ২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা রয়েছে।
এছাড়াও ঢাকায় ফ্ল্যাট ও জমি রয়েছে। লোকমানের মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) জাহিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে লোকমানের বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য চেয়েছি। আশা করা যায়, এ মাসের মধ্যেই তথ্য পাওয়া যাবে।
কথিত জনতার কমিশনার বলে নিজেকে জাহির করেছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার তারেকুজ্জামান রাজীব। কমিশনার হয়ে হয়েছেন বিপুল অবৈধ টাকার মালিক।
সিআইডি প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে তার বিরুদ্ধে অর্থপাচার মামলা করেছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে রাজীবের ব্যাংকে ২০ কোটির উপরে টাকা পেয়েছে। এছাড়াও তার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কথাও অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।
গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার হন বাংলাদেশের অনলাইন ক্যাসিনোর মূল হোতা সেলিম প্রধান। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সময় তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অর্থপাচার মামলা তদন্ত হচ্ছে। থাইল্যান্ডে সেলিম প্রধানের বাগানবাড়ি রয়েছে। এছাড়াও তার বিভিন্ন ব্যাংকে টাকা রয়েছে। সেগুলোর তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে সিআইডি।
সেলিম প্রধানের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক শহিদুল ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে সেলিম প্রধানের ৮৩টি অ্যাকাউন্টে আমরা ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা পেয়েছি। সে থাইল্যান্ডের নাগরিক, তার সেখানেও সম্পত্তি আছে। আমরা সেগুলোর তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি।
এখনও ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অর্থপাচার মামলার তদন্তে তাদের মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের গ্রেফতারের বিষয়টি আসছে না। এমনকি যেসব ব্যক্তিরা ক্যাসিনোতে নিয়মিত খেলতো তাদেরও কাউকে গ্রেফতার হতে দেখা যায়নি।
তবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ক্যাসিনোর প্রতিটি টাকার লেনদেন বের করা সম্ভব। তদন্তকারী কর্মকর্তা চাইলেই তা পারেন। কারা কীভাবে টাকা নিয়েছে, তা ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িতরা সব জানে। কিন্তু এটা করবে না কেউ। মাদকের মতো হয়ে যাচ্ছে বিষয়টা। মাদকের সঙ্গে জড়িত মূল মাফিয়ারা গ্রেফতার হয় না। বাহকরা গ্রেফতার হয়, মারা পড়ে।
সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, আমরা এসব মামলা তদন্তে অনেকেরই নাম পেয়েছি। অনেকের মামলার এখনও তদন্ত চলছে। কয়েকজনের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। তদন্তে যাদের নাম আসছে তাদের বিরুদ্ধেই অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। যারা সুবিধাবাদী তাদের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিআইডির এক কর্মকর্তা বলেন, ক্যাসিনোর টাকার যারা ভাগ নিতেন, তারা নগদে নিয়ে নিতেন। আসামিরা অনেকের নাম বললেও এসব বিষয়ে প্রমাণ করা কঠিন। কারণ এর কোনও প্রমাণ নেই।