মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ০৫:০৭

স্মৃতির পাতায় সত্তর দশকের সেই সিলেট

স্মৃতির পাতায় সত্তর দশকের সেই সিলেট

১৯৭২ পরবর্তী সিলেটের শহর জীবন। সেই সত্তর দশক আমার বাল্যকালের কথা। মনে হলেই চোখের কোনে লুকিয়ে থাকা পানির বহর আস্তে করে বের হয়ে আসে। নিজের মনের অজান্তে প্রশ্ন জাগে? ফেলে আসা সিলেট আমাকে কাঁদায় না আমার বাল্যকাল আমাকে কাঁদায় ঠিক বুজঁতে পারিনা।

শিশুকালের অজানা দিন, কৈশোরের দুরন্তপনা, যুবক বয়সে কিছুটা হলে জীবনের স্বাদ নেয়া আর এখন জীবনের অনেকটা শেষ প্রান্তে দাড়িয়ে আছি। কেন জানি এই পৌড়ে বয়সে এসেও একই রোগে আমাকে প্রতিনিয়ত ভোগাচ্ছে। ব্যস্থ শহর লন্ডনে এখন অনেক রাত। তারপরও পাঠকদের মনের রসের জোগান দিতে কলম হাতে নিয়ে লিখতে বসেছি।

স্বাধীনাত্তোর ৬৮ হাজার বাংলাদেশের গ্রামের রাস্তা যাই থাকুক না কেন আমার বাড়ী থেকে সিলেটের রাস্তা ছিল বড় বন্ধুর পারাপার। এমনি বিপদ সংকুল রাস্তা দিয়ে মৌলভীবাজারের নাদামপুর নামক স্থানে সিলেটের উদ্দেশ্যে বাসে উঠলাম। সারা দিন যেন নিঃশেষ রাস্তায় অবিরাম চলা। পথে মধ্যে এমন কোন ব্রিজ পাই নাই যেখানে ডাইভারসন ছিল না বা গাড়ি থেকে নামতে হয়নি। এরমধ্যে সেই কাঠের দুই নৌকার জুড়া দিয়ে বৈটার সাহায্যে গাড়ি পার করা হলো। যার নাম শেরপুরের ‘জুরিন্দা’। প্রায় সকল ব্রিজ হয়ত পাকিস্তানিরা বা মুক্তি বাহিনীরা ভেঙ্গেছে ওদের যুদ্ধের পরিকল্পনায়। এমনি যাত্রায় পরিসমাপ্তি হল সিলেট শহরের গোয়াইপাড়া নামক আবাসস্থলে।

পরিষ্কার পরিছন্ন একটা গ্রাম, নাম তার ‘আড়াই হাল’ যার পূর্বে মনু নদী, উত্তরে কুশিয়ারা, পশ্চিমে বরাক নদী বহমান। প্রশস্থ লম্বা উঠান, বাড়ীর পশ্চিম ভিটে সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি দূতলা ঘর, বাড়ীর পূর্ব ভিটেয় মাস্টার ও মেহমানখানা তারও অধিক পূর্বে গোশালা। সাড়ে চার একর পুকুর সম্বলিত বাড়ি থেকে এক বদ্ধ পাড়া গাঁয়, গোয়াইপাড়ায় হল আমার বসতি। এটা নাকি সিলেট শহর। আমাকে নিয়ে আসা হয়েছে লেখাপড়া করানোর জন্য। সঠিক সন তারিখ মন খুজছে, যদি পরবর্তীতে মনে পড়ে যায় তাহলে অবশ্যই লিপিবদ্ধ করব।

আস্তরবিহীন ইট কচিত গহীন অরন্যের কূল ঘেঁসা তিন কক্ষের একটা বাসা। রান্না ঘরের পিছনের দরজা খুলে বসা দায় যেখানে বানর ও হনুমানের অভয়ারণ্য। সামনের পায়ে চলার রাস্তা তো সেটা রাস্তা নয় যেন বালির টিবিতে পা ডুবিয়ে চলা। রাতে মিটি মিটি দুটি ‘লেম’ (এক জাতীয় আগুন জ্বালিত প্রদীপ) এর সাথে পরিচয় হল সেটার নাম নাকি ‘লাইট ভাল্ব’। আমার বাড়ীর সন্ধাকালীন লেম ও হারিকেনের আলো যেন ছিল তার চেয়ে উজ্জ্বল। মজার বিষয় হলো, তফাৎ কেমন সেটা দেখতে হলে সেই গ্রামেরই লেম জ্বালিয়েই দেখতে হবে।

বাসার একেবারে পশ্চিমের রুমে আমি থাকতাম। কি যেন একটা অদ্ভুদ শিহরনে আমাকে যেন সজোরে একটা ঝাকি দিল। দিনের আলো ফুটায় একটা নতুন জমাট বাঁধা পরিবেশের সাথে পরিচয় ঘটল। দেখলাম একটা বালক সে কাঁধে ভার দিয়ে কলসি ভরে পানি এনে দিচ্ছে। পরিচয় হল এই স্থানে পুরুষ-ছেলে কলসি দিয়ে মানুষের বাসায় পানি এনে দেয়। এটা আমার কাছে একেবারে বেমানান লাগলো। বাসায় পানি যেখানে রাখা হয় এর নাম শিখলাম ‘হাউজ’। বাথরুমের ভীতরে পাকা আবদ্ধ আধারকেই হাউজ বলে। গোসলের কাজ এই পানি দিয়ে হয়। খাবার জন্য মাটির ও পিতলের কলসে পানি ভরে পাঁক ঘরে রাখা থাকত। সিলেট শহরে তখনও ইন্দারা বা কুয়া (যেখানে পানি জমিয়ে রাখা হয়) পানি সরবরাহের প্রধান অবলম্বন। প্রায় প্রতিটি পাড়ায় বা বড় বড় বাড়িতে কুয়া বা ইন্দারা থাকতো।

প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় বা একদিন অন্তর মজুমদারির প্রধান রাস্তায় দাড়িয়ে থাকা লাকড়ি ওয়ালাদের (জ্বালানী কাঠ বিক্রেতা) বাসায় ডেকে আনা ছিল আমার কাজের দায়িত্বের একটি অংশ। এক টাকায় চার আঁটি বা বড় জোড় ৫ আঁটি। তখন সিলেটে গ্যাস ছিল না। সিলেটের দোকানের সামনে লাকড়ির আঁটা বিক্রির জন্য স্তপিভূত থাকতো। যেভাবে বর্তমানে ক্রিপ্স ও ড্রিঙ্ক এর বোতল সাজিয়ে রাখা হয়। আমার আরেকটা কাজ ছিল বাসায় কোন মেহমান আসলে উনাদের জন্য রিকসা ডেকে আনা। এ ছিল এক মজার ব্যাপার। সে সময় সিলেট শহরের চাল-চলন ছিল এক বাসা থেকে আরেক বাসায় বেড়াতে যাওয়া মানে দিনের ট্রিপ। মেহমান বিদায় নেবার ২/১ ঘণ্টা আগে থেকে রাস্তায় দাড়িয়ে এই পথে যাত্রি নিয়ে কোন রিকসা আসলে ওকে হানা দেওয়া। ঐ রিকসাকে বললেই হত ‘অবা ড্রাইভার অবায় আইও’ ব্যাস এতোটুকুই, সে যাত্রি নামিয়ে আসবে। রিকশা ড্রাইভার ও খুব খুশি যে, সে ফিরতি ট্রিপ পেয়েছে। মানুষের চলাচল খুবই সীমিত ছিল তৎকালে সময়ে।

আমি বেশ লম্বা দিন স্কুল ছাড়া ছিলাম বলে মনে পড়ে। সেই সময়ে অত্র এলাকার ছেলে পেলে সবাই মজুমদারি মাঠে খেলতাম। একবার বাৎসরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলাম। সারা দিন প্রচণ্ড লম্প-জম্প। মাঝখানে এক টুকরা লেম্বু লবন দিয়ে বিরতি নিতাম। আমরা মজুমদারি মাঠে ফুটবল খেললে চৌকিদেখীর উসমান ভাই রেফারির দায়িত্ব নিতেন। উনি খুবই সুদর্শন ছিলেন। দীর্ঘ সময়ের পর উনাকে লন্ডনের ডার্টফোর্ডে একটি রেস্টুরেন্ট দেখা হয়েছিল। পাড়ার ছেলে-মেয়েদের মধ্যে কোন ঝগড়া বিবাদ মোটেই ছিল না। আমাদের দুষ্টুমি ছিল লেচু বাগানে লেচু গাছে ডিল ছুড়া। সিলেট শহরের কালচার ছিল দুপুরে ভাত খেয়ে ঘুমানো। আর আমরা এই সুযোগের সৎ ব্যবহার করতাম।
আমার সিলেট আমার প্রাণ, সিলেট ত্যাগের ব্যথা আমার মর্মে মর্মে গাঁথা। আমি সিলেটি হয়ে লন্ডনে থাকছি, সেটা তো আমার জন্য সুখকর নয়। আমি তাঁকে হারিয়ে আজ ব্যাকুল। আমি তাকে খুজি, তার স্বাদ পেতে চলি লন্ডনের আনাচে কানাচে, টেমসের পাড়ে পাড়ে। মাইলের পর মাইল হাটি, এই তো সবে দুই দিনে হাঁটলাম ৪০ মাইল। আমার চক্ষে ভাসে কুশিয়ারার রুপালি চকচকে পানি ও ঢেউ। দেখেছি তারমধ্যে জেলেদের জালে উঠা রুপালি ইলিশের পেটে পড়া সূর্যের উজ্জ্বল ঝলকানি। তাই তো এই মন সদা ব্যাকুল সবুজ বাংলার দুটি কুড়ির দেশ সিলেটে উড়াল পাখির মতো উড়ে যেতে চায় বারবার

এই তো সেদিন সিলেট নামের ছোট একটা গ্রামে বসত শুরু করলাম। সবাই সবাইকে চিনতাম। কে কোন এলাকা বা পাড়ার সবার মোটামুটি জানা শোনা। হতে পারে যে, উনি কাজিটুলার ধলা বাড়ি বা কালা বাড়ির একজন। অথবা, চৌকিদেখির লম্বা হামিদ মিয়া। মিরাবাজারের তারু মিয়া খান। পশ্চিমের ভাতালি, দক্ষিনের মাছিমপুরের জনগোষ্টি। শহরের তারুন্য লামা ভাই, বাবুল ভাই, মোশারফ ভাইসহ ইয়েমিন ভাই, এনাম ভাই, রুপবান সিরাজ ভাইসহ অন্যান্যরা। পুরো সিলেট শহরটাই তো ছিল আমার বসত বাড়ি।

সিলেট শহরের বাড়ীগুলি যেন এক একটা শান্তি ও ভালোবাসার আঁধার। এগুলো যেন ঘন বড় এক ফরেস্টের মধ্যে গড়ে ওঠা বাগান বাড়ি মতোই। এমনি এক এজানা শহরে আমার বসবাস শুরু হল ১৯৭২ সালের পর থেকে। যে এলাকায় বসবাস শুরু করলাম তার নাম গুয়াইপাড়া। যেন একটা বিরাট ফরেস্ট এর মধ্যে এই শহরতলি। যেমন লন্ডনের এপিং ফরেস্টের মধ্যে গড়ে উঠা খামার বাড়ী। একটা উত্তর-দক্ষিন লম্বা রাস্তা ও এর আশ পাশে হাতে গুনা বাড়ি নিয়ে এই বসত বাড়ি। এই রাস্তার দক্ষিন প্রান্তে ইলেক্টিক সাপ্লাই রোড, উত্তর প্রান্ত এয়ারপোর্ট রোড, খাসদবির। গোয়াইপাড়ার পূর্বে অনাবাদি জঙ্গলসম পতিত জমি ও পূর্ব উত্তরে চা-বাগানের প্রান্তর। পশ্চিমে পাকা এয়ারপোর্ট রোড, মজুমদারি, লেচু বাগান, কমলা বাগান ও বাদাম বাগিচা নামক হালকা জনবসতি পূর্ণ এলাকা।

গোয়াইপাড়ার মেইন রাস্তা থেকে তিনটা শাখা রাস্তা পূর্ব দিকে ও একটি রাস্তা পশ্চিম দিকে গিয়ে এয়ারপোর্ট রোডে মিশেছে। আর একটি মাত্র পশ্চিমমুখি রাস্তায় ঢুকে ডানে বামে জঙ্গলাময় পতিত জায়গা। তারপর ডানে নুরুল আমিন ভাইয়ের বাড়ী। তারপর আলিয়া মাদ্রাসার সুপারেনটেন্ট সাহেবের বাসায় আমরা বাসা ভাড়া করে থাকি। এরপরে সুরুজদের বিরাট বাড়ী শেষ হয়েছে এয়ারপোর্ট রোডে। কি নেই ঐ বাড়িতে? পুকুর, বাশ ঝাড়, অগনিত বৃক্ষ রাজি, অঢেল খোলামেলা জায়গা। এক কথায় বলতে গেলে এই গলির এই প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্তে ১০০০/১২০০ ফুটের ভীতরে একেক পাশে তিনটা বাড়ি। একই গলির দক্ষিন প্রান্তে ঢুকেই জঙ্গলাময় জায়গা, তারপর শুরু হল ভুলুদের বিশাল বাড়ী। এই বাড়ীর একজন ছিল আমার সমবয়সি নাম তার কাদির। ওকে পরবর্তীতে ড্রাইভার হতে দেখেছি। ওর আব্বা খুব শালীন অশতীপর ভদ্রলোকই মনে হত। কেমন যেন একটা অব্যক্ত গৌরবময় অধ্যায় ঐ বাড়ীর সাথে জড়িয়ে আছে বলে আমার মনে হত। এরপর ঘন সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত জমিতে ব্যাচেলারদের থাকার মেস। তারপর খালি গর্তময় জায়গা, তারপরে শুরু হল আবার বিশাল অট্রালিকা। যতদুর মনে পড়ে- এই গর্তময় আধা একর জায়গা ১৯৭৪ সালে পচিশ হাজার টাকায় কেনা হয়েছিল। তারপর বিশাল বাড়ির শুরু। বাড়ির মালিকের নাম এই মুহূর্তে মনে আসছে না, এই বাড়ির পশ্চিম প্রান্ত গিয়ে ঠেকেছিল এয়ারপোর্ট রোডে।

আমি যে বাসায় থাকতাম যা পূর্বেই উল্লেখ করেছি, তার সামনের পায়ে হাঁটার চলার পথটা বড় বালুকাময়। পায়ের সেন্ডাল নিয়ে টেনে টেনে হাঁটতে বেজায় কষ্ট ও বিরক্তি লাগতো। আমাদের বাসার ঠিক উত্তর সংলগ্ন গহীন জঙ্গল থাকার পরও ভর দুপুর বেলা খোলা আর সন্ধ্যায়ও খোলা থাকতো। আলোর তেমন তারতম্য নেই। দিন-রাত সর্বদা বানর ও হুনুমানের কেচ কেচানি। বহুবিদ পাখ-পাখালির সরব আচরন। শুকনো পল্লব ও গাছ গাছালির কথপকোথনের শব্দ সর্বদা চলমান। গামাই নামক একটা প্রকাণ্ড বৃক্কের সাথে আমার পরিচয় হল। এই গাছের হলুদ গোটাসম ফল আমারা খেতাম। আমার রোমের ঠিক উত্তরের অরণ্য থেকে ভেসে আসত পাকা গামাইয়ের মিষ্টি গন্ধ। সেই সময়ে সবচেয়ে কম ছিল মানব সন্তানের চলাচল। সারা দিনে কোন ফেরিওয়ালা নেই। পথিকের চলাফেরা নেই। এক শোনশান নীরবতা সর্বময়। তারচেয়ে আমি যে গ্রাম বা বাড়ি ফেলে এসেছি তা ছিল জনসমাগম পূর্ণ। এমনি পরিবেশেই শুরু হল আমার সিলেট জীবন। একদিন শুনলাম পাড়ায় ‘লেন্টল লেকচার’ আসবে। এই প্রথম এই শব্দের সাথে পরিচয়। তাও যে বাড়িতে আসছে যদিও আমাদের বাসার দক্ষিনের এক প্লটের শেষে কিন্তু যেতে হবে অনেক ঘুরে। বাসার সামনের বালুময় রাস্তা পাড়ি দিয়ে এয়ারপোর্ট রোডে উঠে বামে প্রায় চারশত ফুট যেয়ে বাম দিকে কাচা রাস্তা। এই রাস্তা দিয়ে ডুকে ডানে কচুরিপানার ডুবা আর বামে জয়নাল ভাইদের বাড়াটিয়া বাসা। একটু সামনে এগুলেই ডানে যে বাড়িটি ছিল ঐ বাড়ীর একটা মেয়ের কথা মনে আছে যে আমার সাথে পাঠশালায় পড়তো। ওদের বাড়ি ছেড়ে বামের বাড়িতেই হবে ‘লেন্টন লেকচার’। আমরা সবাই উঠোনে অপেক্ষমান একটা লোক জীর্ণশীর্ণ বস্ত্র পরিহিত কাঁদে কাপড় দিয়ে ঢাকা বাহন নিয়ে আসল। উঠোনের এক প্রান্তে কাপড়ের টুকরো রেখে বাক্সও থেকে আলোর মত কি আসছিল আর আমি কিছু আলো ছায়া মানব আকৃতির নড়া চড়া দেখে আবার বাসায় ফিরলাম। এখনও পরিষ্কার মনে করতে পারছি না আসলে আমি কি দেখেছিলাম বা কি দেখানো হয়েছিল। এই বাড়ীকে আমরা সড়ালি বাড়ি ডাকতাম। ওদের সড়ালি মোরগ ছিল।

গোয়াইপাড়ার গলির উত্তর পূর্ব প্রান্তে ২/১ টা জীর্ণ শীর্ণ দোকান। তারপর আমার প্রাথমিক বিদ্যালয় ‘খাসদবির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। এরপরে জঙ্গল পেরিয়ে গ্রামে ঢুকার জন্য পূর্বমুখী কাচা রাস্তা। এই দিকে বেশ পুরাতন গ্রাম্য বসতি। ওদের ছেলে-মেয়েরা লেখা পড়া করত না। আমার সমবয়সি ছেলেরা খুব বেশি এগিয়ে যেতে পারেনি। আমার যতদূর মনে পড়ে তাদের উন্নতির চরম শিখা কাপড় সেলাই করার দর্জি পর্যন্ত। এ রকম ২/১ জন ছেলেকে পরবর্তীতে কাজ করতে দেখেছিলাম দর্জির দোকানে। এরপরে একটা জঙ্গলময় জায়গা যার অন্দরে একটা পরিত্যক্ত ইন্দারা বা কুয়া ছিল। যদিও এর পূর্বে ছিল কিছু বসত বাড়ি। এই বাড়ী থেকে আমি একবার ‘ছিকর’ (খাবার যোগ্য বিশেষ মাটি) কিনেছিলাম। আমার আপা গর্ভবতী অবস্থায় তা খেতে চেয়েছিলেন। এখানে একটা স্মৃতি উল্লেখ্য করার মতো যে, যদিও আমরা তখন শহরের বাসিন্দা তারপরেও অনেক কিছুই ছিল পুরাতন ও গ্রাম্য। বোনের বাচ্চা ডেলিভারির জন্য শুরু হল দাইমা খোঁজা। আমাদের সাথে তখন আম্বরখানার ফয়সল, ফরহাদদের সাথে পারিবারিক সম্পর্ক। আর উনারা এই এলাকায় পুরাতন বাসিন্দা। তাদের বাসা ঠিক আম্বরখানা নিরাময় ফার্মেসির উল্টো চিপা গলি দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে আর কোন বাসা বাড়ি সেখানে ছিল না। তাই দাইমা‘র খোঁজ জানতে প্রথম ভরসা এরাই। দাইমাকে খুঁজে বের করতে হবে যেভাবেই হউক।

এই কাজ তো আমার উপরেই বর্তাবে তাই না? আর কে ছিল তখন আমার বোনের বা বোনের জামাইয়ের? তখন আমার বোন জামাই ভর দুপুরের খাওয়া পরবর্তী ঘুমটা সেরে নিচ্ছেন। তখন কিন্তু আমার বয়স ৭০ নয় শূন্য ছাড়লে যা হয় ঠিক তাইই। মাতায় রৌদ্র প্রচন্ড তাপ নিয়েই চলছে ছালিক নামের সাত বছরের এই ছেলে। সিলেটের প্রধান পাকা রাস্তা একটার পর একটা মাড়ছে। আমার বয়স ও ক্ষমতার উরধে সচরাচরই ছিল আমার বিচরণ। আমার বোন আমাকে পাঠিয়ে দিলেন তাদের বাসায় দাইমা‘র খবর নিতে।

এদিকে, ফরহাদের আব্বা আমাকে পাঠিয়ে দিলেন লোহার পাড়া গল্লিতে কিছু দিক নির্দেশনা দিয়ে। উনায় কথা মতো গলিতে প্রবেশ করেই ডানে পুকুর পাড়ে এসে জিজ্ঞেস করতেই এই দাইমা’র বাসা দেখিয়ে দেওয়া হল। উনি এই বাড়িতেই থাকেন। যে মহিলা আমার সামনে আসলেন উনি হলেন লম্বা চিপচিপে গড়নের মধ্যবয়সি সাদা বস্ত্র পরিহিত শান্ত সৌম চেহারা বিশিষ্ট একজন মহিলা। প্রথম দেখাতেই উনার প্রতি মায়া লেগে গেল। নিজের অজান্তে উনার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জেড়ে উঠলো। হয়তো এ কারনেই এ রকম অনুভুতি কাজ করছিল কারণ পরবর্তীতে উনি হলেন আমাদের মাসিমা। সেই থেকে শুরু হল উনাকে নিয়মিত আনা নেওয়া যা আমার দায়িত্বে একটি অংশ হিসেবে কাজ ছিল। আমার কাজ আমি করব। হিসাব আমি কাকে দিব? তবে কখনও মনে হয় হিসেব তুলে ধরতে। যাক এক প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলাম। যাই হোক, এবার ফিরে যাই আমার স্মৃতিকাথর সেই গোয়াইপাড়ার বিবরণীতে।

তারপর আবারও গলির শুরু, পূর্ব পাড় জঙ্গলাময় এবং শেষ হয় পূর্বমুখি কাচা রাস্তায়। ঐ রাস্তা দিয়ে মোবারক মেম্বার সাহেবের বাড়ী। উনার ছেলে কবির ও কবিরের এক বোন নাম পেয়ারা আমরা একই পাঠশালার সাথী ছিলাম। সেই সময়ে লেখা পড়ার জীবনের পর কবিরের সাথে আর দেখা হয়নি। আমি যখন হাই স্কুলে পড়ি তাকে দেখেছি ওর আব্বার সাথে দোকানে সাহায্য করত। তাদের দোকানটা ছিল বর্তমান মিতালি ম্যানশনের সামনে। তাদের দোকানের সামনে থাকতো খোলা চা-পাতার বাক্স। আর বাক্সের মধ্যে লেখা থাকত ‘মোবারক টি’। যাক, এই রাস্তা দিয়ে এগিয়ে গেলে ডান দিকে একটা বাড়াটিয়া বাড়ি ছিল, সেখানে আমার আরও এক পাঠশালার সাথী ফারুক থাকত। ওরা নন সিলেটী ছিল। এরপরে বড় একটা বাড়ি, যাকে কাঠাল বাড়ী বলা হত। ঐ বাড়ীর অবস্থা খুবই সূচনীয় ছিল। বাড়ী বড় হলেও ওদের ঘর ভাঙা ছিল। পরবর্তীতে শুনেছি, এই রাস্তায় একটা মাদ্রাসা হয়েছে। যার নাম দারুস সালাম মাদ্রাসা। একদিন এই কাঁঠাল বাড়ী পাড়ি দিয়ে বাগানের দিকে এগিয়ে যেতেই বানর বাহিনীর আক্রমণে কোন মতে নিজের প্রাণটা নিয়ে পালিয়ে এসেছিলাম।

ফিরে আসি গুয়াই পাড়ার মেইন গলিতে, শুরু হল বুঙ্গা নুরের বাড়ী। বিরাট অবস্থাশালী একটি বাড়ী। রাস্তা থেকে অনেক উঁচু বাড়ী। বাড়ীটা তখনি পুরুপুরি দেয়াল বেষ্টিত ছিল। বাড়ীর পশ্চিম-দক্ষিন প্রান্তে বড় গেইট দিয়ে ঢালাই করা উঁচু রাস্তা ছিল। মানুষ ও গাড়ি যাতে সহজে যাতায়াত করতে পারে। এই বাড়ীর বড় ছেলে সুয়েব, আমরা এক সাথে একই ক্লাসে পড়তাম। এই বাড়ী নিয়ে একটা ঘটনা মনে হল। আমাদের বাসা থেকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো হবে। কিন্ত খবর আসল ওরা সিলেটী না, তো সম্পর্কের আগেই সমাপ্তি টানা হল। ছোট বেলায় কাকে যেন জিজ্ঞেস করেছিলাম ভুঙ্গা নুর মানে কি? ওরা এইভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছিল যে, উনি রিলিফের টিন চুরি করে বাহিরে ভুঙ্গা করেছিলেন, এই পর্যন্তই। উনার দেয়ালের দক্ষিন ঘেঁসে টিলাতে উঠার রাস্তা। ঐ রাস্তার ডানে মাজার আর পিছনে গরীব দিনমজুর ও রিকসা ড্রাইভারদের বস্তি ছিল। মালিককে জানা হয় নাই। আমাদের কাজের মেয়ে মনুরা একই বস্তিতে থাকত। মনুর বাপ জব্বার রিকসা চালাত। এই গলি দিয়ে আবার গোয়াইপাড়ার আরেক গলিতে বের হওয়া যেত যা বকুল মামাদের বাসার পশ্চিম প্রান্ত ঘেঁসা। তৎকালীন সময়ে আমি শুনেছিলাম এই পাড়ার একমাত্র বকুল মামাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন।

নুর মিয়ার বাড়ী ছেড়ে টিলার উপরে লন্ডনি বাসা। এই বাসা থেকে দিন রাত একি গান বাজত উচ্চস্বরে। মাল্কা ভানুর দেশেরে বিয়ায় বাদ্য বাঝনা বাজে রে—-। এরপর আবার একটা উঁচু টিলা সেথানে ছিল বিস্কুট ফ্যাক্টরি। একদিন গিয়েছিলাম দেখতে। দেখলাম বড় বড় গামলার মধ্যে ময়দা মাখিয়ে রাখা। কাঠের টেবিলের উপর এগুলো নিয়ে চেপটা করে লম্বা চুরি দিয়ে কাটছে। যা কিনা টোস্ট বিস্কুটের মত সাইজ করা হচ্ছে। তারপর সৈয়দ সাহেবের বাড়ী। সেই সময়ে আমাদের পাড়ার সম্মানিত ভদ্রলোক। উনাকে নিয়ে আমার একটা স্মৃতি আছে। বশর খান ভাইয়ের বিয়েতে গিয়েছি, সেটা বিশ্বনাথ এর চানবরাং গ্রামে। ১৯৭৫ সালের মার্চ মাসের ১৬ তারিখ (এই তারিখটা এখন জেনে বলছি) সকালে বের হয়ে চানবড়াং গ্রামে পৌছাতে পড়ন্ত দুপুর হয়ে গেল। রাস্তাঘাট বলতে বিশ্বনাথের সামন পর্যন্ত। তারপরে চলল জমি, শুকনো খাল- বিল পেরিয়ে সবাই তখন বলছিলেন এই গ্রামে আসার ভালো উপায় হল বিশ্বনাথ থেকে নৌকায়। সেটাই হয়েছিল, আমরা যখন ফিরাযাত্রা বা দজগনে (সিলেটি ভাষা) যাই নৌকাতেই গিয়েছিলাম। বিয়ে থেকে সিলেট ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। গাড়ি থেকে নেমে আমি ও সৈয়দ সাহেব একই রিকসায় বশর খান ভাইয়ের চাচাত ভাইয়ের ইদ্গাহের বাসায় ফিরছি। পশ্চিম-দক্ষিন ঘেঁসে ঢালু রাস্তা নামতে গিয়ে ইদ্গাহ ও আমি দুজনেই রিকসা থেকে পরে যাই। আমি তেমন ব্যথা পাইনি কিন্তু উনি আহত হয়েছিলেন।

যাক উনার বাড়ীর দক্ষিন সীমানার পরেই পূর্বমুখী কাচা রাস্তা। এই রাস্তার ডান দিকের বাড়ীর বসতিদের মোটেই জানতাম না। কিন্তু বামে চানবড়াং এর আসাদ ভাইদের বাসা। সেই বশর খান ভাইয়ের শ্বশুর বাড়ি অন্য কথায় রওশন আপাদের বাসা। যিনি এখন এনি ও ইমরানের মা নামে পরিচিত। আমার রওশন আপা আর নয়। হায়রে আমরা যখন গোয়াইপাড়া ছেড়ে চন্দন টুলার বাসায় গেলাম তখন কিছুদিন আমাকে খাসদবির স্কুলে যেতে হত। ২/১ দিন দেড়টার ছুটিতে উনার বাসায় ভাত খেয়েছি। বশর ভাই প্রায়ই প্রশ্ন করতেন- তোর দেড়টার ছুটি কয়টায় হয়? কিছু বলতাম না, নীরব থাকতাম। ভাই আমার অদ্য চলে গেলেন, আল্লাহ্‌ উনার প্রতি রহম করুন। বশর খান ভাই খুবই অবস্থাশীল ছিলেন। সেই তখনকার সময়ে উনার জিপ গাড়ি ছিল। একদিন পাঠশালা থেকে উনার গাড়িতে উঠে বাসায় এসেছিলাম। উনার মূল বাড়ি তিলক শারপাড়া। গত বছর দেশে গিয়েছিলাম, সিলেটে তিন দিনের সফর ছিল। আমার বন্ধু আব্দাল আমাকে ঢাকা থেকে তার বাসায় যেতে বাধ্য করে। উনি যখন শুনলেন সিলেটে এসে বন্ধুর বাসায় উঠেছি, তখন খুবই মর্মাহত হয়ে বলেছিলেন আমি যতদিন বেঁচে আছি সিলেটে আমার কাছে এসো ভাই। আগেরকার মানুষের মায়ার বাঁধন যেন এক স্বর্গীয় অনুভূতি। আমাকে যখন না খেয়ে আসতে হয়েছিল, রওশন আপা পারলে তো দরজার সামনে কেঁদেই দেন। তাই পরের দিন উনার বাসায় আবারও গিয়েছিলাম। অনেক সময় একসাথে বসে বশর ভাইসহ ক্রিকেট খেলা দেখে রাতের খাবার খেয়ে আসি। এখন নিজের কাছে মনে হয়- এই সব মানুষ চলে গেলে সবই শেষ। আমার নিজের জীবনও তো অনেকটা শেষের দিকে। যাক, এই গলিতে রওশন আপাদের বাসা ছাড়লে বামে উপরের টিলায় ছিল বকুল মামাদের বাসা। উনি বহু আগে আমেরিকা চলে গিয়েছিলেন। যতদূর মনে পরে উনার আব্বার অকাল মৃত্যু হয়েছিল বি.ডি. আর, এর দায়িত্বে পালনকালীন সময়ে। প্রতাপ ভাইদের বাসা ঐ গলির বাম মোড়ে ছিল। উনি খুবই সুদর্শন ছিলেন। উনার বাড়ি জগনাথপুরে। তারপর মাজার ও নাপিতদের বসবাস। জমির নামের এক নাপিতের পরিচিতি ছিল। তাছাড়া সিলেটের যে দুইটা নামি বেকারি ছিল অলিম্পিয়া ও বেষ্টকো তাদের ফ্যাক্টরি সেখানে ছিল। ওদের তৈরি পেস্ট্রির স্বাদ মুখে লেগে আছে। দামও ছিল, ছোট এক পিস আয়তকার সাইজের যতদুর মনে পরে এক টাকার মত ছিল। ওই সব পেস্ট্রিতে কি সুন্দর ক্রিম দিয়ে উপরে ফুল বানানো থাকত। এখনি চোখে ভাসছে। সবুজ সাদা ও গাঁড় কমলা রঙ্গই ওরা বেশি ব্যবহার করত।

শুরু হউক মেইন গলি থেকে আবার, সৈয়দ সাহেবের বাড়ী ছেড়ে আরও দুটি বাসা। একটা বাসা হল আমার সাথেই স্কুলে পড়ত ইয়াজদানিদের। তারপরে খালি মাঠ ও তার পিছনে বসত বাড়ি। এই মাঠে ছিল একটা বড় টিন সেট ঘর, সেখানে লেখা ছিল ‘জনশক্তি রপ্তানি’ একটি সাইন বোর্ড। অনেক মানুষ আসা যাওয়া করত। তখন আমাদের মানুষজন মধেপ্রাচ্য যাওয়া শুরু করে। এরপর আরেকটা বাসা ঠিক রাস্তা ঘেঁসা। তারপর জন-মানবহীন বিরান ভুমি। যতই সাপ্লাই রোডের দিকে যাবেন হাতের বামে গহীন জঙ্গল। সন্ধ্যা পরে এই জঙ্গল থেকে ভয়ানক খেক শিয়াল বের হয়ে ওদের রাজত্ব কায়েম করত। স্থানীয় লোকজন সন্ধ্যার পরে বের হবার মতো কোন সাহস করতেন না। এই পাহাড় জঙ্গলের ভীতরে একটা বসতি ছিল। চপল ও কমলদের বাসা। ওদের আব্বা ছিলেন সাহিত্যিক নাছির উদ্দিন ভাই। উনি হলেন আবার পূর্বে উল্লেখিত রওশন আপার দুলাভাই। ভদ্রলোকের মূলবাড়ি সালুটিকরের কাছাকাছি কোন এক জায়গায়। এই বাসায় ১৯৭৪ সালে একবার গিয়েছিলাম। ভাবনায় কুলিয়ে উঠতে পারতাম না এই গুহায় বসবাসের বিষয়টা। তারপর সর্ব শেষ প্রান্তে যুগভেরী অফিস। মালিক আমিনুর রশিদ চৌধুরী। একদা স্কুল থেকে গিয়েছিলাম সংঘবদ্ধ হয়ে। বিষয়টা কি ছিল ঠিক মনে করতে পারছি না। স্মৃতিতে ঝাপসা হয়ে গেছে।

সাপ্লাই রোড থেকে ফিরার পথে রাস্তার পশ্চিমে দুটি বাসা। সিভা গেইগি নামক ঔষধ কোম্পানির অফিস ছিল। তারপরে শুরু হল জলাভুমি। বর্তমানে আমার বন্ধু মামুনের বড় ভাই সাব রেজিস্টার হারুন আকবর চৌধুরী ভাই যেখানে বাসা করেছেন। এই জায়গা কচুরিপানা বেষ্টিত ছিল। খোলা জলাভুমি, এ পাশ থেকে তাকালে আমিনুর রশিদ চৌধুরীর বাসা ও আম্বরখানা বাজারের পিছনে দৃষ্টি পড়ত। এই সব জায়গা দিয়ে মানুষ যেতই না। এই জায়গাগুলো মূলহীন ছিল তৎকালীন সময়ে। না ছিল মাছ চাষের, না ছিল ফসলি, ঘর বাড়ী করার তো প্রশ্নই উঠে না। সিলেটে তখন তো জায়গার অভাব ছিল না। এই জায়গাগুলো এমন ছিল, যা এই লন্ডনে ‘মাশল্যান্ড’ বলা হয়। আমাদের বাসা যে গলিতে সেখানে আধা একর জায়গা কেনা হয়েছিল পচিশ হাজার টাকায়। তারপরে আসল ৩/৪ টা সারিবদ্ধ বাসা। এই বাসার একজন লোক পরে উকিল হয়েছিলেন। আমার বছর খানেক পরে সিলেট বারে তিনি যোগদান করেছিলেন। নাম যতটুকু মনে পরে আশরাফ সাহেব। উনাদের বাসার পশ্চিমে এমন জলাভুমি ছিল, চূড়ান্ত শুস্ক মৌসুমেও পানি শূন্য হত না। কেন বলছি, এই জলায় ১৯৭৭/১৯৭৮ সালে আমার পা পড়েছে। ১৯৭৭-৭৮ সালে আমরা বনশ্রীতে ছিলাম। এই জায়গা গোয়াইপাড়া ও বনশ্রীর মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত।

এই সব বাসা ছেড়ে আবার আড়া জঙ্গলা, তারপরে বিরাট জায়গা নিয়ে একটি বাড়ি। অনেক জায়গা বাড়িতে কোন মানুষজন কখনও দেখিনি। এ বাড়ীর উত্তরের জমি দিয়ে পশ্চিম দিকে হেঁটে খান ইঙ্গিনিয়ারিং এর মালিকদের বাড়ীতে উঠে মজুমদারি এয়ারপোর্ট রোডে যাওয়া যেত। আমি এই খালি প্রান্তরে খান বাড়ীর ছেলেদের সাথে খেলাধুলা করেছি।

এই বাড়িটা ছাড়লেই একটা বড় হিন্দু বাড়ী। এই বাড়ীর ছেলেটার নামটা স্মরণ করতে পারছি না। তার চেহারাটা মনে আছে। তাকে এক সময় দেখেছিলাম সোনালি ব্যাংকে আইপি ব্যবসার সাথে জড়িত। তাদের বাড়ি ছেড়ে ফাঁকা জায়গা, তারপরে একটা মাজার। মাজারের পাশ দিয়ে পশ্চিমমুখী আমাদের বাসার রাস্তা। তারপরে বামে জঙ্গলা ও গহীন অরণ্য বেষ্টিত টিলা যা শেষ হয়েছে লেচু বাগানের হানিফদের বাড়ী অবদি। একই ধরণের ভুমি পার হয়ে এসে গরম শাহ্‌ মাজার। তখনকার সময়ে গাড় দেয়াল ও ছোট স্টিল গেইট বেষ্টিত ছিল। ভীতরে বড় বড় বাঁশ ঝাড় ছাড়া আর কিছুই দেখা যেত না। তারপরে শুরু হল বাঁশ জঙ্গলা। এই সব ছিল মানুষের বসত বাড়ীর পিছনের সীমানা। এই সব বাড়ির সম্মুখ দিক ছিল এয়ারপোর্ট রোডের দিকে। এই সব বাড়ীদের মধ্যে একটা বাড়ি ড্রাইভারের বাড়ী বলা হত। উনার ট্রাক বাড়ীর সামনে এয়ারপোর্ট রোডে থাকত। আমি অবশ্য নাম জানতাম তবে এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না।

এই হল আমার ছোট বেলার বেড়ে ওঠা সেই স্মৃতিকাতর পাড়া বা আশপাশের বর্ণনা যা আমার স্মৃতির ক্যানভাসে এখনও বেঁচে আছে। যেহেতু ৪৭ বছরের পিছনে চলে গিয়েছিলাম স্বাভাবিকই ভুল ভ্রান্তি হয়ে যেতে পারে। এখানে যেই সব চরিত্রের নাম তুলে ধরেছি তা ঠিক যেভাবে সেই সময়ে আমার কচি মনের মেমোরিতে ছিল ঠিক সেভাবেই এখানে উপস্থাপন করেছি। তবে মনের তাগিদে ভবিষ্যতে যদি আরো নতুন কিছু মনে পড়ে তাহলে হয়তো দ্বিতীয় সংস্করণ হিসেবে আবারও লেখতে বসবো। অসংখ্য ধন্যবাদ সবাইকে।

লেখক: মোহাম্মদ ছালিকুর রহমান, এডভোকেট, ২নং বার, জজ কোর্ট সিলেট (সাবেক কর্মস্থল), M.S.S (D.U), LLM. (U.E), LONDON)। বর্তমানে বিলেত প্রবাসী।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026