সাব্বিন হাসান: বিশ্বে পরিচিতি এখন রোকসানা নামেই। তবে পুরো নাম রোকসানা বেগম। মুসলমান নারী। সঙ্গে বাংলাদেশী পরিচয় বহন করছেন বিখ্যাত এই নারী। বর্তমানে বসবাস করছেন ব্রিটেনে। জন্ম ১৫ অক্টোবর, ১৯৮৩ সালে। মাত্র ৩২ বছরেই পেয়েছেন বিরল খ্যাতি। তবে শুরুটা ১৮ বছর বয়সে। কলেজ শেষ করেই মার্শাল আর্টে প্রশিক্ষণ নেন রোকসানা। শুরুতে পরিবারের কেউই জানতেননা কিক বক্সিংয়ের ওপর তার প্রশিক্ষণের খবর। তার এই আগ্রহের খবর খুব বেশিদিন চাপা রাখতে পারেননি রোকসানা। পরে পরিবারের সদস্যদের থেকেই পেয়েছেন সাহস আর সহযোগিতা। পেশাদার কিক বক্সিংয়ে তার অভিষেক ২০০৮ সালে।
ব্রিটেনে জন্ম নেয়া রোকসানা সিলেটের জগন্নাথপুর উপজেলার মেয়ে। শিশুকাল থেকেই মার্শাল আর্টের প্রতি দুর্বল ছিলেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় নিজের তথা নারীর আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে ধীরে ধীরে কিক বক্সার হয়ে ওঠেন তিনি। ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্ট মিনিস্টার থেকে ২০০৬ আর্কিটেকচার বিষয়ে স্নাতক সম্মান অর্জন করেন রোকসানা বেগম। বর্তমানে তিনি খণ্ডকালীন হিসেবে কাজ করছেন। এ ছাড়াও চ্যারিটি এবং সমাজসেবামূলক কাজে জড়িয়ে পড়েছেন।
রোকসানা স্বপ্ন দেখেন বাঙালি মেয়েদের কিক বক্সিংয়ে আগ্রহী করে তোলার। এই লক্ষ্যে সপ্তাহের প্রতি রোববার তিনি পূর্ব লন্ডনের বেথনালগ্রিন জিমনেশিয়ামে নারীদের আত্মরক্ষায় বক্সিং প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন।
প্রসঙ্গত, অনেক দিন থেকেই ব্রিটেনের বাঙালি কমিউনিটিতে রোকসানার কিক বক্সিং জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। তবে ২০১১ সালে বিবিসি এশিয়ান নেটওয়ার্কে রোকসানার সাক্ষাৎকার প্রচারিত হওয়ার পর সাড়া পড়ে যায় চারদিকে। এমনকি ব্রিটেনেও তাকে নিয়ে সাড়া পড়ে। ব্রিটেনের নারীরা এ প্রচেষ্টার কথা জেনে আত্মরক্ষায় কিক বক্সিংয়ের প্রতি আগ্রহী হতে শুরু করে। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি রোকসানাকে। তবে জয়ের রথ এখনই থামবার নয়। এটি সবে সূচনা বলেই মনে করেন রোকসানা।
এ ধরনের খেলা প্রসঙ্গে রোকসানা বলেছেন, নারীদের সাহসী হতে হবে। এখনকার সময়ে যে কোনো সময় নারীদের বিপদের মুখোমুখি হতে হয়। তাই আত্মরক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আর তা অর্জনে নারীদের পরিশ্রম করতে হবে। এতে শারীরিকভাবেও অনেক ভালো থাকা সম্ভব।
ব্রিটেনে সব ধরনের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার কৌশল সেলফ ডিফেন্স হিসেবে মার্শাল আর্ট রপ্ত করেছেন বাঙালি তরুণী রোকসানা। কিন্তু রোকসানার এই আত্মরক্ষার মার্শাল আর্ট অর্জন করেছে ব্রিটিশ চ্যাম্পিয়নের পুরস্কার। মার্শাল আর্টের নানামুখি কৌশল রপ্ত করে রোকসানা এখন হয়ে উঠেছেন বিখ্যাত কিক বক্সার। ২০১০ রোকসানা হন ব্রিটিশ চ্যাম্পিয়ন। ব্রিটিশ-বাংলাদেশী রোকসানা শুধু ব্রিটেনে বাঙালি পরিমণ্ডলে নয়, বরং এশিয়ান বংশোদ্ভূত একমাত্র নারী কিক বক্সার। আন্তর্জাতিক আবহে এশিয়া তথা বাংলাদেশের সম্মান বাড়িয়েছেন রোকসানা।
মার্শাল আর্টে তার এই আগ্রহের প্রতি পরিবার থেকেও সমর্থন দেয়া হয়। এভাবেই এগিয়ে যান রোকসানা। পরে নিজস্ব কোচের সহযোগিতায় অংশ নেন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায়। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক আসরে কিক বক্সিংয়ে অংশ নিয়ে সফল হতে থাকেন। এই ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালে রোকসানা ব্রিটেনের হয়ে আন্তর্জাতিক কিক বক্সিং প্রতিযোগিতায় জিতে নেন ব্রিটিশ চ্যাম্পিয়ন খেতাব। ফলে ব্রিটিশ-বাংলাদেশীদের সাফল্যে যোগ হয় আরেক গৌরব। পরের বছর ২০১১ সালে ইউরোপিয়ান গোল্ড মেডেলিস্ট খেতাব অর্জন করেন। ওই বছরই রাশিয়াতে আরেক প্রতিযোগিতায় ব্রিটেনে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিয়ে ব্রোঞ্জ পদক পান। তবে রোকসানার এখন প্রতিটি লড়াইয়ের লক্ষ্যই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের।
এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক আসরে রোকসানার সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছেন দুই সফল ব্রিটিশ-বাংলাদেশী। একজন ক্যানারি ওয়ার্ফের হেড অব কমিউনিটি অ্যাফেয়ার্স জাকির খান। অন্যজন প্রাইড অব এশিয়ার স্বত্বাধিকারী ওয়াজিদ হাসান সেলিম। এ দু’জনই তাদের নিজেদের প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে রোকসানাকে পৃষ্ঠপোষকতা করবেন। ব্রিটেনের বাঙালি কমিউনিটিতে রোকসানাকে সমর্থন দিতেও তারা কাজ করছেন।
গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে রোকসানা জানালেন, আমার অর্জনটুকু শুধু আমাকে অনুপ্রাণিত করে না। আমি বিশ্বাস করি, এটি সব ধরনের সমাজব্যবস্থাকে অনুপ্রাণিত করবে। আসন্ন প্রতিযোগিতায় ব্রিটেনের প্রতিনিধি হিসেবে জিততে পারলে এই বিজয় হবে ব্রিটিশ-বাংলাদেশী আর বাংলাদেশের। তবে রোকসানার ইচ্ছা বিশ্ব অলিম্পিক আসরে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিজয় অর্জন করা।